Wednesday, 4 November 2020

দৈনিক শব্দের মেঠোপথ

∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆

‌‌ জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য

         চিত্তরঞ্জন দাশ

==========/////////////////////////////=========

Doinik sabder methopath

Vol -182. Dt - 05.11.2020

১৯ কার্তিক, ১৪২৭. বৃহস্পতিবার

÷÷÷÷÷÷÷÷✓✓✓✓✓✓✓✓✓✓÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷


সি.আর দাশ নামে সমধিক পরিচিত এবং সাধারণ্যে দেশবন্ধু বলে আখ্যায়িত। তিনি বিশ শতকের বাংলার সবচেয়ে প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অন্যতম। মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরের এক উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে চিত্তরঞ্জন দাশ ১৮৭০ সালের ৫ নভেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ভূবনমোহন দাশ কলকাতা হাইকোর্টে ‘সলিসিটা’র ছিলেন। প্রথম জীবনে সি আর দাস ভবানীপুরের (কলকাতা) লন্ডন মিশনারি সোসাইটির ইনস্টিটিউশনে শিক্ষা লাভ করেন। ১৮৮৫ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষা পাস করেন এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৮৯০ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ইংল্যান্ডে গিয়ে ইনার টেম্পলে যোগদান করেন এবং ১৮৯৪ সালে ব্যারিস্টার হন। ঐ একই বছর তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং কলকাতা হাইকোর্টে ব্যারিস্টার হিসেবে নিজের নাম তালিকাভুক্ত করেন। ১৯০৮ সালে অরবিন্দ ঘোষের বিচার সি.আর দাশকে পেশাগত মঞ্চের সম্মুখ সারিতে নিয়ে আসে। তিনি এমন চমৎকারভাবে কেসটির পক্ষসমর্থন করেন যে অরবিন্দকে শেষ পর্যন্ত বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। তিনি ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলার (১৯১০-১১) বিবাদি পক্ষের কৌশলী ছিলেন। সি আর দাস দীউয়ানি ও ফৌজদারি উভয় আইনে দক্ষ ছিলেন।

বিশ শতকের প্রথম দিকে সি.আর দাশ রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।  অনুশীলন সমিতির মতো বিপ্লবী সংগঠনের সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। এস.এন ব্যানার্জী, বি.সি পাল ও অরবিন্দ ঘোষের সহকর্মী হিসেবে তিনি বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫)-কে বাংলায় বিপ্লবী কর্মকান্ড বিস্তৃত করতে সদ্ব্যবহার করেন। ১৯১৭ সালে ভবানীপুরে অনুষ্ঠিত বাংলার প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন তিনি। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে এম. কে গান্ধীর আহবানে সাড়া দিয়ে আইনজীবীর পেশা পরিত্যাগ করেন এবং ১৯২১ সালে প্রিন্স অব ওয়েলসের কলকাতা সফর বর্জনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। সরকার তাঁকে অনেকবার কারাগারে অন্তরীণ করে। গান্ধী যখন  অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করেন তখন সি.আর দাশ তার তীব্র সমালোচনা করেন এবং বিষয়টিকে গুরুতর ভুল বলে নিন্দা করেন। তাঁর মতে, গান্ধীর এ কাজ রাজনৈতিক কর্মীদের মনোবল বহুল পরিমাণে কমিয়ে দেয়। ঐ চরম সংকটপূর্ণ সময়ে তিনি পরিষদে প্রবেশ কর্মসূচি অর্থাৎ পরিষদের অভ্যন্তরে অবস্থান নিয়ে অসহযোগ চালিয়ে যাবার সূত্র নিয়ে এগিয়ে আসেন। কংগ্রেসের আইন পরিষদ বর্জনের নীতিকে তিনি দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করেন। তিনি মনে করতেন যে, সরকারকে অবিচল, অবিচ্ছিন্ন ও দৃঢ়ভাবে বাধাদানের উদ্দেশ্যে আইন পরিষদে প্রবেশাধিকার অর্জন করা অবশ্যই প্রয়োজন। ১৯২২ সালের ডিসেম্বর মাসে গয়ায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে পরিষদে প্রবেশ সংক্রান্ত তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। অতঃপর তিনি কংগ্রেসের সভাপতির পদে ইস্তফা দেন এবং পন্ডিত মতিলাল নেহরু, হাকিম আজমল খান, আলী ভ্রাতৃদ্বয় ও অন্যান্যদের সহযোগিতায় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে স্বরাজ্য দলের ভিত্তি স্থাপন করেন। ১৯২৩ সালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় বিধান পরিষদের নির্বাচনে স্বরাজ দল উল্লেখযোগ্য বিজয় অর্জন করে।

দেশবন্ধুর  অভিমত ছিল যে, বঙ্গীয় আইন পরিষদ এ বলিষ্ঠ  গ্রুপ সৃষ্টিকারী মুসলিম সদস্যদের আন্তরিক সহযোগিতা ব্যতিরেকে স্বরাজবাদীদের বাধাদানের নীতি সফল হবে না। বস্ত্তত, দৃঢ় প্রত্যয় ও বিশ্বাসসহ তিনি ছিলেন রাজনৈতিক বাস্তববাদী এবং প্রচন্ড বিরোধিতার মুখেও তিনি নিজ অবস্থান থেকে কখনও বিচ্যুত হতেন না। তিনি নিজে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জ্বলন্ত অগ্রদূত ছিলেন বলে বাংলার সাম্প্রদায়িক সমস্যা নিরসনে স্মরণীয়ভাবে সাফল্যলাভ করেছেন। বেঙ্গল প্যাক্ট নামে সাধারণভাবে পরিচিত এক চুক্তির মাধ্যমে তিনি বাংলার মুসলমানদের আস্থাভাজন হয়ে তাদেরকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসেন। ১৯২৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত স্বরাজ্য পরিষদ দলের এক সভায় চুক্তিটির শর্তাবলি গৃহীত হয়। দুঃখের বিষয় যে, বাংলায় কংগ্রেসের অনেক নেতা চুক্তিটির বিরোধিতা করে।

এস.এন ব্যানার্জী, বি.সি পাল ও অন্যান্যদের নেতৃত্বে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির হিন্দুরা এটির বিপক্ষে অনমনীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাদের ভয় ছিল যে, চুক্তিটি হিন্দু সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক প্রভাব দুর্বল করে ফেলবে। তারা সি.আর দাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে যে, তিনি হিন্দুদের অধিকার বিসর্জন দিয়েছেন। এমনকি অনেক মধ্যপন্থি হিন্দু নেতা মনে করেন যে, সি.আর দাশ মুসলমানদের আস্থা অর্জন করার চেষ্টায় অনেকটা ছাড় দিয়েছেন। বাংলার মুসলমানগণ সর্বান্তঃকরণে চুক্তিটিকে স্বাগত জানায়। কিন্তু ১৯২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কোকনদ সেশনে চুক্তিটি বাতিল করা হলে তাদের মোহমুক্তি ঘটে। তাদের মতে, কোকনদ কংগ্রেস যে মস্ত ভুল করে সেটি ছিল কংগ্রেস আন্দোলনের ইতিহাসে জঘন্যতম ও এ ভুল হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ক্ষেত্রে এবং কংগ্রেসের মুখ্য উদ্দেশ্যের প্রতি চরম আঘাত হেনেছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যে অবস্থান নিয়েছিল, সি.আর দাশ তার সমালোচনা করে ঘোষণা করেন: ‘তোমরা সভার সিদ্ধান্তসমূহ থেকে বেঙ্গল প্যাক্টকে মুছে ফেলতে পার, কিন্তু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস থেকে বাংলাকে বাদ দিতে পারবে না...এ রকম শিষ্টাচারহীন রীতিতে বাংলাকে মুছে ফেলা যাবে না। যারা চিৎকার করে বলে যে ‘বেঙ্গল প্যাক্টকে মুছে ফেল’ তাদের যুক্তি আমি বুঝতে পারি না... বাংলা কি অস্পৃশ্য? এ রকম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করার বাংলার অধিকারকে কি তোমরা অস্বীকার করবে? যদি তোমরা তাই কর, বাংলা তার নিজের ব্যবস্থা নিজেই গ্রহণ করতে পারবে। তোমরা অভিমত ব্যক্ত করার ব্যাপারে বাংলার অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করতে পার না’। যদিও ভারতীয় কংগ্রেস কর্তৃক মেনে নিতে অস্বীকার করা হয়েছে, তবু ১৯২৪ সালের জুন মাসে সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস সম্মেলন কর্তৃক তিনি চুক্তিটির শর্তাবলি অনুসমর্থন করিয়ে নিতে সক্ষম হন।

১৯২৪ সালে কলকাতা কর্পোরেশন-এর নির্বাচনে স্বরাজবাদী বিজয় অর্জন করে এবং সি.আর দাশ প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। পরবর্তী মেয়াদের জন্যও তিনি পুনঃনির্বাচিত হন। ১৯২৩ ও ১৯২৪ সালে যথাক্রমে লাহোর ও কলকাতায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত শ্রমিক ইউনিয়নের কংগ্রেসে তিনি সভাপতিত্ব করেন। ১৯২৫ সালে ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। ১৯২৩ সালে তিনি স্বরাজ্য দলের মুখপত্র হিসেবে সাপ্তাহিকী দ্য ফরওয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৪ সালে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের মুখপত্র মিউনিসিপ্যাল গেজেটও প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জাত-বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার ঊর্ধ্বে ছিলেন। তিনি নারী মুক্তি সমর্থন করতেন এবং নারী-শিক্ষা ও বিধবাদের পুনর্বিবাহকে উৎসাহিত করতেন। তিনি যে অসবর্ণ বিবাহের পক্ষে ছিলেন তার প্রমাণ মিলে তাঁর নিজ কন্যাদের ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ পরিবারে বিবাহ দানের ঘটনায়।

মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে ১৯২৫ সালের জুন মাসে দেশবন্ধুর  মৃত্যু হয়। তাঁর অকালমৃত্যু বাংলা ও একই সাথে ভারতের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপর আঘাত হানে। আবুল কালাম আজাদ মন্তব্য করেছেন যে, ‘তিনি (দেশবন্ধু) অকালে মারা না গেলে দেশে নতুন অবস্থা সৃষ্টি করতেন’। তিনি আরও বলেন,‘পরিতাপের বিষয় এ যে, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কিছুসংখ্যক অনুসারী তাঁর অবস্থানকে জর্জরিত করে এবং তাঁর ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে বাংলার মুসলমানরা কংগ্রেস থেকে দূরে সরে যায় এবং (ভারত) বিভক্তির প্রথম বীজ বপন করা হয়’।  


Tuesday, 3 November 2020

দৈনিক শব্দের মেঠোপথ

∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆
                 জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য
https://assets.roar.media/assets/TP7zBfP9WrZWUFOL_ritwik_ghatak.jpg
   ===========////////=================
          Doinik sabder methopath
          Vol -181. Dt - 04.11.2020
           ১৭ কার্তিক, ১৪২৭. বুধবার
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷/////////÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷

"ঋত্বিক মনেপ্রাণে বাঙালি পরিচালক ছিল, বাঙালি শিল্পী ছিল– আমার থেকেও অনেক বেশি বাঙালি। আমার কাছে সেইটেই তার সবচেয়ে বড়ো পরিচয় এবং সেইটেই তার সবচেয়ে মূল্যবান এবং লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য"। ( সত্যজিৎ রায় )

ঋত্বিক কতটা তীব্রভাবে বাঙালি ছিলেন, ঋত্বিক কতখানি নিবিড়ভাবে বাংলার মানুষের ছিলেন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ সত্যজিৎ রায়ের এই অকপট সাক্ষ্য।

বহু প্রেম আর বহু জন্মের নির্বাক সাক্ষী পুরান ঢাকার ঋষিকেশ দাস লেনে জন্ম হয় যমজ ভাই-বোন, ঋত্বিক-প্রতীতির। তাঁদের ডাকনাম ছিল ভবা আর ভবী। ঋত্বিকের পুরো নাম ঋত্বিক কুমার ঘটক।

তাঁর জন্ম অবিভক্ত ভারতের পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশের) রাজশাহী শহরের মিয়াঁপাড়ায় । তার মায়ের নাম ইন্দুবালা দেবী এবং বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক। তিনি বাবা-মায়ের ১১তম এবং কনিষ্ঠতম সন্তান। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের পরে পূর্ববঙ্গের প্রচুর লোক কলকাতায় আশ্রয় নেয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় তার পরিবার কলকাতায় চলে যায়। শরণার্থীদের অস্তিত্বের সংকট তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে এবং পরবর্তী জীবনে তার চলচ্চিত্রে এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

১৯৪৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে আই.এ এবং ১৯৪৮ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এম.এ কোর্স শেষ করেও পরীক্ষা না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেন তিনি।

তাঁর বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন এবং তিনি কবিতা ও নাটক লিখতেন। তার বড় ভাই ঐ সময়ের খ্যাতিমান এবং ব্যতিক্রমী লেখক মনীশ ঘটক ছিলেন ইংরেজির অধ্যাপক এবং সমাজকর্মী। আইপিটিএ থিয়েটার মুভমেন্ট এবং তেভাগা আন্দোলনে মনীশ ঘটক জড়িত ছিলেন। মনীশ ঘটকের মেয়ে বিখ্যাত লেখিকা ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবী। ঋত্বিক ঘটকের স্ত্রী সুরমা ঘটক ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা।

ছোটবেলা থেকেই ঋত্বিক অন্য ধাঁচের মানুষ ছিলেন। আর দশজন লোকের মতো তো ছিলেনই না, আর দশজন বিখ্যাত লোকের মতোও তিনি ছিলেন না। ছেলেবেলা থেকে আমৃত্যু জীবনকে তিনি নিজের মতো করে গড়েছেন, ভেঙেছেন, তারপর আবার নতুন করে গড়েছেন। ঋত্বিক রাজনীতি করেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য ছিলেন। গণনাট্যের কর্মী ছিলেন। নাটক লিখেছেন, অভিনয় করেছেন। ঋত্বিক সাহিত্যিক ছিলেন– গল্প লিখেছেন, ছাত্রাবস্থায় ‘অভিধারা’ নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করতেন। ভারতীয় চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে ভাইস-প্রিন্সিপালও হন। কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি সিনেমাওয়ালা, বাংলা এবং বাঙালির সিনেমাওয়ালা।

১৯৪৮ সালে। কলকাতার হাজরা রোডের উপর আট বাই বারো ফিটের মতো একটা চায়ের দোকান – নাম প্যারাডাইস ক্যাফে। প্যারাডাইসের নোংরা চেয়ার-টেবিলে বসে আড্ডা দিতেন একদল তরুণ। এঁদের কয়েকজনের নাম মৃণাল সেন, তাপস সেন, সলীল চৌধুরী আর ঋত্বিক ঘটক। কখনো কখনো আসতেন বিজন ভট্টাচার্য। এইখানেই আড্ডা হতো, তর্ক হতো। মধ্যমণি ঋত্বিক। ঋত্বিকের রাজনীতি আর সিনেমার সূতিকাগার নোংরা চেয়ার-টেবিলে ঠাসা প্যারাডাইস ক্যাফে। এই তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে বেপরোয়া ছিলেন ঋত্বিক।

চলচ্চিত্রে আসার কথা ছিল না। তাঁর স্বপ্নের সমস্তটা জুড়ে ছিল নাটক। ঋত্বিক সিনেমাতে এসেছেন, কারণ সিনেমা একসাথে বহু মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেয়। মেজদা সুধীশ ছিলেন সিনেমার লোক। দাদার বহু সিনেমার সাথে সরাসরিভাবে জড়িত ছিলেন তিনি। দাদা সুধীশ ঘটকের সূত্রেই সিনেমার বহু লোকের সঙ্গে পরিচিতও হলেন। নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ সিনেমার কাজ করতে গিয়ে তাঁর পরিচয় হয় সত্যজিৎ রায়ের সাথে। বেশ কিছু সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার পর অবশেষে নিজের সিনেমার ঝুলি খুললেন ঋত্বিক ঘটক।

https://assets.roar.media/assets/TP7zBfP9WrZWUFOL_ritwik_ghatak.jpg
চলচ্চিত্র বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে (বাঁ থেকে) সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটক; Image Source: ঋত্বিক চলচ্চিত্র কথা

‘নাগরিক’ তাঁর প্রথম সিনেমা হলেও প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা নয়। ‘নাগরিক’ বিশ্বযুদ্ধোত্তর বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবনের টানাপোড়নের গল্প। যে গল্প, যে জীবনবোধ, যে তিক্ততা ঋত্বিক দেখেছেন, কোনো ভণিতা না করেই তা বলে গেছেন নাগরিকে। পুরো সিনেমার কাজ শেষ করেও পরে অর্থাভাবে সিনেমাটি আর মুক্তি পায় না (১৯৫২ সালে)। সাতাশ বছরের ঋত্বিকের প্রথম সিনেমা ‘নাগরিক’ মুক্তি পায় তাঁর মৃত্যুর পরে, ১৯৭৭ সালে।

১৯৫৫ সালে আদিবাসীদের জীবনযাত্রা নিয়ে ডকুমেন্টারি ছবি করলেন ‘ওঁরাও’।

১৯৫৮ সালে প্রথম সিনেমা ‘অযান্ত্রিক’ মুক্তি পায়। এর জন্য প্রচুর পরিশ্রম করেছিলেন ঋত্বিক। কেবল ছয় থেকে সাতবার স্ক্রিপ্টই বদলেছেন। তাঁর এত এত পরিশ্রম বৃথা যায়নি। বাংলা সিনেমার জগতে এটি এখনো এক অনবদ্য সিনেমা।

https://assets.roar.media/assets/TP7zBfP9WrZWUFOL_ritwik_ghatak.jpg
অযান্ত্রিক;

 ‘অযান্ত্রিক’ এক অন্যরকম গল্পের নাম। মানুষ এবং যন্ত্রের ভালোবাসার গল্প এটি। বিমল এবং তার ট্যাক্সি ‘জগদ্দল’ সিনেমার নায়ক-নায়িকা। বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তিনি বললেন এক পরাবাস্তব গল্প। ঋত্বিক বাঙালিকে এক নতুন ঘরানার সিনেমা উপহার দিলেন। নাগরিকের ব্যর্থতার পর মুষড়ে যাওয়া ঋত্বিককে খ্যাতি এনে দিল অযান্ত্রিক। অযান্ত্রিকের বিষয়বস্তু নির্ধারণে তিনি দেখিয়েছেন অতুলনীয় সাহস। জগদ্দলকে অনুভূতিপ্রবণ এক সত্তা হিসেবে কল্পনা করে, তার মধ্যে মানুষিক প্রতিক্রিয়া আরোপ করে সে যুগের দর্শকের কাছে উপস্থাপনের সাহস দেখিয়েছেন ঋত্বিক।

১৯৫৯ সালে মুক্তি পায় ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’। বাড়ি থেকে পালানো এক ছেলের চোখে শহরকে দেখার গল্প। নাকি ঋত্বিকের গল্পই এটি? তিনি নিজেও তো কয়েকবার পালিয়েছিলেন বাড়ি থেকে। সে যাই হোক, এটি তাঁর গল্প না হলেও নিজের বাড়ি থেকে পালানোর অভিজ্ঞতার যথার্থ ব্যবহার করেছেন এই সিনেমায়।

এরপর একে একে মুক্তি পায় ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। এগুলোর প্রথম তিনটি সিনেমাকে ত্রয়ী বলা হয়। দেশভাগের ফলে পুরো ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে যে শরণার্থী সমস্যা তৈরি হয় তাই-ই ছিল ত্রয়ীর মূল বিষয়বস্তু। ঋত্বিক দেখিয়েছেন দেশভাগ কি করে কোটি কোটি পরিবারকে উদ্বাস্তু করেছে।

ঋত্বিকের সবগুলো সিনেমার চেয়ে শেষের দুটি একেবারে আলাদা। অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের উপর নির্মিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমাটি এক মালোপাড়ার জীবনপ্রবাহের প্রতিচ্ছবি। এ গল্প কেবল একটি মালোপাড়ার নয়, এ গল্প তিতাস নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা শত শত মালোপাড়ার গল্প।  ছেলেবেলায় ব্রহ্মপুত্র দেখেছেন ঋত্বিক, বাবার চাকরি তখন ময়মনসিংহে। আরো বড় হয়ে চষে বেড়িয়েছেন পদ্মার পাড় । নদীর পাড়ের জীবন তিনি দেখেছিলেন খুব কাছ থেকে। সেজন্যই বোধহয় এত স্পষ্ট প্রতিবিম্বে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন নদীপাড়ের গল্প। আবার তিতাসপাড়ের অনন্তের মতো তাঁকেও চলে যেতে হয়েছে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে; সবকিছু ছেড়ে দূরে, বহুদূরে । এ সিনেমার শুটিং হয় বাংলাদেশে।

https://assets.roar.media/assets/TP7zBfP9WrZWUFOL_ritwik_ghatak.jpg
তিতাস একটি নদীর নাম; 

‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ অনন্য সিনেমা। সোজা কথায় ঋত্বিক ঘটকের ‘সেলফ পোর্ট্রেট’ এই সিনেমা। মূল চরিত্র নীলকণ্ঠ, কমিউনিজমে বিশ্বাসী-পাঁড় মাতাল-বুদ্ধিজীবি, এ ঋত্বিক ছাড়া আর কেউ নয়। এই সিনেমা নির্মাণের সময় ব্যক্তিজীবনে প্রচণ্ড অসুখী ছিলেন ঋত্বিক । একদিকে মদ্যপান যেমন অত্যধিক হারে বেড়ে গেছিলো, তেমনি অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতাও জেঁকে বসেছিলো দেহে। দেহের উপর ক্রমশ নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিলেন তিনি। তবু এই সিনেমায় কি ভীষণ নৈপুণ্যে নিজেকে বিশ্লেষণ করলেন, ধরে ধরে নিজেকে নিয়ে নির্মোহ আলাপ করলেন। নিজের ছায়ায় এক বুদ্ধিজীবির হারিয়ে যাওয়ার গল্প শোনালেন আমাদের। আরো বললেন , “ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো।”

https://assets.roar.media/assets/TP7zBfP9WrZWUFOL_ritwik_ghatak.jpg
যুক্তি তক্কো আর গপ্পো; 

ঋত্বিক সিনেমায় তাঁর বলতে না পারা কথা বলেছেন, তাঁর প্রতিবাদ, তাঁর চিন্তা কিংবা তাঁর স্বপ্নের কথা বলেছেন। ঋত্বিক গল্প ছেড়ে নাটক করেছিলেন লোকে গল্প পড়ার চেয়ে নাটকটা বেশি দেখে বলে,  আর নাটক ছেড়ে সিনেমায় এসেছিলেন আরো অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য। তিনি এও বলেছিলেন যে আরো বেশি অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছানোর অন্য কোন মাধ্যম যদি তিনি পেতেন তবে তিনি সিনেমাকে লাথি মেরে সে মাধ্যমটাকেই বেছে নিতেন। সিনেমাকে ভালোবেসে তিনি আসেননি, নিজের সৃষ্টিকে বাঁধতে চেয়েছেন স্থায়ী শিল্পদৃশ্যে। ঋত্বিক যা বলেছেন, তাই-ই করেছেন। তাঁর ভাবনাগুলো নিয়ে তিনি পৌঁছে গেছেন অগণিত মানুষের কাছে। নাটক আর সিনেমা দুই ক্ষেত্রেই অভিনয় করেছেন ঋত্বিক। যুক্তি তক্কো আর গপ্পোতে তো কেন্দ্রীয় নীলকণ্ঠতে অভিনয় করেছেন। তিতাস একটি নদীর নামেও অভিনয় করেছেন।

https://assets.roar.media/assets/TP7zBfP9WrZWUFOL_ritwik_ghatak.jpg
যুক্তি তক্কো আর গপ্পো সিনেমার একটি দৃশ্যে ঋত্বিক; 

ঋত্বিক ঘটক বাম ঘরানার রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তাঁর সিনেমাতে সে আদর্শের ছাপ স্পষ্ট। মানুষের জীবনের অভাব-অনটন আর দারিদ্র্যতার চরম রূপ বার বার ধরা দিয়েছে তাঁর ক্যামেরায় । এত বিস্তৃতভাবে নীচুতলার মানুষের গল্প বাঙলা সেলুলয়েডের ফিতায় আজ অব্দি আর কেউ বলেননি। ‘তিতাস একটি নদীর নামে’ ক্ষুধার জ্বালায় চুরি করতে দেখা যায়, নিজের কাছে আশ্রয় দিয়েও অভাবের তাড়নায় শেষে অনন্তকে তাড়িয়ে দেয় বাসন্তী । অযান্ত্রিকের ট্যাক্সি ড্রাইভার থেকে শুরু হয়ে যুক্তি তক্কো গপ্পোতে এসে অভাবের কষাঘাতে বিপর্যস্ত বুদ্ধিজীবিকে দেখতে পাই আমরা। ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’তে গ্রামের ছেলে কাঞ্চন কলকাতায় এসে দেখে উঁচু-উঁচু বাড়ি আর তার ঠিক পাশেই নোংরা বস্তি। এ শহরের অর্থনৈতিক বৈষম্য এভাবেই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন ঋত্বিক। সুবর্ণরেখার সীতা তার শিশুসন্তানকে বাঁচাতে বেছে নেয় অন্ধকার জগতকে।

দেশভাগের দুঃখ আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে ঋত্বিককে। তাই ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ তাঁর রাজশাহীর পদ্মাপাড়ের স্মৃতিকাতরতা, তাই ‘সুবর্ণরেখা’ তাঁর আজন্ম লালিত বেদনার নাম। বাংলাদেশ থেকে, জন্মস্থান থেকে নির্বাসিত হওয়ার হাহাকার ঋত্বিকের মতো করে আর কেউ প্রকাশ করেননি। বড়ো ভালবাসতেন বাংলাদেশকে তিনি। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধেও বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে ভুল করেননি ঋত্বিক। মুক্তিযুদ্ধের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে নির্মাণ করেন ‘দুর্বার গতি পদ্মা’।

খ্যাতির মাপকাঠিতে ঋত্বিককে যদি ‘সিনেমার জীবনানন্দ’ বলা হয় তবে অত্যুক্তি হবে না। আজ ঋত্বিকের যে খ্যাতি তাঁর জীবদ্দশায় এর প্রায় কিছুই ছিল না। ঋত্বিক বাঙালিকে সিনেমায় নতুন স্বাদ এনে দিয়েছিলেন যা এর আগে বাঙালি কখনো পায়নি। সিনেমায় নতুন ভাষা এনেছেন, নতুন ধরণ এনেছেন। অথচ মৃত্যুর আগ অব্দি প্রাপ্য সম্মান বা ভালোবাসা কিছুই পান নি। অভাবের সাথেও লড়েছেন। ‘সেই ঋত্বিক’ বইয়ে ঋত্বিককে নিয়ে লিখতে গিয়ে বোন প্রতীতি দেবী লিখেছেন, “শুনেছি পরবর্তী জীবনে (ঋত্বিককে) খেতে দেয়া হত না বা পেত না – আমার মা-বাবার সৌভাগ্য, সে দৃশ্য দেখতে হয়নি।”  তবু এই সবকিছু একপাশে সরিয়ে রেখে একজন খাঁটি শিল্পীর মতোই নিবিষ্ট মনে নির্মাণ করে গেছেন একের পর এক সিনেমা।

ঋত্বিকের সিনেমার বিষয়বস্তুর প্রধান দিক সমকালীন সংকট। মানুষের অবক্ষয় ঋত্বিককে আকর্ষণ করতো – ঋত্বিক নিজেই সেটা বলেছেন। প্রথম সিনেমার নাগরিকেই তার প্রমাণ মেলে। মানুষের অবক্ষয়ে আয়না ফেলে তিনি দেখতেন জীবনকে-গতিকে-স্বাস্থ্যকে। ঋত্বিক মানুষের অবক্ষয়কে দেখতেন, কিন্তু বিশ্বাস করতেন জীবনের প্রবহমানতায়। তাঁর চরিত্ররা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও জীবনের জয়গান গায়, জীবনের প্রতি বিশ্বাস রাখে। অযান্ত্রিক সিনেমায় তাই জগদ্দলকে বিক্রি করে দেয় বিমল, পুরোনো জঞ্জালকে দূর করে দেয়। ‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতা বলে ওঠে, “আমি বাঁচবো দাদা।”

ঋত্বিক বাঙালির চিত্রপরিচালক ছিলেন। তাঁর ক্যামেরায় উঠে এসেছে বাঙালির কৃষ্টি-সংস্কৃতি, বাঙালির ধর্মবিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান, সর্বোপরি বাঙালির জীবনবোধ। শুধু বাঙালিরই নয়, আদিবাসীদের যাপিত জীবনের চিত্রও ফুটে উঠেছে তাঁর সিনেমায়। কেন সত্যজিৎ রায় ঋত্বিকের ‘বাঙালি’ পরিচয়কে সবচেয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ দিক’ বলে উল্লেখ করেছেন তাঁর ব্যাখ্যা পাওয়া আরেক চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেলের জবানিতে, যা উল্লেখ না করলেই নয়। জাপানি পরিচালক কুরোসাওয়া এবং ওজুর উদাহরণ টেনে তিনি বলেছেন –

কুরোসাওয়া জাপানি, আবার আন্তর্জাতিকও। কিন্তু ওজু একান্তই জাপানি। ওজুকে সঠিকভাবে বুঝতে জাপানি শিল্প-সংস্কৃতির ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা থাকতে হয়। ঋত্বিক ঘটকও যেন তেমনই আমাদের একান্তই বাঙালি এক শিল্পী যাঁর বিষয়বস্তু, গল্প বলার ধরন, বাংলা ভাষার নাটকীয় প্রকাশভঙ্গি অনুযায়ী নাটকীয় সংলাপ, বাংলা মঞ্চ-নাটকের ধারায় উচ্চকিত অভিনয়রীতি... ঋত্বিকের ছবির ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্সের শটগুলো স্মরণ করুন, এ সবই এক বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালকের একান্ত নিজস্ব চলচ্চিত্রভাষার প্রকাশ। তাই ঋত্বিকের শিল্পউৎসকে খুঁজতে হবে পশ্চিমী চলচ্চিত্রভাষায় নয়, সেটা খুঁজতে হবে বাংলার লোকজ ঐতিহ্য ও শিল্পমাধ্যমগুলির মাঝে।” [ ৩ ]

এইভাবে ঋত্বিক বাঙালির শিল্পী হয়ে উঠলেন। ঋত্বিকের সিনেমায় পৌরাণিকতা এসেছে বারবার। তবে সেটা বিশ্বাসের চোখ দিয়ে নয়, শিল্পীর চোখ দিয়ে।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ঋত্বিক কাউকেই কাছে পাননি, মৃত্যুর সময় স্ত্রী সুরমাও ছিলেন বহু দূরে। বিশৃঙ্খল আর বেপরোয়া জীবন আস্তে আস্তে তাঁকে শেষ করে দিচ্ছিলো। ঋত্বিকের শেষ সময়গুলোর সাক্ষী ছিলেন আরেক চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন। তাঁর ভাষায়, “ শেষ ক-টা বছর ঋত্বিকের বেঁচে থাকাটাই একটা বিরাট অঘটন।” অসুখে ধুঁকে ধুঁকে উনিশশো ছিয়াত্তরের ছয় ফেব্রুয়ারি রাত এগারোটা  পাঁচ মিনিটে মারা যান আজন্ম ভবঘুরে ভবা। মৃণাল সেন সুরমা ঘটককে খবর পাঠালেন, ‘Ritwik Ghatak expired’।

কিন্তু... এক্সপায়ার্ড ঋত্বিক ঘটক তাঁর সৃষ্টির অমরত্বের সুযোগে এখনও বাঙালিকে ভাবার প্র্যাকটিস করাচ্ছেন। ক্রমাগত বলেই চলেছেন, “ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো।”

This article is about Ritwik Ghatak. Ritwik Ghatak was a dramatist, professor, writer, actor and most importantly filmmaker & script writer.

সম্মাননা :

১৯৭০: ভারত সরকার তাকে শিল্পকলায় পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত করেন।[৫]

১৯৫৭: মুসাফির চলচ্চিত্রের জন্য ভারতের ৫ম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তৃতীয় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জন্য মেধার ছাড়পত্র লাভ করেন।[৯]

১৯৫৯: মধুমতী চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার বিভাগে ৬ষ্ঠ ফিল্মফেয়ার পুরস্কার-এ মনোনয়ন লাভ করেন।[১০]

১৯৭০: হীরের প্রজাপতি চলচ্চিত্রের জন্য ১৬তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ শিশুতোষ চলচ্চিত্র পুরস্কার (প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক) লাভ করেন।[১১]

১৯৭৪: যুক্তি তক্কো আর গপ্পো চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার বিভাগে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৭৪: তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্রের জন্য সেরা পরিচালক বিভাগে বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন।



∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆

দৈনিক শব্দের মেঠোপথ

∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆
        জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য


কবি শ্যামল কান্তি দাশ
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷////////÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷
            Doinik Sabder Methopath
             Vol -180. Dt - 03.11.2020
            ১৭ কার্তিক, ১৪২৭. মঙ্গলবার
=============✓✓✓✓✓=============


মানুষ শ্যামলকান্তি 
                    সহোদর কবি মৃণালকান্তি দাশ 



মাস কয়েক আগেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে 'বিদ্যাসাগর পুরস্কার'-এ সম্মানিত হলেন কবি শ্যামলকান্তি দাশ। তাঁর কবিতার সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত.


নিজের সহোদরকে নিয়ে কিছু লেখা মোটেই সহজ নয়। বিশেষ করে যখন মনে পড়ে যে সেই সহোদরকে জীবনে দাদার চেয়েও বেশি পেয়েছি বন্ধুর মতো করে। বুঝতে পারি না কোথা থেকে শুরু করব, আর কতটুকু বলব। একসাথে ভিড় করে আসে অমূল্য সব স্মৃতি, হাজারো কথা। তবে আজ এখানে দাদার কবিতা নিয়ে কিছু লিখছি না। সেসব লেখার জন্য উপযুক্ত মানুষ আছেন। আমি বরং লিখি দাদা শ্যামলকান্তির অজানা কিছু দিক।

                        ৩ রা নভেম্বর ১৯৫১ তে  জন্ম। 
অখন্ড মেদিনীপুরের এক ছোট্ট গ্রাম রাজনগরে কেটেছে আমাদের বাল্য-কৈশোর। সেই বিজলিহীন, পাকারাস্তাহীন গ্রামের হাইস্কুলে আমাদের বাবা ছিলেন সাহিত্যের শিক্ষক। সে গ্রামে ছিল একটি পাঠাগারও-- গণশিক্ষা কেন্দ্র। আর সেই পাঠাগারের ছোটদের বিভাগের গ্রন্থাগারিক কে ছিলেন জানেন? ক্লাশ সেভেন এইটের ছাত্র আমার দাদা শ্যামলকান্তি।

গ্রন্থাগার ছাড়াও গ্রামে ছিল একটা ছোট্টো ডাকঘর। মাটির ঘরে। অমলের মতোই রোজ দাদার দিনের বেশ কিছুটা সময় কাটতো ডাকপিয়নের প্রতীক্ষায়। ঐ বয়সেই দাদা চিঠি লিখত নরেন্দ্র দেব, আশাপূর্ণা দেবী, সৈয়দ মুজতবা আলী, তারাশঙ্করের মতো মানুষদের। তাদের উত্তরের অপেক্ষায় থাকত দাদা। তবে দাদা যে সেবয়সে শুধু বইপত্রের সঙ্গেই সময় কাটাতো তা কিন্তু মোটেই নয়। লুকিয়ে যাত্রাপালা বা মেলায় নররাক্ষসের কান্ড দেখতে যাওয়া, নদীর ঘাট থেকে নৌকা খুলে নিয়ে নিরুদ্দেশ যাত্রা, সাঁতরে নদী পারাপার এসবেও দাদার ছিল সমান আগ্রহ।
দাদার প্রথম প্রেম কিন্তু কবিতা নয়। বরং ছবি আঁকা। ছবি আঁকার নেশা দাদাকে এমন ভাবে পেয়ে বসেছিল যে পড়াশোনা শিকেয় ওঠার অবস্থা। একদিন বাবা রাগ করে ওর আঁকা সব ছবি ছিঁড়ে ফেললেন। তখন থেকে শুরু হল দাদার কবিতা লেখা। দাদার রবীন্দ্রসংগীতের গলাটিও ছিল ভারী চমৎকার। অসংখ্য গান ছিল ওর কন্ঠস্থ। এছাড়া দাদা কাবাডিতেও ছিল বেশ পটু। তবে চেহারাটা রোগা টিঙটিঙে হওয়ার কারণেই হয়তো খেলার মাঠ থেকে প্রায়শই প্রতিপক্ষের মার খেয়ে বাড়ি ফিরত। এমনিতে দাদা ভিতুই ছিল, বিশেষ করে অন্ধকার হলেই ভূতের ভয়ে কাবু। কিন্তু এক অন্যরকমের দুঃসাহস ছিল ওর মধ্যে যা ঐ বয়সের ছেলেদের মধ্যে আজও বিরল।

ওর ছেলেবেলার তেমনি কিছু অসীম দুঃসাহসের গল্প বলি। ঘাটাল থেকে একটি সংবাদ পাক্ষিক বেরোত। একদিন দাদা সেই পত্রিকার দপ্তরে হাজির। না, পত্রিকায় লেখা ছাপানোর আবদার নিয়ে নয়। সেই পত্রিকার ছোটদের বিভাগটি পরিচালনার দাবি নিয়ে। সম্পাদক মশাই অবাক হলেও নিরাশ করেননি সপ্তম শ্রেণীতে পড়া ছেলেটিকে। অবশ্য ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময়ই তো স্কুল ম্যাগাজিনের ছাত্র-সম্পাদক শ্যামলকান্তি।

স্কুলজীবনে শ্যামলকান্তি আর একটি দুঃসাহসের ঘটনা উল্লেখ করি। সম্ভবত সে বছরই যুব কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দাদা তখন দশম শ্রেণী। অঞ্চল যুব কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হল এক মাস্টারমশাইয়ের সস্নেহ উশকানিতে। চলতে থাকল বাবাকে লুকিয়ে মিটিং মিছিল সভায় বক্তৃতা। মাঝে মাঝে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে। বাবার টের পেতে দেরি হল না। ফলে বাবার বেত্রাঘাতে দাদার রাজনৈতিক নেতা হওয়ার বাসনায় সেখানেই ইতি।

দাদার আরো একটা সাহসের গল্প বলি। কলেজে পড়ার সময় হাত খরচের পয়সা বাঁচিয়ে পত্রিকা করছে। 'জনপদ' সংবাদ পাক্ষিক। সেবার দুর্গাচকে বি পি আই এন টি ইউসি-র সম্মেলনে দাদা জনপদ পত্রিকার একটি কপি তুলে দিলেন সমবায় মন্ত্রী জয়নাল আবেদিনের হাতে। একটি তথ্যগত ভুল চোখে পড়ায় রাগে ফেটে পড়লেন তিনি। দাদাকে বললেন পত্রিকা বন্ধ করে দিতে। দাদাও সপাটে উত্তর দিয়েছিল, "কোনো মন্ত্রীর বদন্যতায় বেরোয়না এ কাগজ। হাত খরচের পয়সা বাঁচিয়ে বের করি। আপনার ক্ষমতা থাকলে বন্ধ করে দেখান!"

দাদা বরাবরই এরকম। স্পষ্টবক্তা। তোষামোদে ভরসাহীন। ওর একটাই প্যাশন, এবং সেটা হল কবিতা। কবিতা নির্মাণে কখনও ছেদ পড়েনি দাদার। হাজার অপমান, লাঞ্ছনা, অভাবের মধ্যেও কবিতার প্রতি অবিচল। একনিষ্ঠ। কবিতা থেকে দাদা সরে আসেনি কখনও।

শুধু নিজের কবিতা লেখাই নয়, অন্য কবিসাহিত্যিক, শিল্পীদের জন্যও দাদা অক্লান্ত ভাবে কাজ করে গেছে। নতুন কবি খুঁজে বের করা, তাদের হয়ে প্রচার করা, পত্রিকা দপ্তরে তাদের লেখা নিজে হাতে পৌঁছে দেওয়া, এমন কত যে করেছে! শুধু কী তাই! সারারাত জেগে অসুস্থ বন্ধুর সেবা করা, কোনো বন্ধুর চাকরীর জন্য উমেদারি করা, কাউকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাওয়া, রাত জেগে কারো কবিতা এডিট করে দেওয়া-- বন্ধুদের জন্য কোনো পরিশ্রমেই যেন ওর ক্লান্তি ছিল না। আর দাদার বন্ধুবান্ধবের তালিকাও ছিল ঈর্ষণীয় ভাবে দীর্ঘ। কিন্ত তাদের সবাই তো আর প্রকৃত বন্ধু ছিল না, বন্ধুর মুখোশ পরা শত্রুও ছিল অনেক। দাদা বারবার তার প্রমাণ পেত, তবু যেন ফুলের সঙ্গে কাঁটাকেও মেনে নিয়েছিল সহজ ভাবে।

মহিষাদল কলেজে পড়ার সময় দাদা কলেজ পত্রিকার সম্পাদনা করেছিল দুবার। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় ওর সম্পাদনায় 'আমরা' পত্রিকাটি কলেজ পত্রিকার জগতে এক অনন্য সংযোজন। এসময় থেকেই দাদার সম্পাদনায় কয়েকটি ক্ষীণায়ু ও দীর্ঘায়ু পত্রিকার জন্ম। কনসার্ট, প্রতীতি, জনপদ, কবিতা সংবাদ,বররুচি ইত্যাদি পত্রিকাগুলি সে সময় পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল খুব।

সংগঠক হিসাবেও শ্যামলকান্তির দক্ষতা প্রশ্নাতীত। শুধু মেদিনীপুর কেন সারা পশ্চিমবঙ্গে কবি জীবনানন্দের জন্মদিন অমন মর্যাদার সঙ্গে কেউ পালন করেছেন কিনা জানা নেই। অবশ্য এই উদ্যোগে সঙ্গী ছিল কবি তপনকুমার মাইতি বা নীলকন্ঠ ঘাটীর মতো বন্ধুরা। সারা বাংলা তরুণ লেখক সম্মেলন, সারা বাংলা কবিতা উৎসব, সৌহার্দ্য সত্তর, বিশ্ব বাংলা কবিতা উৎসব-- সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে শ্যামলকান্তির সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয়।

শুধু কবিতার জন্য একটা আস্ত জীবন খরচ করে ফেলা কোনো সহজ কথা নয়, কিন্তু অসম্ভবও যে নয় শ্যামলকান্তি একথা জানত। তাই কখনো সুতাহাটার তিনশো বত্রিশ টাকা বেতনের এক অস্থায়ী স্কুল শিক্ষকের চাকরি ছেড়ে দেড়শো টাকা মাসিক সাম্মানিকে কৃত্তিবাস পত্রিকায় যোগ দিয়েছে, কখনো বা আত্মমর্যাদার প্রশ্নে স্বেচ্ছা অবসর নিয়েছে আনন্দবাজারের মতো প্রতিষ্ঠান থেকেও।

আজ, নিজের দাদা বলে নয়, তার একজন পাঠক হিসাবেই ভালো লাগে খুশি হই যখন এই কবিতা পাগল মানুষটা সম্মানিত হয়, স্বীকৃতি পায়। যদিও মনে হয় যে সম্মান তার পাওয়া উচিত ছিল, আজও তা অধরা। তবে এও জানি, দাদা কোনো সম্মান, পুরস্কার, প্রশংসা, পিঠচাপড়ানোর প্রত্যাশা করে কবিতাকে ভালোবাসেনি। সে অনন্ত কবিতা-পথ হেঁটে যাবে নির্বিকার। একা। একলা।



"কাগজকুচি" তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এছাড়া 30 টির বেশী কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে সাংবাদিকতার কাজে যুক্ত থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। 12 টির বেশি পত্রিকা সম্পাদনার কাজে যুক্ত থেকেছেন। এখন তিনি সম্পাদক " কবি সম্মেলন "। মাসিক সাহিত্য পত্রিকা। শিশু কিশোর একাডেমী সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সঙ্গে যুক্ত থেকে কবিতাপ্রেমী মানুষটি তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহ দিয়েছেন আজীবন। কবিতাকে ভালোবেসে নির্মাণ করে চলেছেন কবিতা বাসর। আধুনিক যাপন চিত্রের ধারাপাত। কবি বিষ্ণু দে পুরস্কার , কবিজীবনানন্দ দাশ পুরস্কার ,বিদ্যাসাগর পুরস্কার সহ নানান পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত তিনি। 



তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কবিতা -

মুক্তি
 

মুক্তি লেখা সাদা বাড়ি, মুক্তি লেখা ধুলোর আভাস
মুক্তি লেখা কালো রাস্তা, পৌঁছেছে কেরানিটোলায়
কে যাবে, কীভাবে যাবে, পাখা মেলবে কোথায় কোথায়
জানি না তেমনভাবে আপাদমস্তক, তবে কিনা
অগাধ নদীর দেশে একদলা মুক্তি পড়ে আছে!

 

দুঃখ
 

বনের মধ্যে আবার যেন ভেংচি কাটছে কেউ
হঠাৎ খুবই ঘাম ঝরছে শিরায় ও লোমকূপে
কোমর থেকে কুলকুলিয়ে রক্ত নামছে নীচে
সূক্ষ্ম অঙ্গ ছিট্‌কে গেল, সূর্য নিল বিদায়

বিদায়-লেখা সূর্যে এখন কতই বা আর যাব
চড়াম চড়াম ঢাক বাজছে, আঁচড়ে দিল মালিক
বউ গিয়েছে নতুন কোনো সওদাগরের বাড়ি –
কালো মেয়ের দুঃখ অনেক, কান্না এল ঝেঁপে!

 

রক্ত
 

আবার আমি রক্ত খেতে মাঠের কাছে এলাম
রক্তগুলো কেমন যেন, আলুনি আর সাদা
আর তা ছাড়া… ফাঁকা মাঠের ফাটল দিয়ে ঘেরা
ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস, উড়ছে মরা পাতা
রক্ত ছাড়াই নদীর শেষে পালিয়ে যাচ্ছি, কুকুর!

 

প্রেমিক
 

আমরা দুজনেই প্রেমে মশগুল ছিলাম।
তিনশো তলা ইমারতের টঙ থেকেও
ভোলেভালা মানুষ শুনতে পেত তোমার প্রেমার্তি।
তোমার গোল গোল কান্নায় চাঁদের ছায়া পড়ত।
তুমি কোনোদিন জানতেই পারলে না,
একদিন আমিও তোমার
সর্বংসহ প্রেমিক ছিলাম!

 

বঙ্গে শরৎ
 

আবার শরৎ এল – কুলুকুলু সন্ধ্যার বাতাস
আবার কুন্দফুলে চন্দ্রমার হাসি
নতুন ইঙ্গুদীতেলে জবজবে দূরের কবিতা
তোমার মতন কালো, ক্ষীণকায় কবিগুলি
ক্ষিরাই নদীর কূলে পেতেছে আসর

আবার স্রোতের ধাক্কা – ডুবুডুবু বঙ্গে শরৎ!


=================================

 



Sunday, 1 November 2020

দৈনিক শব্দের মেঠোপথ

∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆
              জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য

                       অরুণ মিত্র 
                    শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
==============ππππππ============
           Doinik Sabder Methopath
          Vol _179. Dt - 02.11.2020
            ১৬ কার্তিক, ১৪২৭. সোমবার
÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷√√√√√√√÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷

" এ জ্বালা কখন জুড়োবে?
 আমার এই বোবা মাটির ছাতি ফেটে চৌচির
উঠোনের ভালোবাসার ভোর এক মুঠো ছাই হয়ে ছড়িয়ে যায় শুকনো লাউডগার মাচায়,
 খড়ের চালে কাঠবিড়ালীর মতো পালায় অনেক দিনের আশা,
শুধু ভাসা-ভাসা কথার শূন্যে লেগে থাকে এক জলমোছা দৃষ্টি দুপুরের সূর্য হয়ে।
কোথায় সে আকাঙ্খাকে পোষবার সংসার
ভবিষ্যৎকে আদর করবার সংসার।
গড়বা্র আদর করবার,
ফুলে ফুলে কাকলিতে মিলিয়ে দেবার।
 মিলিয়ে গেল তা এই ক্ষোভে।
এ জ্বালা কখন জুড়োবে?”
              (এ জ্বালা কখন জুড়োবে?)

জন্ম - ২ নভেম্বর, ১৯০৯ খ্রীস্টাব্দ। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রথিতযশা কবি ও ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের খ্যাতনামা অধ্যাপক ও অনুবাদক। তিনি যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন অধ্যাপক। 

১৯০৯ সালের ২ নভেম্বর অধুনা বাংলাদেশের যশোর শহরে কবি অরুণ মিত্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতার নাম হীরালাল মিত্র ও মায়ের নাম যামিনীবালা দেবী। অল্পবয়সেই অরুণ মিত্র কলকাতায় চলে

অল্প বয়সেই অরুণ মিত্র কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতার বঙ্গবাসী স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূত্রপাত ঘটে। ১৯২৬ সালে এই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২৮ সালে বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আইসিএস পরীক্ষা ও ১৯৩০ সালে রিপন কলেজ (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে ডিস্টিংশন সহ বিএ পাস করেন। এই সময়ে সাহিত্যের চেয়ে সংগীতের প্রতি তাঁর অধিক আকর্ষণ ছিল। আবার এই সময়েই ভিক্টর হুগোর উপন্যাস ইংরেজি অনুবাদে পড়ে ফরাসি সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ফরাসি ভাষা শিখতে শুরু করেন। বিএ পাস করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পড়া শুরু করেন। কিন্তু পিতামাতার জ্যেষ্ঠপুত্র হওয়ায় সাংসারিক দায়দায়িত্বের চাপে এমএ পড়া অসমাপ্ত রেখেই ১৯৩১ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি গ্রহণ করতে বাধ্য হন। ১৯৪২ সাল পর্যন্ত আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি করেছিলেন তিনি। এই সময়ে বিভিন্ন সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, কবি ও লেখক গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর পরিচিতি ঘটে। বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবী সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার ব্যক্তিগত সম্পর্কসূত্রে ছিলেন তাঁর নিকট আত্মীয়। আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি করার সময়েই মার্ক্সবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন অরুণ মিত্র। সেই সূত্রে 'বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ' ও 'সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি'র সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আনন্দবাজার ত্যাগ করার পর তিনি যোগ দেন সতেন্দ্রনাথ মজুমদার সম্পাদিত 'অরণি' পত্রিকায়। ফরাসি সরকারের আহ্বানে ১৮৪৮ সালে বৃত্তি গ্রহণ করে গবেষণার্থে ফ্রান্স যাত্রা করেন। প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর গবেষণা কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ডক্টরেট লাভ করেন। ফরাসি সাহিত্য অধ্যয়নের পর ১৯৫২ সালে দেশে ফিরে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপকের পদে বৃত হন। এরপর দীর্ঘ কুড়ি বছর সপরিবারে এলাহাবাদে-ই বসবাস করেন। ১৯৭২ সালে কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করে ফিরে আসেন কলকাতায়।

১৯৯০ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানিক ডি. লিট. উপাধিতে ভূষিত করে। ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যে নিরন্তর গবেষণার জন্য ১৯৯২ সালে ফরাসি সরকার তাঁকে 'লিজিয়ন অফ অনার' সম্মানে ভূষিত করে। ২০০০ সালের ২২ অগস্ট কলকাতায় অরুণ মিত্র প্রয়াত হন।

সাহিত্য

মাত্র ষোলো বছর বয়সে 'বেণু' নামে একটি কিশোর পত্রিকায় প্রথম অরুণ মিত্রের কবিতা প্রকাশিত হয়। তাঁর মৌলিক কাব্যগ্রন্থগুলি হল প্রান্তরেখা (১৯৪৩), উৎসের দিকে (১৯৫০), ঘনিষ্ঠ তাপ(১৯৬৩), মঞ্চের বাইরে মাটিতে (১৯৭০), শুধু রাতের শব্দ নয় (১৯৭৮), প্রথম পলি শেষ পাথর (১৯৮১) ও খুঁজতে খুঁজতে এতদূর (১৯৮৬), শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৮৫)।। 

সম্মাননা : 

শুধু রাতের শব্দ নয় কাব্যগ্রন্থটি ১৯৭৯ সালে রবীন্দ্র পুরস্কারে এবং খুঁজতে খুঁজতে এতদূর কাব্যগ্রন্থখানি ১৯৮৭ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হয়।

১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর একমাত্র উপন্যাস

 " শিকড় যদি চেনা যায়। "

তাঁর মৌলিক প্রবন্ধ গ্রন্থ -"ফরাসি সাহিত্য প্রসঙ্গে " প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। বাংলায় তিনি একাধিক গ্রন্থ অনুবাদও করেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল -

"ভারত: আজ ও আগামীকাল (১৯৫১), কাঁদিদ বা আশাবাদ (১৯৭০), সে এক ঝোড়ো বছর (১৯৭০), ভারতীয় থিয়েটার (১৯৭৫), গাছের কথা (১৯৭৫), মায়াকোভস্কি (১৯৭৯), সার্ত্র ও তাঁর শেষ সংলাপ (১৯৮০), অন্যস্বর (১৯৮৩) ও পল এলুয়রের কবিতা (১৯৮৫)।

কবিতা -১

"আমি সাদা ভাত মুঠোয় তুলেছি

আর আমার ওপর অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়ছে

তর্জনগর্জন মাঠ থেকে ছুটে এসে ঘরের মধ্যে

আমি হাত ওঠাচ্ছি ঝড়ে

 আমি ভাবছি ঝিরঝিরে বাতাসটা আমার

পালকগুলো আমার

ঝাউয়ের ঝারি আমের বোল আমার

ভাবতে ভাবতেই আমি ডুবছি চোরা টানে”.

(সাদা ভাত মুঠোয় তুলেছি)

কবিতা -২

আর একটু থাকো

তোমাকে এই স্বরব্যঞ্জনে রেখেছি,

তুমি তো মাঠের মেয়ে

খঞ্জনার নাচের মেয়ে,

তুমি ডানা ঝাপটাচ্ছ অনবরত ।

আর কতক্ষনই-বা তুমি থাকবে এখানে

আমার এই কলমের নীচে?


তোমাকে ডাকছে রোদের আকাশ

ঝরন্ত ঘামের মাঠ,

এত ভালোবাসতেও তুমি পারো তাদের !

তবু বলছি তুমি আমার আঙুলের ডগায়

এই লাল বিন্দুতে একটু থাকো

আমাকে একটু শেখাও

কী করে রক্তলিপি লিখতে হয়

তারপর সেই ছাপ মাঠময়,

ভরা রোদের আকাশে

তোমার সঙ্গে জ্বলন্ত নাচের বর্ণমালা

আর আমাদের ওড়া একসঙ্গে ।

কবিতা-৩

ঘাসফড়িং


একটা ঘাসফড়িং এর সঙ্গে আমার গলায় গলায় ভাব হয়েছে,

ভাব না করে পারতামই না আমরা।

ঝিরঝির বৃষ্টির পর আমি ভিজে ঘাসে পা দিয়েছি

অমনি শুরু হয়ে গেল আমাদের নতুন আত্মীয়তা।

সবুজ মাথা তুলে কত খেলা দেখাল ঘাসফড়িং,

তার কাছ থেকে চলে আসার সময় আমার কী মনখারাপ

বলে এলাম আমি আবার আসব,

আমার ঘরের দরজা এখন সবুজে সবুজ।


এই আবার ঝিরঝির বৃষ্টি

আমি কথা দিয়ে এসেছি

ভিজে ঘাসের ওপর আমাকে যেতেই হবে আবার।


∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆



  শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

" ভারত বিশাল দেশ। বাংলা ভাষা ভারতবর্ষের দ্বিতীয় ভাষা। বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে শুধু ভারতবর্ষে যত বাঙালির বসবাস, ওখানে তাদের সংখ্যা দ্বিতীয়। অত বড় দেশে দ্বিতীয় ভাষা বাংলা। পৃথিবীতে সপ্তম। সোজা কথা! এত লোক যে ভাষায় কথা বলে, সেটা বিপন্ন হয়ে যাবে, এটা হয় নাকি? তা ছাড়া বাংলাদেশের কারণে, একুশে ফেব্রুয়ারির কারণে ইউনেস্কো বাংলা ভাষাকে এখন স্বীকৃতি দিয়েছে। আসলে বাংলা হচ্ছে বিশ্বের মিষ্টিতম ভাষা। এই মিষ্টিতম ভাষা মরবে না। "

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ২রা নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে তার জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময়, তার পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরীরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তার জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি প্রথমে জলপাইগুড়ির ফনীন্দ্রদেব ইনস্টিটিউশন এ, ক্লাস Vlll অব্দি পড়েন, তারপরতিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।


গ্রন্থতালিকা :-

তার প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে ঐ একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে ঘুণ পোকা নামক তার প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তার প্রথম উপন্যাস মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি। শবর দাশগুপ্ত তার সৃষ্ট অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র।

উপন্যাস:-

যাও পাখি ১৯৭৬

উজান

কাগজের বউ

কীট

ক্ষয়

চোখ

জাল

দিন যায় 

দূরবীন

পারাপার

ফুলচোর

বিকেলের মৃত্যু

মানবজমিন

ঘুণ পোকা ১৯৬৭

আশ্চর্য ভ্রমণ 

রঙীন সাঁকো

পাপ

তিন হাজার দুই

নয়নশ্যামা

হৃদয়বৃত্তান্ত

নানা রঙের আলো

গয়নার বাক্স

অসুখের পরে 

গতি

প্রজাপতির মৃত্যু ও পুর্নজন্ম

দ্বিতীয় সত্তার সন্ধানে

আদম ইভ ও অন্ধকার

নিচের লোক উপরের লোক

ক্রীড়াভূমি

সম্পত্তি

তিথি

পার্থিব

চক্র

আলোয় ছায়ায়

আলোর গল্প ছায়ার গল্প

ঋণ 

কাপুরুষ

কালো বেড়াল সাদা বেড়াল

গুহামানব

দ্বিচারিনী

নীলু হাজরার হত্যা রহস্য 

পিদিমের আলো

ফজল আলি আসছে

মাধব ও তার পারিপার্শ্বিক

লাল নীল মানুষ

শ্যাওলা

শিউলির গন্ধ

সাঁতারু ও জলকন্যা

সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে

ছায়াময়

দৃশ্যাবলী

বোধন ও বিসর্জন

এই সব পাপটাপ

হাটবার

চেনা অচেনা

যুগলবন্দী

সেই আমি

বাসস্টপে কেউ নেই 

কাছের মানুষ

হরিপুরের হরেককান্ড

বাঙালের আমেরিকা দর্শন

একাদশীর ভূত

ওয়ারিশ

চারদিক

গোলমাল

আক্রান্ত

ফেরীঘাট

মাধুর জন্য

জোড়বিজোড়

বড়সাহেব

নেকলেস

নরনারী কথা

খুদকুঁড়ো

অদ্ভুতুড়ে সিরিজ সম্পাদনা

মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি - ১৯৭৮

গোঁসাইবাগানের ভূত - ১৯৭৯

হেতমগড়ের গুপ্তধন - ১৯৮১

নৃসিংহ রহস্য - ১৯৮৪

বক্সার রতন - ১৯৮৪

ভুতুড়ে ঘড়ি - ১৯৮৪

গৌরের কবচ - ১৯৮৬

হিরের আংটি - ১৯৮৬

পাগলা সাহেবের কবর - ১৯৮৭

হারানো কাকাতুয়া - ১৯৮৭

ঝিলের ধারে বাড়ি - ১৯৮৮

পটাশগড়ের জঙ্গলে - ১৯৮৯

গোলমাল - ১৯৮৯

বনি - ১৯৯০

চক্রপুরের চক্করে - ১৯৯০

ছায়াময় - ১৯৯২

সোনার মেডেল - ১৯৯৩

নবিগঞ্জের দৈত্য - ১৯৯৪

কুঞ্জপুকুরের কান্ড - ১৯৯৫

অদ্ভুতুড়ে - ১৯৯৬

পাতালঘর - ১৯৯৬

হরিপুরের হরেক কান্ড - ১৯৯৭

দুধসায়রের দ্বীপ - ১৯৯৭

বিপিনবাবুর বিপদ - ১৯৯৮

নবাবগঞ্জের আগন্তুক - ১৯৯৯

ষোলো নম্বর ফটিক ঘোষ - ২০০০

গজাননের কৌটো - ২০০১

ঝিকরগাছায় ঝঞ্ঝাট - ২০০২

রাঘববাবুর বাড়ি - ২০০৩

মোহন রায়ের বাঁশি - ২০০৪

সাধুবাবার লাঠি - ২০০৫

ঘোরপ্যাঁচে প্রাণগোবিন্দ - ২০০৫

ডাকাতের ভাইপো - ২০০৭

অঘোরগঞ্জের ঘোরালো ব্যাপার - ২০০৮

উঁহু - ২০০৯

গোলমেলে লোক - ২০১০

বটুকবুড়োর চশমা - ২০১১

ময়নাগড়ের বৃত্তান্ত - ২০১১

অষ্টপুরের বৃত্তান্ত - ২০১২

মদন তপাদারের বাক্স - ২০১২

সর্বনেশে ভুল অঙ্ক - ২০১৪

ভলু যখন রাজা হল - ২০১৫

হাবু ভুঁইমালির পুতুল - ২০১৬

নন্দীবাড়ির শাঁখ - ২০১৭

জং বাহাদুর সিংহের নাতি - ২০১৭

আসমানির চর - ২০১৮

গড় হেকিমপুরের রাজবাড়ি - ২০১৯

গল্প সম্পাদনা

একটুখানি বেঁচে থাকা

গঞ্জের মানুষ

উকিলের চিঠি

ঘণ্টাধ্বনি

হারানো জিনিস

লড়াই

মশা

একটা দুটো বেড়াল

বাঘ

খানাতল্লাস

ক্রিকেট

ভেলা

চিড়িয়াখানা

শুক্লপক্ষ

হাওয়া-বন্দুক

খবরের কাগজ

তৃতীয় পক্ষ

ইচ্ছে

পুনশ্চ

কথা

পুরোনো চিঠি

হরীতকী

বনমালীর বিষয়

সূত্রসন্ধান

আশ্চর্য প্রদীপ

ঘরের পথ

প্রিয়া মধুবন

আমি সুমন

দৈত্যের বাগানে শিশু

ট্যাংকি সাফ

লুলু

ওষুধ

বন্দুকবাজ

জমা খরচ

অনুভব

সুখের দিন

গর্ভনগরের কথা

খগেনবাবু

সাঁঝের বেলা

সংবাদ

অপেক্ষা

হাওয়া বদলের চিঠি

ভাগের অংশ

দেখা হবে

সম্পূর্ণতা

খেলা

বৃষ্টিতে নিশিকান্ত

চিঠি

জ্যোৎস্নায়

মাসী

হলুদ আলোটি

প্রতীক্ষার ঘর

উত্তরের ব্যালকনি

সাপ

স্বপ্নের ভিতরে মৃত্যু

আত্মপ্রতিকৃতি

মৃণালকান্তির আত্মচরিত

ভুল

চারুলালের আত্মহত্যা

আমাকে দেখুন

কার্যকারণ

তোমার উদ্দেশে

অবেলায়

সেই আমি, সেই আমি

খেলার ছল

পটুয়া নিবারণ

সাদা ঘুড়ি

উড়োজাহাজ

কীট

বয়স

রাজার গল্প

সোনার ঘোড়া

মুনিয়ার চারদিক

ডুবুরী

নীলুর দুঃখ

সাধুর ঘর

সুখ দুঃখ

আমরা

শেষবেলায়

পুরনো দেওয়াল

চিহ্ন

বন্ধুর অসুখ

কয়েকজন ক্লান্ত ভাঁড়

ছবি

দূরত্ব

ঝড়

সাইকেল

সম্পর্ক

মনে থাকা

পয়মন্ত

দুর্ঘটনা

দৌড়

বিয়ের রাত

মুহূর্ত

লক্ষ্মীপ্যাঁচা

ঘরজামাই

নবদূর্গা

হ্যাঁ

জন্ম

সংসার

বানভাসি

হাতুড়ি

সংলাপ

কৈখালির হাটে

ক্রীড়াভূমি

রাজার বাগানে

নসিরাম

বুদ্ধিরাম

গন্ধটা খুব সন্দেহজনক

চলচ্চিত্র:-

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বহু উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। তার সৃষ্ট শবর চরিত্রটি নিয়ে তৈরী হয়েছে তিনটি রহস্য চলচ্চিত্র। এছাড়াও অদ্ভুতুড়ে সিরিজ অবলম্বনে বিভিন্ন সিনেমা তৈরী হয়েছে। তার কাহিনী অনুসারে বানানো চলচ্চিত্রগুলি হলঃ

আজব গাঁয়ের আজব কথা

বাশিওয়ালা

পাতালঘর

গোঁসাইবাগানের ভূত

দোসর

কাগজের বৌ

গয়নার বাক্স (চলচ্চিত্র)

ছায়াময়

সাধুবাবার লাঠি

মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি

ঈগলের চোখ

আসছে আবার শবর

হীরের আংটি

আশ্চর্য প্রদীপ (চলচ্চিত্র)

এবার শবর

পুরস্কার :-

বিদ্যাসাগর পুরস্কার (১৯৮৫) - শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য।

আনন্দ পুরস্কার (১৯৭৩ ও ১৯৯০)

সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৮৮)- মানবজমিন উপন্যাসের জন্য।

বঙ্গবিভূষণ (২০১২)




"এসব উপন্যাসের পাত্রপাত্রীদের আঁকতে গিয়ে আমার কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা হলো: মানুষের জীবন যেমন হয়, চরিত্রদের সেভাবেই উপস্থাপন করব; মানুষের জীবন যেমন হওয়া উচিত, সেভাবে উপস্থাপন করব না। আসলে আমি জানি না উপন্যাসগুলো কেন পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। আর এ উপন্যাসগুলোর বিষয়-আশয় নিয়ে অনেক কথা বলেছি, এখন আর বলতে ভালো লাগে না, মনেও থাকে না সবকিছু।"

যৌবনে ভয়ানকভাবে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন শীর্ষেন্দু মুেখাপাধ্যায়, জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন এবং একসময় আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন। শেষ পর্যন্ত মা–বাবা তাঁকে শ্রীশ্রী অনুকূলচন্দ্র ঠাকুরের কাছে নিয়ে যান। ঠাকুরের সান্নিধ্যে জীবন বদলে যায় তাঁর।


* তাঁর জীবনের প্রথম দুটি গল্প ফেরত এসেছিল দেশ পত্রিকার দপ্তর থেকে। তৃতীয়টি পাঠানোর পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যদি এটি ছাপা না হয়, তাহলে লেখালেখিই ছেড়ে দেবেন। ‘জলতরঙ্গ’ নামে সেই তৃতীয় গল্পটিই ছিল শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ছাপা হওয়া প্রথম লেখা।


* প্রথম উপন্যাস ঘুণপোকা লিখেছিলেন সাগরময় ঘোষের তাগাদায়। ঘুণপোকার শ্যামল চরিত্রটি অনেকটা তাঁর নিজের আদলেই গড়া।


* শিশু-কিশোর জন্য কিছু লেখার ইচ্ছা ছিল না শীর্ষেন্দুর। কিন্তু আনন্দমেলার তৎকালীন সম্পাদক ও কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অনুরোধে লেখেন প্রথম কিশোর গল্প। এমনকি নীরেন্দ্রনাথ অনেকটা জোর করেই তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেন প্রথম কিশোর উপন্যাস মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি। এই উপন্যাসে ঠাকুরমার চরিত্রটি সরোজিনী দেবী নামে তাঁর এক বিধবা ঠাকুরমার আদলে গড়া।


* তাঁর তিন বিখ্যাত কিশোর উপন্যাস গোঁসাইবাগানের ভূত, ছায়াময় ও মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি নিয়ে বানানো হয়েছে তিনটি সিনেমা এবং তিনটিই বক্স অফিস মাৎ করেছে।


* শীর্ষেন্দুর প্রিয় উপন্যাস সতীনাথ ভাদুড়ির লেখা ঢোঁড়াই চরিত মানস। এ ছাড়া কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাসও তাঁর প্রিয়। শরৎচন্দ্রের দেবদাসকে তিনি ‘অপরিণত হাতের সৃষ্টি’ বলে মনে করেন। কিন্তু এক শ বছর ধরে দেবদাস-এর সমান জনপ্রিয়তাও তাঁকে বিস্মিত করে।


* তাঁর সৃষ্ট বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র শবর দাশগুপ্ত। ‘শবর সিরিজ’–এর প্রথম বই ঋণ। শবর চরিত্র নিয়ে পরিচালক অরিন্দম শীল বানিয়েছেন এবার শবর, ঈগলের চোখ ও আসছে আবার শবর নামে একে একে তিনটি সিনেমা।


* বাংলাদেশি নাটকের ভক্ত শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। তাঁর মতে, এ দেশের নাটকের গল্পগুলো খুব চমৎকার ও মিষ্টি। তিনি বলেন, ভারতে বাংলাদেশের চ্যানেল দেখা যায় না বটে, কিন্তু কোনো না কোনোভাবে নাটকগুলো তাঁরা দেখেন।


* সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তবে তুই-তোকারির সম্পর্ক ছিল শুধু সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের সঙ্গে। মুস্তাফা সিরাজের অতিমাত্রায় ‘কর্নেল সিরিজ’-এ ঝুঁকে পড়াকে মানতে পারেননি শীর্ষেন্দু। এ জন্য সিরাজকে ভর্ৎসনাও করতেন। কারণ তিনি মনে করতেন,‘কর্নেল সিরিজ’ লেখা কমিয়ে দিলে সিরাজের কাছ থেকে অলীক মানুষ-এর মতো আরও ভালো ভালো লেখা পাওয়া যাবে।

∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆










শুভ জন্মদিন শ্রদ্ধাঞ্জলি। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ।‌ একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ। Dt -26.11.2024. Vol -1059. Tuesday. The blogger post in literary e magazine.

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়   (২৬ নভেম্বর ১৮৯০ — ২৯ মে ১৯৭৭)  একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ.  মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্...