Sunday, 26 September 2021
Saturday, 25 September 2021
জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। ব্রাত্য বসু। ২৫.০৯.২০২১. Vol -506 The blogger in literature e-magazine.
ব্রাত্য বসু
জন্ম ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৯, কলকাতা. একজন ভারতীয় বাঙালি নাট্যকার, নাট্য পরিচালক, অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ.অধ্যাপক ড. বিষ্ণু বসু এবং মাতা শিক্ষাবিদ্ ড. নীতিকা বসু। তাঁর সম্পূর্ণ নাম ছিল ব্রাত্যব্রত বসু রায় চৌধুরি। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য অধ্যয়ন করার পর কলকাতার সিটি কলেজে অধ্যাপক রূপে যোগ দেন। গণকৃষ্টি নামে এক থিয়েটার গ্রুপে সাউন্ড অপারেটর হিসেবে তার নাট্যজীবন শুরু হয়েছিল.২০০৮ সালে তিনি 'ব্রাত্যজন' নামে নিজস্ব একটি থিয়েটার গ্রুপ গঠন করেন.
উৎপল দত্তের নাট্য রচনার পর এ দেশের প্রথিতযশা দু চারটি নাট্যগোষ্ঠী নাট্য রূপান্তরের চর্চায় ঝুঁকেছিলেন। তার বড় একটা কারণ ছিল সময় উপযোগী নাটকের অভাব। তারপর আশির দশকে বাংলা নাট্যসাহিত্য সমৃদ্ধ হল মোহিত চট্টোপাধ্যায়, মনোজ মিত্র - এঁদের নাট্যচর্চায়। আর ছিলেন বাদল সরকার এবং আরও অনেকে। স্মৃতিতে ধারণযোগ্য নাটক এঁরা নিশ্চয়ই রচনা করেছেন এবং এ বিষয়ে সহমতের অভাব হবে না। সাম্প্রতিক কালের নাট্যচর্চার বিবর্তনে ব্রাত্য বসু একটি জাম্পিং ঝপাং। কেননা বাংলা নাটকের অনেকখানি পরিবর্তন ঘটল তাঁর কলমের জোরে। ব্রাত্য বসুর প্রথম নাটক দেখি 'অশালীন'। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে নাটকের এরকম একটি নাম এবং দর্শকের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসময় অভিব্যক্তির চোরাটান আমাকে পৌঁছে দিয়েছিল কোনো এক সন্ধ্যায় অকাদেমিতে 'অশালীন' অভিনয়ের মাহেন্দ্রক্ষণে। তারপর 'অরণ্যদেব', 'মুখোমুখি বসিবার', 'শহর ইয়ার', 'উইঙ্কল টুইঙ্কল', 'ভাইরাস এম্', 'সতেরোই জুলাই' এবং আরো নানা নাটক রচনা পরিচালনা ও অভিনয়ে ব্রাত্য স্বমহিমায় ভাস্বর এবং তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েছে দ্রুত।
তিনি কালবেলা সহ একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেছেন।
দশ বছর পর তিনি পুনরায় সিনেমা নির্দেশনার কাজ করছেন যার নাম "ডিকসেনারি"।
অভিনয়
| নাম | সাল |
|---|---|
| গ্যাংস্টার | ২০১৬ |
| ডবল ফেলুদা | ২০১৬ |
| অ্যাবি সেন | ২০১৫ |
| নাটকের মত | ২০১৫ |
| যোগাযোগ | ২০১৫ |
| পারাপার | ২০১৪ |
| এক এক্কে দুই | ২০১৪ |
| মহাপুরুষ ও কাপুরুষ | ২০১৩ |
| বালুকাবেলা ডট কম | ২০১২ |
| তিন কন্যা | ২০১২ |
| মুক্তধারা | ২০১২ |
| হেমলক সোসাইটি | ২০১২ |
| হ্যালো মেমসাহেব | ২০১১ |
| ইচ্ছে | ২০১১ |
| তারা | ২০১০ |
| কালবেলা | ২০০৯ |
| হারবার্ট | ২০০৬ |
তিনি দু'টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন: রাস্তা ও তারা। প্রথমটির বিষয়, এক যুবকের সন্ত্রাসবাদী হয়ে ওঠা, এবং দ্বিতীয়টির বিষয়, সমাজ ও প্রেমের ব্যর্থতা।
১৯৯৮ সালে তিনি শ্যামল সেন স্মৃতি পুরস্কার ও ২০০০ সালে দিশারী পুরস্কার অর্জন করেন। ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে দমদম কেন্দ্র থেকে পুনরায় বিজয়ী হয়ে এখন রাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
ব্রাত্য বসুর নাটক থেকে নাট্যে নতুন শতাব্দীর অন্তর্ঘাত; শম্পা ভট্টাচার্য; প্রথম প্রকাশ: ২০১৫, দীপ প্রকাশন - কলকাতা, পৃষ্ঠাঃ ১০২; ISBN:
প্রথম দর্শনে বইটির কৃশ চেহারা দেখে কিছুটা সন্দেহ দেখা দিয়েছিল, বাংলা নাট্যক্ষেত্রে যাঁর কৃতিত্বের মূল্যায়ন করার চেষ্টায় এটি লেখা—বোর্ডবাঁধাই সত্ত্বেও মাত্র একশো-দু পৃষ্ঠায় লেখকের পক্ষে তা সম্পন্ন করা সম্ভব কিনা! কেননা, পঞ্চাশ প্রাপ্ত হওয়ার আগেই তাঁর স্বীকৃতির পরিব্যাপ্তি আজ সুপ্রমাণিত—হিসেব মতো বাইশ বছর বয়সে তাঁর প্রথম মঞ্চাবতরণের সূচনা ধরে, এখনো কালগত ভাবে পঁচিশ স্পর্শ করেনি। পাঁচ বছর পরে, যখন তিনি একই সঙ্গে নাটককার, নির্দেশক, অভিনেতার কাজ নিয়ে কাজ করতে শুরু করলেন—সেই সূচক সময় থেকে হিসেব করলে এখনো তাঁর মঞ্চ-সম্পৃক্তি পূর্বোক্ত তিনটি বৃত্তির দু-দশকও পূর্ণ হয়নি। ভণিতা ছেড়ে আসল প্রসঙ্গে এসে বইটির দীর্ঘ শিরোনাম উল্লেখ করি—ব্রাত্য বসু: নাটক থেকে নাট্যে নতুন শতাব্দী অন্তর্ঘাত, লিখেছেন শম্পা ভট্টাচার্য। পেশায় অধ্যাপক—কিন্তু অনেকদিন তিনি পত্র-পত্রিকায় মূলত নাট্য ও নাটক বিষয়ে প্রবন্ধাদি লিখে বহুতর চর্চায় নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন। এছাড়াও, নাটক ও নাটককার প্রভৃতি অবলম্বন করে একাধিক গ্রন্থ তিনি লিখেছেন। বোধ হয়, আলোচ্য বই, সংখ্যার হিসেবে তাঁর লেখা তৃতীয়। প্রজ্ঞার বিচারে নয়—বাঙালি সমাজে যেখানে প্রতিভার মূল্যায়ন করা হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বয়সের দিক থেকে কতটা প্রবীণ পঙ্ক্তিতে তিনি অন্তর্ভুক্ত সেই নিরিখে, সেখানে প্রৌঢ়তায় পৌঁছানোর আগেই এই অনুভূতি প্রশংসার্হ উদ্যোগ বলতেই হয়।
যে সংশয়ের কথা দিয়ে এই আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে—সেটা নিছক কথার কথা। কেননা শুধু পৃষ্ঠাঙ্কের পরিসর থেকে কোনো বইয়ের উৎকর্ষ বিচার করা বাতুলতা, তা সত্ত্বেও এই প্রসঙ্গ এল শুধু এইটুকু ভেবে—বহুদিন ধরে বাংলা মঞ্চে ব্রাত্যর প্রণোদনায় যে–সব কাজ সংঘটিত হয়েছে—কোনটিই নিছক নিয়মরক্ষা বা ছোট মাপের কাজ নয়। তাঁর প্রবর্তিত কোম্পানি থিয়েটার, ব্রাত্যজন নাট্যপত্র, প্রচার উদ্যোগের বহুমুখী আয়োজন, আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব, আলোচনা সভা, সম্মান সংবর্ধনা জ্ঞাপন, প্রকাশনা—এই সময়ের আর কোনো দল কিংবা অধিনায়ককে আয়োজন করতে দেখিনি। এসব কিছুর সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেও—নাটক লেখা, নির্দেশনা বা নটের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। আর, এসবের বাইরেও নিয়মিত যে-কাজটা তিনি করে যাচ্ছেন—বর্তমানে জীবিত বরিষ্ঠ নাট্যজনদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ, অজস্র উপাদানে সমৃদ্ধ এইসব কথোপকথনগুলি ভবিষ্যকালের শিকড়-সন্ধানী গবেষকদের নিশ্চয় প্রভূত কাজে লাগবে। এ ধরনের কাজে লিপ্ত থাকলে, এমন নয় যে সেটা নাট্যক্ষেত্রে তাঁকে প্রভূত প্রতিষ্ঠা এনে দেবে—বোঝা যায় এসব কিছুর ভেতরে একটা গভীর আত্মতৃপ্তি লাভই একান্ত আকাঙ্ক্ষার।
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই ব্রাত্য—লেখা অভিনয় ও পরিচালনা—এই তিনটি কাজ করে আসছেন। এবং পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছে তিনি তাঁর স্থিত উপলব্ধির কথায় তিনি জানিয়েছেন, ‘আমি একেবারে ভেতর থেকে বুঝেছি এই তিনটে কাজ পুরোটা নিয়েই আমি—সাফল্য ও ব্যর্থতা সহ। তিনটে কাজই একেবারে সৃজনের গভীরে গিয়ে একাকার, অপৃথগ্যত্ননিবর্ত। ভালো-মন্দ, সাদা-কালো, পারা-না-পারা, সাফল্য ও ব্যর্থতা, মেঘ ও রৌদ্র সমেত। তবে এই তিনটে কাজই আমি করতে চাই, তাদের ভালোবাসতে চাই, তাদের থেকে কমবেশি প্রত্যাশার বা অপমান বা অবহেলা পেলেও তাদের আঁকড়ে ধরতে চাই। যতদিন পারি।'
এই ব্রাত্য বসুর আপাতত সামগ্রিক নাট্যচর্চা অবলম্বন করে কেন এই বই লিখলেন, সে বিষয়ে লেখক স্বয়ং খুব অল্প কথায় নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সারাংশ উল্লেখ করেছেন শুরুতে। কীভাবে আমাদের জীবনে দৈনন্দিনের এক একটা মুহূর্ত আগুনের আঁচ আর উত্তাপকে তাঁর নাটকের ভিতরে সঞ্চার করিয়ে দিতে পারেন তারই প্রমাণ প্রস্তুত করতে চেয়েছেন লেখক। সে-সব ঘটনার প্রতি আমাদের উদাসীনতা, ভয় কিংবা আর্তনাদ আমরা বুঝেও বুঝতে পারি না—ব্রাত্যর নাট্যে সেগুলিরই প্রত্যাবর্তন দেখে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতে পারি। চক্ষুষ্মান হয়ে উঠি। শম্পা বলেছেন, ‘তাঁর লেখায় অবচেতনা, চেতনা, অধিচেতনা, কৃষ্ণবর্ণ পাতাল, রঙিন পৃথিবী, সুদূরের নীলিমা, ব্যক্তির সংকট, সভ্যতার স্বর্ণালী মুহূর্ত সব মিলেমিশে যাবে। তাঁর লেখা থেকে পাঠকরা অনেক সময় খুঁজে নিতে পারেন তাদের জীবনে সদৃশ কোনো গভীর মুহূর্ত, সেইটাকে ভেবে নিতে পারেন প্রধান বা একমাত্র। তাঁর নাটক পড়ে আমরা অন্তর্দীপ্ত হই’। এই মন্তব্যের দৃষ্টান্তে আমরা বুঝতে পারি—লেখক এখানে আলোচনাকে প্রতিষ্ঠা দিতে মূলত তাঁর নাটকগুলির মুদ্রিত পাঠ অনুসরণ করেছেন। এখন দেখতে হবে অধ্যায়ক্রমে তাঁর আর দুটি কাজের প্রসঙ্গ কীভাবে এসেছে, কিংবা আদৌ এসেছে কিনা!
চারটি অধ্যায়—প্রতিটিই কাব্যিক মেজাজে বেঁধে দেওয়া এক একটি নতুন শিরোনাম, তাঁর বিশ্লেষণকে একটা ভরকেন্দ্রে স্থাপন করেছে যেন। ‘রাত্রির পালক খসে খসে যায় দিগন্তের দিকে’—ব্রাত্যর নাটক যে ‘বহমান সময়ের যাত্রা বা চলা’—এক প্রকার জার্নি সেটা প্রতিপন্ন করার জন্য লেখক ব্রাত্যরই ভাষা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন: ‘একটি নাটক আসলে তাঁর পরে নাটকটির খসড়া। একটি বুনে তুলেছে আর একটিকে, সেও আসলে তারও পরেরটির মতোই অসম্পূর্ণ।' তাঁর নিজের কথা: ‘সারাজীবন আসলে আমি একটা নাটকই লিখে চলেছি’। প্রথমতম চেষ্টা রূপান্তরিত নাটক দিয়ে—ওরা পাঁচজন; কিন্তু বছর দুয়েকের মধ্যেই অশালীন লিখে যে নতুন যাত্রাপথে পা রেখেছিলেন, পরবর্তী পরিক্রমায় তা ক্রমশ স্পষ্টতা পেয়েছে। শালীন আর অশালীনের সীমারেখা ভেঙে দিয়ে—আসলে রক্ষণশীলতার অভ্যস্ত দুর্গে আঘাত হেনে নতুন এক বিষয় ভাবনার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিলেন। ঠিকই, ‘একটা নতুন চিন্তা আর চেতনা প্রকাশিত হল এ নাটকে’। ১৯৯৬ থেকে ২০০১—এই পাঁচবছর, ব্রাত্য যে-সব নাটক লিখেছেন অশালীন; মুখোমুখি বসিবার; চতুষ্কোণ, শহর ইয়ার বিশেষত প্রথমোক্ত রচনা তিনটিতে নষ্ট দাম্পত্যের সংকট কীভাবে তীব্র হয়েছে তা বুঝতে চাওয়া হয়েছে। কীভাবে নাটকে ‘ব্যক্তির উথালপাতাল হৃদয়’ সম্পর্কের টানাপোড়েনে তীব্র আকুতি লাভ করেছে তা নিছক তাত্ত্বিকতার গালভরা যুক্তি সাজিয়ে বুঝতে যাওয়া উচিত নয়। ‘মানুষের মন ও মনন, চাওয়া ও পাওয়া সোজা সাপটা কথা চলে তার নাটকে’। কীভাবে, আলোচ্যগ্রন্থে লেখকের বক্তব্যে সেটা অন্যতম উপজীব্য হয়ে উঠেছে।
এই যে ব্যক্তি মানুষের যন্ত্রণা—অবক্ষয়িত সমাজ বদলের মধ্যে পড়ে, ক্ষতবিক্ষত হতে হতে মানুষ মনে মনে প্রশ্ন তৈরি করতে চায়—আপাতদৃষ্টিতে বাইরের থেকে হয়তো রাজনৈতিক নাটকের একটা আদল আছে—কিন্তু সেটাই এ নাটকের শেষ কথা নয়। ইতিহাসবোধের ভিতর থেকে তৈরি হওয়া এই যে সব্যসাচী সেন—একে কেবল কালের হিসেবে বিচার করা যায় না, চিরকালীন সত্য সন্ধানের পথে দেশকালসমাজের আবর্তনের প্রকৃত চেহারাটা স্পষ্ট করে দেয় যেন। শম্পার পর্যবেক্ষণ সঙ্গত: ‘কালোকে আলোর চেয়ে উজ্জ্বল বানিয়ে তত্ত্ব খাড়া করে মেলানোর কথা নেই এখানে। এই নাটকে পাঠক যেন নিজের মুখোমুখি বসার সুযোগ পায়। পাঠক শান্ত হয়ে নিজের দিকে, সমাজের দিকে ফিরে তাকাতে পারে অন্তত: একবার’। স্বয়ং ব্রাত্যও এটাকে যে কোনোমতে রাজনৈতিক থিয়েটার মনে করেন না—সে অভিমত যথার্থ। আসলে তাঁর নাটকের গভীরে লুকিয়ে থাকে যে নিরাপত্তাহীন অসহায়তা—সেটা নিছক রাজনৈতিক অসহায়তা নয়—বরং ‘মহাকাব্যিক অসহায়তা’ বললেই তার ব্যাপ্তি মহত্তর সংজ্ঞায় উত্তীর্ণ হয়ে যায়। এক আশ্চর্য আত্মসমালোচনার পথেই ব্রাত্যর কলম থেকে তাই লেখা হয়েছে পেজ ফোর-এর মতো নাটক। সমকালীন সাংস্কৃতিক বাস্তবতার উপস্থাপনার জন্যই এই রচনা হয়ে উঠেছে ‘টক উইথ দ্য টাইম’। আলোচ্য অধ্যায়ের নাম দেওয়া হয়েছে ‘একটা ঠিকঠাক প্রশ্ন করতে পারাটাও সমান জরুরী’। কিন্তু কাকে? হয়তো এ-নাটকের পাঠক, কিংবা এ-নাট্যের দর্শক—নিজেকে।
পরিসর ছোটো হলেও লেখক ব্রাত্য বসুর নাটক লেখার ধারাবাহিক পর্যায়—প্রায় এক–একটি নাটকের ক্রম অনুযায়ী আলোচনা করেছেন। পত্রপত্রিকায় মুদ্রিত কিংবা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত নাটকের সংক্ষিপ্তসার, চরিত্রের পারস্পরিক অবস্থান—সমাজ-রাজনীতির প্রেক্ষিতের মধ্যে তাদের টানাপোড়েনের ধরন, যতদূর সম্ভব পাঠককে একটা নির্দেশ দিতে চেয়েছেন। এ-বইতে তাঁর লিখিত রূপটাই অনুসরণ করা হয়েছে—নাট্যের সামগ্রিকতার মধ্য দিয়ে নির্দেশক ব্রাত্য বসুর বিষয়ে খুব কিছু বলার চেষ্টা করেন নি। যদিও গত উনিশ বছর ধরে নাট্য বিষয়ক আলাপ আলোচনার পাশাপাশি তাঁর নাটক দেখেছেন ও পড়েছেন বলে জানিয়েছেন। তবে অস্বীকার করা যায় না সেই দুরূহ কাজে পূর্ব প্রস্তুতি ও নাটক দেখাকালীন গৃহীত নোট না রাখলে শুধু স্মৃতির উপর নির্ভর করে নাটক থেকে নাট্যে যাবার বিবরণ ঠিক ভাবে নিয়ে আসা যায় না। হয়তো গ্রন্থনামের সীমা শুধু নাটকের মধ্যে রাখার সিদ্ধান্ত নিলে এ প্রশ্ন উঠত না। তবে, স্বয়ং নাটককার—পত্রপত্রিকায়, গ্রন্থে নিজের রচনাকালীন সময় বিষয়ে এত উপাদান তৈরি করে দিয়ে চলেছেন—তাঁর বিষয়ে আগ্রহী গবেষক অনেক কিছুই সহজে পাবেন। শম্পা এই গ্রন্থে আলাপচারী ব্রাত্যর অনেক কথাই ব্যবহার করেছেন নিজের যুক্তি-প্রমাণকে যথাযথ করে তুলতে।
তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ের নাম যথাক্রমে: ‘তোমার মন কেন্দ্রবদ্ধ হোক তোমারই হারিয়ে যাওয়া মনে’ এবং ‘যে যার জীবনের ভেতর দিয়ে নিজের মতো করেই হেঁটে যায়’। যদিও নিজের নাটকে সচেতনভাবে কাব্যভাবনা প্রয়োগ করতে চান না বলেই ব্রাত্য বলেছেন—কিন্তু শম্পা যে বলেছেন: নাচ, গান, ছবি, কবিতা সকলের সম্মিলিত রূপ নাটক। তাই তাঁর নাটকে কবিতার ব্যবহার নাটকের দ্যোতনাকে প্রলম্বিত করতে সাহায্য করেছে বহুগুণ।’—এ প্রতিপাদ্যে সায় দিতে আমার অন্তত কোন আপত্তি নেই। বরং বিকেলে ভোরের সর্ষে ফুল-এর প্রসঙ্গে তাঁর প্রতিধানযোগ্য মন্তব্য উদ্ধৃত করা যায়: ‘কখনও কবিতা থেকে সৃষ্টি হয় ব্রাত্যর নাটক। কবিতা সেখানে মশালচির দায়িত্ব পালন করে, কখনও চরিত্ররা কথা বলে কবিতার ভাষায় কেননা কবিতার দ্যোতনা সীমাহীন, আবার কখনো কবিতা ও নাটকের মুখোমুখি সংঘর্ষে জন্ম হয় তৃতীয় কোন মাত্রা’।
বিষয় ভাবনার দিক থেকে ব্রাত্য বসুর নাটকে একঘেয়ে হয়ে ওঠার সুযোগ থাকে না—এটা তাঁর সৃজনশীলতার একটা বড়ো জোর। নিজেকে ভেঙেই গড়ে তোলার এই চেষ্টাই তাঁকে অনবরত জীবন্ত থাকার পথ দেখিয়েছে। এই চলার পথেই দর্জিপাড়ার মর্জিনারা কিংবা হেমলেট দ্য প্রিন্স অফ গরানহাটা বাংলা মঞ্চে অভূতপূর্ব আবির্ভাব হিসেবে দেখা দিয়েছে। শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় যে বলেছেন: ‘হেমলেট কোনো অর্থেই হ্যামলেট-এর রূপান্তর বা পুনর্নিমাণ নয়; কিন্তু যাঁরা হ্যামলেট পড়েছেন তাঁরা এই চকিত স্পর্শ বা প্রতিধ্বনির প্রসাদে অন্য একটা মাত্রা পেয়ে যান। কানের ভিতর দাঁড়িয়ে কালোত্তরে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা ব্রাত্য বসু তাঁর নাটকে বার বার প্রমাণ দিতে পেরেছেন। আর, সেটা বলা যায় না—শুধু একটি মাত্র নাটকই তাঁকে সেই যোগ্যতার স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। গ্রন্থকারের বিশ্লেষণ এ-বইয়ের পাঠককে এই বিশ্বাসের সামনে এনে দাঁড় করায়ঃ 'কৃষ্ণগহ্বর' শেষ হয় অংশুমানের বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তায়। এইভাবে “হেমলাটে” প্রোথিত হয় “কৃষ্ণগহ্বরে’র বীজ। ‘পেজ ফোরে’ রোপিত হয় ‘হেমলাটে’র মতো মহীরুহের চারা। একটি নাটক থেকে বেরিয়ে আসে আর একটি নাটক। একটি একক সূত্রবদ্ধতায় প্রোথিত হয়ে যায় সমস্ত নাটকগুলির অকৃত্রিম ধারাবাহিকতা”।
নতুন শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ব্রাত্য বসুর নাটক বাংলা মঞ্চে সাফল্যের বিচারে, অন্তত দর্শক সমাগমের পরিসংখ্যানে এখন শীর্ষস্থানে। কিন্তু রুদ্ধসংগীত তাঁকে যে খ্যাতি দিয়েছে—আজ ছ’বছর অতিক্রম করেও তা অবিচল আছে তো বটেই, পরপর আরো যে সব নাটক লিখেছেন তারও জনপ্রিয়তা কিছু কম নয়। এমন কি, যখন বিকেলে ভোরের সর্ষে ফুল; সুপারি কিলার-এর মতো নাটকে যখন কোনোভাবে নাট্যের সঙ্গে তাঁর সংযুক্তি নেই—তখনও। যখন অভিযোগ শোনা গেছে—বাংলা মঞ্চ নাটকের অভাবে রক্তাল্পতায় ভুগছে, কে না বলবে যে ব্রাত্য সেই অপবাদের বিপ্রতীপে সিনেমার মতো কিংবা কে? লিখে—ক্রমাগত তাঁর প্রতিষ্ঠার পক্ষে এক একটা অননুকরণীয় দৃষ্টান্ত পেরিয়ে যাচ্ছেন। তার উপরে প্রথমোক্ত নাট্যে অভিনেতা হিসেবে কৃতিত্বের প্রমাণ—তাঁর নির্দেশক সত্তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রায় সমান সমান।
‘ইতিহাস আর বর্তমানের মধ্যে সেতু বন্ধনের নাটক’ হিসেবে রুদ্ধসংগীত-এ ব্রাত্য জীবিতাবস্থায় কিংবদন্তি দেবব্রত বিশ্বাসের জীবনকে কেন্দ্র করে একটা সময়কে তাঁর নিজের সময়ে এনে স্থাপন করেছেন। আবার সিনেমার মতো নাটক যে চমকপ্রদ বিনোদন করে নাটককে গড়ে দর্শক মনোরঞ্জনের নতুন পথ খুঁজতে চাওয়ায় নাটককারের আকাঙ্ক্ষাকে সীমাবদ্ধ করে রাখেনি—তিনি যে উত্তমকুমারের মতো মধ্যবিত্তের এক আইকনের প্রতি সশ্রদ্ধ নীরব অভিবাদন জানাতে এই নাট্যার্ঘ্য প্রস্তুত করেছেন—তা বাংলা সিনেমার একশো বছরের সময়ে দাঁড়িয়ে এক অত্যাশ্চর্য সৃজন হয়ে উঠেছে। শম্পা যে বলেছেন: ‘এ নাটকে ভাষার নিজস্ব একটা দীপ্তি আর গতি রয়েছে, তাঁর আকর্ষণ পাঠকের কাছে অপ্রতিরোধ্য’। একেবারে ঠিক।
এই আলোচনা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে পারে—কিন্তু সে-চেষ্টায় এখন বিরতি দিতে হচ্ছে। লেখক এ-বইয়ে নাটককার ব্রাত্যকেই প্রাধান্য দিয়েছেন—কিন্তু তাঁর নাট্যের ষোলটি রঙিন আলোকচিত্র ছেপে পাঠকের সামনে একটা আলাদা আকর্ষণ গড়ে দিয়েছেন। দু-পাতার একটি ভূমিকা লিখেছেন আর এক নির্দেশক-নট-নাটককার শেখর সমাদ্দার। অনেকের মতো তিনিও যে বুঝেছিলেন—‘ব্রাত্য হয়ে উঠবেন নব্বই-পরবর্তী বাংলা থিয়েটার ও বাংলা নাটকের সবচেয়ে সুউচ্চ চূড়াটির নাম। হ্যামলিনের বাঁশির ডাকে তাঁর আহ্বানে বয়ে যাবে নতুন প্রজন্মের নতুন সময়ের বাংলা থিয়েটার’। এই মন্তব্যের যাথার্থ্য নিহিত আছে এ-বইয়ের চারটি অধ্যায়ে।
সবশেষে বলতে হয়—এ বইয়ে কিছু কিছু বক্তব্য স্পষ্ট করতে আরো একটু বিশদ বিশ্লেষণ দরকার ছিল। যেমন: ‘গত শতকের ষাটের দশক থেকে উৎপল দত্তের নাট্যরচনার পর থেকে এদেশের প্রথিতযশা দু’চারটি নাট্যগোষ্ঠী নাট্য রূপান্তরের দিকে ঝুঁকেছিলেন। তার বড় একটা কারণ ছিল সময়োপযোগী নাটকের প্রভাব’। তাই কি? প্রভাব না অভাব? এ বই, এ আলোচনা তৈরি করতে হয়তো আর একটু বেশি সময় দিতে পারলে ভালো হত—মুদ্রণ প্রমাদ এড়ানো অনেকটা সহজ হতে পারত। তাঁর কালানুক্রমিক নাটক লেখার তালিকা যদি পরিশিষ্ট হিসেবে যুক্ত থাকত—তাতে পাঠক, ব্রাত্যর ধারাবাহিকতা বোঝার অধিকন্তু তথ্য এক সঙ্গে পেতেন। যদিও উল্লেখ্য—লেখক প্রায় ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট নাটকের আলোচনায় প্রকাশকাল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রযোজনার সাল-তারিখও জানিয়েছেন। আমি নিশ্চিৎ, ব্রাত্য বাংলা নাটকের ইতিহাসে ইতিমধ্যে যে-স্থায়ী আসন অর্জন করেছেন—সেটি অবধারণ করার জন্য এ-বই কাজে লাগবে। সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা ভেবেই লেখক নিশ্চয় এর পরবর্তী সংস্করণের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুত হবেন। আর, সে-সময় নিশ্চয় খেয়াল করবেন—প্রথম প্রচ্ছদে ‘ব্রাত্যবসুর’ জায়গায়, আখ্যা পত্রের ‘ব্রাত্য বসু:’ কোনটা শিরোনামে রাখবেন।
Thursday, 23 September 2021
জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। সাংবাদিক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়। ২৪.০৯.২০২১. Vol -505. The blogger in literature e-magazine
ভারতীয় সাংবাদিকতার জনক’ বলা হয় তাঁকে। সিপাহি বিদ্রোহকে ‘দি গ্রেট ইন্ডিয়ান রিভোল্ট’ বলার দুঃসাহসিকতা সে সময়ে তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন।
হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় হলেন প্রথম ভারতীয় সাংবাদিক, যিনি এই দাবি তোলেন যে ভারতবর্ষীয় সমস্ত সমস্যার সমাধান ভারতবাসীকেই করতে হবে। তিনি দাবি করেন যে, ভারতে এখনই স্বায়ত্তশাসন চালু করা দরকার।
কলকাতা তখন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল। কলকাতা থেকেই প্রকাশিত হত তাঁর হিন্দু পেট্রিয়ট সংবাদপত্র। তিনি এই সংবাদপত্র সম্পাদনা করেছেন ১৮৫৬ থেকে ১৮৬১ সাল পর্যন্ত। হরিশচন্দ্রের মতামতকে তখন বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দিতেন ব্রিটিশ শাসকরা। তৎকালীন সরকার তাঁকে এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে প্রতি বৃহস্পতিবার যখন তাঁর ভবানীপুরের বাড়ি থেকে সংবাদপত্রটি প্রকাশিত হত, তখন গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং ওঁর বিশেষ দূত পাঠিয়ে দিতেন। তিনি কার্যত ছাপাখানা থেকেই হিন্দু পেট্রিয়ট সংবাদপত্রের একটি কপি তুলে নিয়ে যেতেন ক্যানিংয়ের কাছে।
উনবিংশ শতাব্দীর যে নবজাগরণের কথা আমরা বলে থাকি, তার অনেক সমালোচক। যাঁরা মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন, তাঁরা অনেকেই মনে করেছেন যে, এই নবজাগরণ কেবলমাত্র মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতি ওঁদের বিরোধিতা সময় সময় যা আক্রমণে পর্যবসিত হয়েছে। তবে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন দরিদ্র এবং কঠোর সংগ্রাম করে তিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন নিজের ক্ষমতায়। সেই মানুষ নীলবিদ্রোহের সময় চাষিদের পাশে দাঁড়িয়ে, তাঁদের কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে। তাঁর সেই লড়াইয়ের অস্ত্র ছিল হিন্দু পেট্রিয়ট সংবাদপত্র।
হিন্দু পেট্রিয়টকে ব্রিটিশরা ভয় পেত অনেক বেশি, কারণ এটা ইংরেজিতে লেখা, একটা-দুটো কপি ইংল্যান্ডে চলে গেলে সে দেশের মানুষ সত্যটা জেনে ফেলবে, তখন সরকার বিব্রত হবে।
সম্ভবত হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ই এ দেশে প্রথম সংবাদপত্র সম্পাদক, যিনি বিভিন্ন জায়গায় সংবাদদাতা বা করেসপন্ডেন্ট রেখেছিলেন। যশোহরে তাঁর সংবাদদাতা ছিলেন শিশিরকুমার ঘোষ। বিভিন্ন জায়গার সংবাদিকরা তাঁকে চিঠি পাঠাতেন, যা থেকে তিনি নীলকরদের সম্বন্ধে জানতে পারতেন এবং খবর করতেন। এটা এমন একটা পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, ওঁর বাড়িতে তখন সারাদিনই অত্যাচারিত, উৎপীড়িত চাষিরা এসে ওঁর বাড়িতেই থাকতেন, সেখানেই তাঁদের থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত হত। এঁদের কারও বসতবাটি হয়তো কেড়ে নিয়েছে সরকার। ভিটেমাটি ছাড়া ওই কৃষকরা জানতেন যে এই মানুষটিই আমাদের জন্য লড়াই করছেন।
হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রয়াত হলেন মাত্র ৩৭ বছর বয়সে। সারা জীবন কাজ করে গিয়েছেন গ্রামের সেই সব মানুষের স্বার্থে, মার্কসীয়রা যাঁদের সর্বহারা বলেন। সেই সর্বহারা চাষিদের সঙ্গে তিনি কতটা ওতপ্রোত ভাবে মিশে গিয়েছিলেন এবং তাঁরাও তাঁকে কতটা ভালোবাসতেন নিজেদের লোক বলে তা বোঝা গেল তাঁর মৃত্যুর পরে।
এক লোককবি গান বাঁধলেন, তাঁর গানের মধ্যে ফুটে উঠল হা-হুতাশ:
নীলবাঁদরে সোনার বাংলাকরলে এ বার ছারখার অসময়ে হরিশ মলোলঙের হল কারাগার।
এই যে লোকমাধ্যমের মধ্যে এই মানুষটিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। চাষিরা তাঁকে নিজের লোক বলে মনে করতেন।
যথার্থ ভাবে বলতে গেলে, ভারতে রাজনৈতিক সংবাদ প্রথম শুরু করেন হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। এর আগে একেবারে ছিল না তা নয়, সমাজ সংস্কারের রাজনীতি ছিল। রামমোহন রায় তাঁর সংবাদপত্রগুলি চালিয়েছিলেন সমাজ সংস্কারের পথেই। ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী ইংরেজি সংবাদপত্রে সামান্য ভাবে দুঃখ ও অভাব-অভিযোগ জানানো হয়েছে। এমন কথাও জানানো হয়েছে এ দেশীয়দের চেয়ে কম যোগ্যতার ‘সাদা চামড়ার লোক’কে চাকরিতে নিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসনের চরিত্র সম্বন্ধে ওঁদের মোহভঙ্গ হচ্ছে, কিন্তু এগুলো ইঙ্গিতে, সবই ছিল আবেদন-নিবেদন।
হরিশচন্দ্রই প্রথম সুস্পষ্ট উচ্চারণ করলেন যে, রাজনীতি জীবন বাদ দিয়ে নয় এবং রাজনৈতিক সাংবাদিতকা প্রথম প্রচলন করলেন যখন উনি প্রচার করলেন, স্বায়ত্তসাসন ভারতীয়দের অধিকার এবং যা কিছু ভারতীয়দের সমস্যা, তা সমাধানের ভার ভারতীয়দের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে সমাধানের জন্য। এ জন্য তিনিই ভারতে প্রথম রাজনৈতিক সাংবাদিকতার উদ্গাতা।
মধ্যবিত্ত শ্রেণী তাদের গণ্ডী থেকে বেরিয়ে এসে গ্রামের দরিদ্র মানুষের সঙ্গে এবং ভূমিহীন কৃষকের (যাঁদের অনেকে প্রোলেতারিয়ত বলে থাকেন) সঙ্গে যিনি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন, তাঁদের জন্য তাঁর লেখনী সক্রিয় ছিল। তিনি তাঁর এই শ্রেণীর বেড়াটা ভেঙে ফেলে মানুষের স্বার্থটাকেই নিজের স্বার্থ করে তুলেছিলেন।
তিনি প্রচণ্ড পরিশ্রম করতেন। (তখনকার দিনের খানিকটা রীতি মেনে) তিনি পানাসক্তও ছিলেন। পরিবারে অশান্তিও ছিল। সব মিলিয়েই তাঁর মৃত্যু হয় মাত্র ৩৭ বছর বয়সে।
দুঃখের কথা হল, বাঙালি তো আত্মবিস্মৃত জাতি, তাই ওঁর একটা ছবিও পাওয়া যায় না। উনি কেমন দেখতে ছিলেন, তা জানার উপায় নেই। আরও দুঃখের বিষয়, ভবানীপুরে হরিশ মুখার্জি রোডে ওঁর যে বসত বাড়িটা ছিল, সেটা একসময় ঐতিহ্যবাহী ভবন বা হেরিটেজ বিল্ডিংয়ের তালিকায় ছিল। কিন্তু পরে রাজনীতির নানা কারণে ওই ভবনটিকে ঐতিহ্যবাহী ভবনের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং বলা হয় যে এখানে যে উনি থাকতেন এমন কোনও প্রমাণ নেই। ওই বাড়িটি ভেঙে দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়। অথচ দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখেছি যে ওই বাড়িতে ফলক লাগানো ছিল যে এই বাড়িতে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় বসবাস করতেন।
যাঁরা বামপন্থী মনোভাবাপন্ন, যাঁরা নিজেদের কমিউনিস্ট বলে দাবি করেন, যাঁরা চাষিদের স্বার্থ দেখেন, তাঁরা সেই মানুষের স্মৃতিটাই ধ্বংস করে ফেললেন, যিনি সত্যিই কৃষকদের জন্য জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলায় সেই মানুষটির স্মৃতিরক্ষায় কিছুই করা হয়নি।
হরিশ্চন্দ্রের জন্ম হয় বর্তমান কলকাতা শহরের ভবানীপুরে । সেই সময় ভবানীপুর কলকাতার অংশ বলে বিবেচিত হত না । তার পিতার নাম ছিল রামধন মুখোপাধ্যায় । রামধন রাঢ়ী শ্রেণিভুক্ত ফুলিয়া মেলের একজন কুলীন ব্রাহ্মন ছিলেন । রামধনের বাড়ি ছিল বর্তমান বর্ধমান জেলার শ্রীধরপুর গ্রামে । রামধনের চার স্ত্রীর মধ্যে হরিশ্চন্দ্রের মা রুক্মিণী ছিলেন সবচেয়ে ছোট । হরিশ্চন্দ্র তার মায়ের দ্বিতীয় সন্তান।
স্কুলে পড়ার সময়েই হরিশ্চন্দ্রকে মায়ের অনুরোধে বিয়ে করতে হয়েছিল । স্ত্রী ছিলেন মোক্ষদাসুন্দরী, উত্তরপাড়ার গোবিন্দচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা । মোক্ষদাসুন্দরীর গর্ভে হরিশ্চন্দ্রের দুটি সন্তান হয়েছিল । প্রথমটি মেয়ে যার জন্মের কয়েকদিন পরই মৃত্যু হয় । দ্বিতীয় সন্তান হয় একটি ছেলে । ছেলেটি জন্মের ১৫ দিনের মধ্যেই মোক্ষদাসুন্দরীর মৃত্যু হয় । শিশুপুত্রের রক্ষনাবেক্ষনের জন্য হরিশ্চন্দ্র দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন । তার দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম ভগবতী । ভগবতী দরিদ্র পরিবারের মেয়ে ছিলেন ।
হরিশ্চন্দ্রের সাথে হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে । হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকাটির জন্যই মাত্র আট বছরের মধ্যে হরিশ্চন্দ্রের খ্যাতি প্রায় সারা ভারতে ছড়িয়েছিল এমনকি ইউরোপের শিক্ষিত সমাজেও তার নাম প্রচারিত হয়েছিল । হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকা প্রথম ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত হয় । এটি ছিল একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা । এই পত্রিকার প্রবর্তক এবং প্রথম স্বত্বাধিকারী মধুসূদন রায়ের চিঠি থেকে জানা যায় যে হরিশ্চন্দ্র ছিলেন এই পত্রিকার প্রথম সম্পাদক । আড়াই বছর ধরে হরিশ্চন্দ্র বিনা পারিশ্রমিকে প্রায় একাই হিন্দু পেট্রিয়ট পত্রিকা পরিচালনা করেন । এরপর তিনি এই পত্রিকার স্বত্বাধিকারী মধুসূদন রায়ের কাছ থেকে হিন্দু পেট্রিয়ট প্রেস এবং কাগজের স্বত্ব কিনে নেন । হরিশ্চন্দ্র সেই সময় সরকারী কর্মচারী হওয়ায় নিজের নামে এই পত্রিকা কিনতে পারেননি । তিনি তার দাদা হারাণচন্দ্রের নামে এই স্বত্ব কেনেন । হরিশ্চন্দ্র এই কাগজে বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ মারফত বৈদেশিক সংবাদ সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন । এবং তিনি পত্রিকাটিকে একটি আধুনিক পত্রিকায় পরিণত করেন । তবুও ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষ অবধি এই পত্রিকা চালাতে হরিশ্চন্দ্রকে আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হতে হয় ।
হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার প্রথম থেকেই হরিশ্চন্দ্র সমাজের নিম্নতম শ্রেণির মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই শুরু করেন । তিনি সাধারণ মানুষের উপরে পুলিশের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরব হন । বাংলার চাষীদের উপরে নীলকরদের অত্যাচার বন্ধের জন্য তিনি বাংলার উচ্চশ্রেণির মানুষদের এগিয়ে আসতে বলেন । তিনি তৎকালীন সরকারের আমদানি-রপ্তানি নীতিরও তীব্র সমালোচনা করেন । তিনি ভারত থেকে চাল, চিনি, তৈলবীজের মত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস রপ্তানী করে মদ প্রভৃতি বিলাসদ্রব্য আমদানীর বিরোধিতা করেন । হরিশ্চন্দ্র বিধবাবিবাহ প্রচলন এবং বহুবিবাহ নিরোধ নিয়েও বহু প্রবন্ধ প্রকাশ করেন । তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ প্রস্তাব পুস্তকাকারে প্রকাশের সাথে সাথে এ বিষয়ে জনমত গঠনে সহায়তা করেন । হরিশ্চন্দ্র হিন্দু পেট্রিয়টের সম্পাদক রূপে স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে বহু সংবাদ ও প্রবন্ধ প্রকাশ করেন । তিনি পত্রিকাতে পতিতা সমস্যা এবং সরকারী শিক্ষানীতি নিয়েও আলোচনা করেন ।
তিনি সংস্কৃত ভাষার প্রসার এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা করেন । হিন্দু প্যাট্রিয়টের সম্পাদকীয়তে প্রাচীন বাংলার সাহিত্যের উল্লেখ ও উদ্ধৃতি থেকে প্রমাণিত হয় যে বাংলা ভাষার প্রতি হরিশ্চন্দ্রের অনুরাগ ছিল । সেই সময় যে সব বাংলা বই প্রকাশিত হত তার সমালোচনাহিন্দু পেট্রিয়টে প্রকাশিত হত ।
তার রোগ ক্ষয়কাশ বা যক্ষা বলে ধরা পড়ে । হরিশ্চন্দ্র বুঝতে পারেন যে তার আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। যত দিন পেরেছেন তিনি হিন্দু পেট্রিয়টের জন্য সম্পাদকীয় লিখে গেছেন । অবশেষে ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ জুন শুক্রবার সকাল সাড়ে নটার সময়ে মাত্র ৩৭ বছর বয়েসে হরিশ্চন্দ্র শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । মৃত্যুর তিন মিনিট আগে হরিশ্চন্দ্র জ্বরের ঘোরে চিৎকার করে ওঠেন - ওরে পেট্রিয়ট মেশিনে ওঠাসনে, প্রুফটা আর-এক বার আমাকে দিয়ে দেখিয়ে তবে ছাপিস । এটাই হরিশ্চন্দ্রের মুখের শেষ কথা । হিন্দু পেট্রিয়টের চিন্তা তার জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত তার মনে ছিল ।।
===={{==={{{{======={======={{{{{===={জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। কবি অজিত দত্ত। ২৩.০৯.২০২১. Vol -504. The blogger in literature e-magazine
অজিত দত্ত
কুসুমের মাস
তুমি ফুল ভালোবাসো? লাল ফুল? চোখে যাহা লাগে?
কঠিন সৌন্দর্যে যার নয়ন সে হয় প্রতিহত?
তুামি ভালোবাসো ফুল? শেফালিকা সৌরভ-আনত?
যে-ফুল ঝরিয়া পড়ে ক্ষীণাঙ্গুলে স্পর্শিবার আগে?
আননে লেগেছে তব কেতকীর সৌরভ-দুকূলে?
হৃদয়ে কি বাজিয়াছে প্রগল্ভা হেনার উচ্চহাসি?
তুমি ভালোবাসো ফুল? কদম্ব সে বরষা-বিলাসী?
অথবা কুণ্ঠিতা কন্যা আতসীর কোমল মুকুল?
আমিও কুসুমপ্রিয়। আজিকে তো কুসুমের মাস।
মোর হাতে হাত দাও, চলো যাই কুসুম-বিতানে।
বসিয়া নিভৃত কুঞ্জে কহিব তোমার কানে-কানে,
কানন ফুলে ভরিয়াছি জীবনের মধু-অবকাশ।
লঘুপদে চলো যাই, কেহ যেন আঁখি নাহি হানে,
নিঃশ্বাসে জাগে না যেন তন্দ্রাস্তব্ধ রাতের বাতাস।।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘কুসুমের মাস’-এর কাব্যভাষার চলনকে বলেছিলেন ‘মদির মন্থরতা’। সাধুরীতিকে যে এত সুললিত করে তোলা যায়, দুরূহ শব্দনিক্ষেপও যে মায়াভারে এত নত হতে পারে, অজিত দত্ত না থাকলে আধুনিক বাংলা কবিতা কি তা জানতে পারত? অথচ ‘কুসুমের মাস’-এর পরের কাব্যগ্রন্থ থেকে তিনি যে সেই সাধুরীতিকে বর্জন করতে থাকলেন, তার কারণ কি পাঠকের প্রত্যাখ্যান? তার কারণ কি এটা যে শেষপর্যন্ত বাংলা কবিতার দুনিয়া ‘ওয়ান বুক ওয়ান্ডার’ করেই রেখে দিল তাঁকে? তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘পাতালকন্যা’-তে চলিত ভাষায় বেশ কিছু কবিতা রয়েছে। তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ থেকে সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া চলিতভাষাই তাঁর অবলম্বন হয়ে উঠল। অবশ্য বরাবর তিনি কমই লিখেছেন। এক-একটা কাব্যগ্রন্থের মধ্যে সময়ের ব্যবধান অনেকটাই। ভাষারীতির স্বাভাবিক বদল সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ পাঠক তাঁকে ‘পুরনোপন্থী’ ভাবেন এমন একটা বিশ্বাস, একটা অভিমানই হয়তো বা, তাঁর মনের মধ্যে ছিল। শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন - “…নতুন কোনো বই হাতে তুলে দেবার সময়ে বলতেনই একবার : ‘তোমাদের অবশ্য ভালো লাগবে না এসব। আমি তো আর আধুনিক নই।”
“ঠিকই, প্রাচীনতা মাখানো এর শব্দসাজ,” লেখেন শঙ্খবাবু। আর লেখেন এই ‘প্রাচীনতা’ বিষয়ে অজিত দত্তের অস্বস্তির কথা - “আমাদের ছাত্রজীবনে তাঁর ‘কুসুমের মাস’ যে অনেকেরই হাতে হাতে ঘুরত, পুরোনো ধাঁচের শব্দ আর সাধু ক্রিয়াপদ সত্ত্বেও যে সে-বই থেকে এ ওকে শুনিয়ে দিতাম কোনো কোনো লাইন, সেকথা জেনে খুব প্রবোধ পেতেন তা নয়, বলতেন, ‘সে তো কোন আদ্যিকালের কথা! এখন তো আর ওরকম লিখি না।
১৯৩০ সালে অজিত দত্তের প্রথম কাব্যগ্রন্থ কুসুমের মাস প্রকাশিত হয়। তিনি ছিলেন বুদ্ধদেব বসু সতীর্থ। তিনি বুদ্ধদেব বসুর সাথে যৌথভাবে প্রগতি নামের একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। পরে কল্লোল সাহিত্য গোষ্ঠী তে যোগ দেন। অজিত দত্ত নিয়মিত কল্লোল পত্রিকায় লেখালেখি করতেন, তিরিশের দশকে কল্লোল অন্যতম জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্য পত্রিকা। ১৯৪৬ সালে তার নষ্ট চাঁদ প্রকাশের পরের বছর দেশ পত্রিকায় রৈবত ছন্দ নামে ধারাবাহিকভাবে তার মন পবনের নাও প্রকাশিত হয়। অজিত দত্ত সমসাময়িক বাংলা কবিতা, ছন্দ চিন্তা, রবীন্দ্র বিষয়ক ভাবনা, বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকের রচনার মূল্যায়ন, শিল্পসাহিত্য ভাবনা এবং শিশুসাহিত্য সম্পর্কিত ৫০টি প্রবন্ধ লেখেন। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত জনপ্রিয় সাহিত্য পত্রিকা কবিতা গোড়াপত্তনেও অজিত দত্তের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। এই পত্রিকার তিনি অন্যতম প্রধান লেখক ছিলেন। ‘দিগন্ত’ নামে একটি প্রকাশনী সংস্থা গড়েছিলেন তিনি। ‘দিগন্ত’ সাহিত্য বার্ষিকী সম্পাদনা করেছেন।
অজিত দত্ত ১৯০৭ সালের ২ ৩ নভেম্বর ঢাকার বিক্রমপুরে (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলা) এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র চার বছর বয়সে তার পিতা অতুলকুমার দত্ত মারা যান। তার মা হেমালিনী দেবী ছিলেন সাহিত্য অনুরাগী।
১৯২৪ সালে ঢাকার কিশোরীলাল জুবিলী স্কুল থেকে অজিত দত্ত প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেন এবং জগন্নাথ কলেজে বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হন। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ১৯২৬ সালে তিনি কলকাতা চলে যান এবং বিদ্যাসাগর কলেজে ইংরেজি বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তার বড়ো ভাই মারা গেলে ঢাকায় ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগে ভর্তি হন। অজিত দত্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৮ সালে বি.এ এবং ১৯৩০ সালে এম.এ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
অজিত দত্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অস্থায়ী পদে যোগদান করে তার কর্মজীবন শুরু করেন। কিছুদিন পরেই তিনি কলকাতায় রিপন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৩৪ সালে স্কুল ছেড়ে তিনি রিপন কলেজে যোগদান করেন। ১৯৩৬ সালে রিপন কলেজ ছেড়ে দিয়ে ইন্ডিয়ান টি মার্কেট এক্সপানশন বোর্ডে এসিস্ট্যান্ট পাবলিসিটি অফিসার পদে যোগ দেন এবং সেখানে তিনি ১০ বছর চাকরি করেন। এখানে পদোন্নতি না হওয়ায় চাকরি ছেড়ে ক্যালকাটা ন্যাশনাল ব্যাংকের অধিকর্তা শচীন ভট্টাচার্যের ১২/১৪টি কনসার্নের পাবলিসিটি অফিসার হন। এখানেও ১০ বছর চাকরি করে ১৯৫৬ সালের ২১শে আগস্ট তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপনায় যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি বিভাগীয় প্রধান হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন।
অজিত দত্তের প্রকাশিত গ্রন্থ,
কাব্য গ্রন্থ
কুসুমের মাস (১৯৩০)
পাতাল কন্যা (১৯৩৮)
নষ্ট চাঁদ (১৯৪৫)
পূর্ণনবা (১৯৪৬)
ছড়ার বই (১৯৫০)
ছায়ার আলপনা (১৯৫১)
জানালা (১৯৫৯)
কবিতা-সংগ্রহ (১৯৫৯)
শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৭০)
সাদা মেঘ কালো পাহাড় (১৯৭১)
প্রবন্ধগ্রন্থ
জনান্তিকে (১৯৪৯)
মন পবনের নাও (১৯৫০)
সরস প্রবন্ধ (১৯৬৮)
বাংলা সাহিত্যে হাস্যরস (প্রবন্ধ, ১৯৬০)
কথা-ভারতী (অনুবাদ)
দুর্গাপূজার গল্প (অনুবাদ)
নিজের কবিতা সংগ্রহের ভূমিকায় কবি লিখেছিলেন, “অন্য যাঁদের আবাল্য বন্ধু ও সতীর্থ এবং সমধর্মা কবিরূপে জেনেছিলাম, তাঁদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বটুকু ছাড়া আর কোনো সমধর্মীতা আজ আর খুঁজে পাই না। সেজন্য নিজেকে বড়ো নিঃসঙ্গ মনে হয়।” ‘পোয়েট অব থার্টিজ’-এর অনুসরণে ‘তিরিশের কবি’ বলতে বাংলা কাব্যসাহিত্যে যে প্রজন্মকে আমরা ধরি, প্রতিভার দিক থেকে অজিত দত্তের তাঁদের মধ্যে গণ্য না হবার কোনও সঙ্গত কারণ নেই। কিন্তু বুদ্ধদেব-জীবনানন্দ-সুধীন্দ্রনাথ-বিষ্ণু দে-অমিয় চক্রবর্তীর পর আর কোনও নাম আমরা উচ্চারণ করি না। এ কথা স্বীকার করতেই হয় যে, সময়ের সঙ্গে বন্ধুতা হয়নি অজিত দত্তের। কিন্তু তা কি শুধুই ভাষার কারণে? অন্তরে অন্তরেও একরকম নিঃসময়ের তপস্যা করতেন বোধহয় তিনি। তাই পরে ভাষাভঙ্গি বদলানোর চেষ্টা করেও একরকম ব্রাত্য থেকে গেছেন। সময়ের রুটম্যাপের সঙ্গে কিছুতেই পদক্ষেপ মেলেনি তাঁর। প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত তিনি আসলে অতি-নিভৃত অনুভবের কবি। ভিতরপানে তাঁর দৃষ্টিপাত এতই গভীর, ভেসে ওঠার চেষ্টা করেননি কখনও তিনি। বা পারেননি। সেই অতলকে চিনে নিতে চাইবার কথা ছিল না কি আমাদের কবিতা-প্রেমীদের। !
কবিতা পাঠ ,:
মালতী ঘুমায়...
বৈশাখী হাওয়ার বেগে তারাগুল্লি কাঁপিতেছে
ক্ষীন-শিখা প্রদীপের মতো,
- এখন বাহিরে কত রাত?
নিশীথের হাওয়া আজ আফিমের নেশার মতন,
( মালতীর চুলগুলি চোখের পলকে চুমু খায়),
বাতাসে আসিছে ভেসে দূর হতে অস্পষ্ট গুঞ্জন,
( ঘুম এসে নয়নে জড়ায়)।
পত্রের মর্মর আর শোনা যায় বাতাসের স্বর,
নিঃশ্বাসে কাঁপিয়া ওঠে ক্ষুদ্র তারা, ক্ষীনায়ু প্রহর।
( ঘুম কি ভাঙিয়া যাবে কপালে রাখিলে হিম হাত?)
- এখন বাহিরে কত রাত?
একরাশ কালোচুল উতরোল এ-বাতাসে
একেবারে হল এলোমেলো ;
- এবার বৈশাখী ঝড় এলো!
কাঁপিছে দালান কোঠা সমুদ্রের জাহাজের মতো,
(বাতাস সরায়ে দিলো লঘু হাতে বুকের আঁচল)
এখনি ঝাপটে ছিঁড়ে উড়িয়া পড়িবে তারা যত।
( শুভ্র বাহু, পাটল কপোল)।
বাতাসে আসিছে ভেসে জল-কণা ঘরের ভিতরে,
সমস্ত আকাশ এসে জানালার কাছে ভিড় করে।
( নেমেছে চুমার মতো ঘুম ওর পলকের ‘পর’)
- এলো কাল বৈশাখীর ঝড়!
ঘুমন্ত দৈত্যের পুরী অকালে জেগেছে আজ,
রক্ষা নাই, নাই আর গতি,
( জেগে যেন ওঠে না মালতী!)
পাতালের যত নাগ আকাশে মেলিছে লক্ষ ফণা,
(সাবধানে সবগুলি জানালা দিয়েছি বন্ধ করে),
এ কী হুলুস্থুলু কান্ড! আকাশে যে গ্রহ রহিল না।
( আমি আছি বসিয়া শিয়রে)।
লক্ষ দৈত্য ব্রম্ভান্ডেরে ছিঁড়িয়া ফেলিছে কুটি কুটি,
তুলিয়া ধরেছে তারা বিদ্যুতের মশাল দেউটি ;
আমি জানি, কার খোঁজে নাগদৈত্য ছুটিতেছে রাগে।
( ভয়, যেন মালতী না জাগে)।
ওই শোনো দুড় দুড় লক্ষকোটি নাগদৈত্য
ঊর্ধ্বশ্বাসে পলাইছে ত্রাসে,
- মত্ত ঝড় শান্ত হয়ে আসে।
শাখার উন্মাদ নৃত্য ধীরে ধীরে হয়েছে মন্থর,
( বিদ্যুৎ গিয়েছে ছুঁয়ে মালতীর কম্পিত চুমায়),
ঝাপটে ঝরিছে পাতা, স্বচ্ছ হয়ে আসে দিগন্তর,
( অপরূপ! মালতী ঘুমায় )।
শঙ্কিত ডানার নিচে পৃথিবীরে লুকাইয়া কোলে
আশঙ্কায় কাঁপে রাত্রি, দুটি তারা ভয়ে আঁখি খোলে।
( স্বপ্নে উঠিয়াছে কেঁপে মালতীর আরক্ত অধর)
শ্রান্ত হয়ে এল মত্ত ঝড়।
মেঘমুক্ত স্বচ্ছাকাশে তারাগুলি ফুটিতেছে
শুভ্রদল শেফালির মতো,
- এখন বাহিরে রাত কত?
দেবতা নিক্ষেপি বজ্র তাড়ায়েছে অমঙ্গল যত,
(পৃথিবী হয়েছে হিম মালতীর ঘুমের লাগিয়া)।
এলায়ে পড়েছে রাত্রি নিদ্রাক্লান্তা মালতীর মতো,
( আমি আজ থাকিব জাগিয়া)।
ঘুমায় দূরের বন, ঘুমে ঝরে কুসুমের জল,
ঘুমায় পাথার-পুরী, ঘুমাইছে ক্লান্ত দৈত্যদল,
( জাগিয়া উঠিবে না তো ধরি যদি ওর দুটি হাত?)
- এখন বাহিরে কত রাত?
( বই;- কুসুমের মাস- ১৯৩০)
ছায়া...
কাল রাতে একলা আঁধার পথে শহরতলীতে
দেখলুম অদ্ভুত মেয়ে এক।
সেখানে অশত্থ ঝোপ নিঃধুম ছবির মতন,
এতটুকু হাওয়া নেই, জোছনাও ফোটে নি তখন,
দেখলুম আকাশের ময়লা আলোতে
আবছা ছায়ার মতো মেয়ে এক
যদিও বাতাস নেই, তবু যেন দেখলুম অদ্ভুত,
উড়ছে হাল্কা চুল, উড়ছে হাওয়ার মতো, আবছা।
যদিও জোছনা নেই তবু যেন দেখলুম অদ্ভুত,
পাপড়ির মতো তার চোখের পলক নত, আবছা।
নিঃঝুম জটবাঁধা অশত্থের ঝোপের ছায়ায়
ওড়নার মতো তার মুখখানি অর্ধেক ঢাকা,
দেখেছি অলক তার, দেখেছি পলক তার, আর
দেখেছি শরীর তার বাঁকা।
কালকে আবছা রাতে দেখেছি যে অদ্ভুত শহরতলীতে,
বিছানায় শুয়ে তাই ঘুম নাই চোখে এতটুকু;
যদিও ছিলো না হাওয়া, যদিও ওঠে নি চাঁদ কাল,
যদিও দেখে নি তার মুখ ।। ( বই;- কুসুমের মাস- ১৯৩০)
পুলিশ...
নিঝুম নিশুতি রাতে যখন ঘুমোয়ে থাকে কবি,
নবোঢা ঘুমায় যবে, নব-প্রেম-মুগ্ধা ঘুম যায়,
নক্ষত্র-খচিত-কেশা শর্বরীরে কে দেখে তখন?
নিদ্রার গুন্ঠন তুলি ধরা পানে কে তখন চায়?
তখন সে শিহরিত ছায়ার আড়ালে
চকোর ফুকারে যদি, দোয়েলায় দেয় যদি শিস,
কান পেতে শুনে ভাবে দূরে কোথা হুইসল বাজে-
একমাত্র জাগরুক রাস্তার পাহারা পুলিশ।
দেখে না সে আকশের জ্যোসস্নার জরির ওড়না
শ্লথ হয়ে খসে গেছে নতজানু মর্তকরপুটে,
দেখে না সে ফুলগুলি সহসা মেলিতে চায় ডানা
দিবসের নিদ্রা হতে তারার চুম্বনে জেগে ওঠে।
জানে না সে ঘাসগুলি শিশিরে হয়েছে মখমল,
বাতাসে ঝরিছে পাতা, তার সে রাখে না কোনো খোঁজ,
তবুও নিশীথ রাত্রে নিদ্রিত ধরার প্রতিনিধি
পুলিশ একাকী জাগে রোজ।
শরতের শিশিরের কণাগুলি ঝলমল করে
চুনির মণির মতো চাঁদের আলোর নিচে নিচে,
পুলিশ তাকায়ে ভাবে নিশ্চয় রক্তই হবে,
খুন ভেবে শশব্যস্ত হয়ে ওঠে মিছে?
রাত্রির বিজন বনে পরীদল খেলা করে রোজ,
গাছের পাতারা ডেকে কথা কয়, পাখি দেয় শিস,
তার মাঝে সারারাত চোরের ভাবনা ভেবে জাগে
রাস্তার পাহারা পুলিশ!.............. ( বই;-পাতালকণ্যা-১৯৩৮)
নষ্টচাঁদ...
এ-আষাঢে শেষ হোক কান্নার বন্যা
ও-আষাঢে লেখা যাবে মেঘদূত,
কবছর মন দিয়ে করো ঘরকন্না
বুড়োকালে প্রেম হবে অদ্ভুত।
মুখোমুখি বসে শুধু সকালে ও সন্ধ্যায়
দম্পতি-সুখ বলো হয় কার?
সংসার-ধর্মেতে যে মেয়েরা মন দ্যায়
পৃথিবীতে তাদেরি তো জয়কার।
মেয়েমানুষের বেশি মন থাকা উচিত না,
আমাদের মন তাই পারিনেকো সামলে।
রুদ্র-গ্রীষ্মে আকাশে থাকেই তো তৃষ্ণা
সব মিটে যাবে চোখের বর্ষা নামলে।
দুটো পয়সার সাশ্রয় কিসে হবে
সেদিকে বরং পারো যদি চোখ রাখতে,
বুড়ো হয়ে যদি বেঁচে ও বর্তে রবে
পাকা-বাড়ি করে সেখানে পারবে থাকতে।
শখ-টখ যত সবই জেনো ছেলেমানুষি
কুড়ির পরে কি ও-সব রাখতে আছে?
জীবন তো নয় সুখের জোয়ারে পানসি,
আসল প্রশ্ন প্রানটা কী ভাবে বাঁচে।
হঠাৎ সেদিন গভীর রাত্রে ঘুম ভেঙে চেয়ে দেখি
আগ্নেয়গিরি মেঘের চূড়ায় গলিত চাঁদের ধারা।
পাশ ফিরে শুই ; চাঁদের ভেল্কি সবই জানা গেছে মেকি,
মিথ্যে শরৎ , নেহাৎই মিথ্যে আকাশ-ছড়ানো তারা।
তুমি পাশে থাকো রুপোর কাঠিতে মূর্ছিতা চিরদিন-
গৃহিনী-সচিব-শিষ্যা এবং-এবং কি জানি কী যে,
জানি না, জানতে চাইনে, জানলে রোজগার হবে ক্ষীন,
চাঁদ তো উপোসে মরে না, কিন্তু বেঁচে থাকা চাই নিজে ।।
( বই;-নষ্টচাঁদ-১৯৪৫)
আমি...
রাত্রি আর প্রভাতের মধ্যবর্তী দুর্জ্ঞেয় সেতুর
অন্ধকার প্রান্তে আমি সম্মুখ-পথিক,
হেমন্তে উড্ডীন যেন শ্যামাকীট, ভ্রান্ত-দিগ্বিদিক,
শূণ্য আস্ফালনে সুচতুর।
আমি ভোগী গৃধু, তবু নমস্য শ্রদ্ধেয়,
আমি স্বগর্চ্যুত দেব,পাপ তবু সহায় আমার,
জোনাকির আলোবৎ সৌরদীপ্তি আমারি আত্মার,
আমার নিন্দিত যা তা অবশ্যি হেয়।
আমি সত্যবেত্তা, আমি মান্য ও মানিত,
আমি সুখ শান্তিদাতা ভবিষ্যতে, বর্তমানে যদি
আমার ইঙ্গিতে দুঃখ-দুর্দশার চূড়ান্ত অবধি
অন্যলোকে ভোগ করি মোরে করে প্রীত।
আমি অন্ধ, তবু আমি পথের নির্দেশ করি দান,
হিংস্র আমি, শান্তি তবু আমারি কবলে,
একা আমি, তবু শ্রেষ্ঠ নির্বোধের দলে।
মানব-আত্মার আমি যথা-ইচ্ছা করি অপমান।
সৌন্দর্যের ধ্বংসকারী,বিকেলের নিষ্ঠুর বিজেতা,
তবু আমি হৃদয়ের ঐশ্বর্যের একক ভাণ্ডারী,
দুর্বল, তথাপি আমি পৃথিবীতে ছিঁড়ে দিতে পারি,
আমি নেতা .।
।( বই;-পূনর্ণবা-১৯৪৬)
নেশা...
আফিঙের লাল ফুলে যেন এক অলস মৌমাছি
স্বপ্ন দেখে আর দেখে। শিহরিত পাখার রেশমে
রোদের সোনার বুটি বুনে যাওয়া শেষ হয় ক্রমে,
সূর্য বুঝি গেল চলে পশ্চিম-প্রান্তের কাছাকাছি।
ভুলের সূতোয় গাঁথা জীবনের সরু মালাগাছি
এখনি শকায়ে যাবে সংসারের সর্বভুক হোমে।
আয়ুর প্রবাহে আঁকা যত ছবি স্বপ্নের কলমে
যতক্ষন না হারায়, মনে হয় যেন বেঁচে আছি।
রামধনুরঙে মেশা এই নেশা অভিশাপ আনে,
ব্যর্থতায় মুছে যায় ধর্ম-অর্থ-সমাজ-সংসার
ভুলের দ্বিতীয় স্বর্গ তবু গড়ে চলি বারবার,
স্রষ্টার যে প্রতিদ্বন্ধী মুক্তি তার কাছে কোনখানে?
কৃতিত্বে কি কর্মে যার নাই দাম, নাই কোন মানে
নেশার সে নির্বাসনে খুঁজি চিরন্তন অধিকার ।।
১৯৭৯ সালে ৩০ ডিসেম্বর তিনি তার কলকাতার ২০ রাসবিহারী এভিনিউ এর বাড়িতে পরলোক গমন করেন।
=====================÷===========Wednesday, 22 September 2021
বিশেষ আলোচনা। বেদ : সর্বধর্ম সার । ২২.০৯.২০২১. Vol -503. The blogger in literature e-magazine
ধর্মের প্রধান অঙ্গ বিশ্বজগতের মূল শক্তিকে শ্রদ্ধা নিবেদনের আকূতি। এই আকূতির উৎস সবার জন্য এক না। গীতা সেই নিবেদক শ্রেণিকে চারটি স্তরে উপস্থাপন করেছে- আর্ত, অর্থার্থী, ভক্ত এবং জিজ্ঞাসু। বিপদে পড়ে যে স্রষ্টার সাহায্য প্রার্থনা করে, সে আর্ত। বিপদ না পড়েও নেহায়েত নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য যে পরম সত্তার দ্বারস্থ হয়, সে অর্থার্থী। ভক্ত আরো উচ্চ স্তরের মানুষ, তার কোনো প্রয়োজন বা ইচ্ছা নেই। কেবল শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্যই উপাসনা করে। সবিশেষ জিজ্ঞাসু চায় পরম সত্তাকে জানতে। আকাঙ্ক্ষার এই বিভেদের কারণে আসে বেদ-বিদ্যাতেও বিভক্তি।
“ব্রহ্মবিদরা বলে থাকেন, দু'টি বিদ্যা আয়ত্ত করতে হবে - পরা এবং অপরা। অপরাবিদ্যা হলো ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ, অথর্ববেদ, শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ, এবং জ্যোতিষ। আর পরাবিদ্যা হলো তাই, যার দ্বারা ব্রহ্মকে অধিকার করা যায়।” (মুণ্ডক উপনিষদ, প্রথম খণ্ড, ৫)
উক্তিতে বৈদিক সাহিত্যের সম্পূর্ণ তালিকা বর্ণিত, যা দুই ভাগে বিভক্ত। একভাগে আছে ব্রহ্মবিদ্যা - অর্থাৎ, বিশ্বের মধ্যে যে অবিনাশী সত্ত্বা প্রচ্ছন্নভাবে ক্রিয়াশীল, তার জ্ঞান। এই শ্রেণির জ্ঞান উপনিষদ নামে পরিচিত। উপনিষদ অর্থ, যা এক প্রান্তে অবস্থিত। বেদের প্রান্তে অবস্থিত বলে একে বেদান্তও বলা হয়। বৈদিক সাহিত্যের অপর ভাগে পড়ে বিশ্বের সমস্ত জ্ঞান। প্রথমে আছে চারটি বেদ- ঋক, সাম, যজু এবং অথর্ব। পরবর্তীতে আছে শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ এবং জ্যোতিষ। তাই মোটা দাগে বেদকে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বলা হলেও তা মানবজ্ঞানের আদি ভাণ্ডারও বটে।
বিদ্ ধাতু থেকে নির্গত বেদ শব্দের অর্থ পরমজ্ঞান। চোখ, কান, নাক, জিভ এবং ত্বক- এই পাঁচ ইন্দ্রিয়ের মধ্য দিয়ে আমরা যথাক্রমে রূপ, শব্দ, কল্প, রস ও স্পর্শের জ্ঞান অর্জন করি। একে ইন্দ্রিয়জ জ্ঞান বা পার্থিব জ্ঞান বলে। এর মধ্য দিয়ে অতীন্দ্রিয় জ্ঞান লাভ সম্ভব না, পরম সত্য ইন্দ্রিয়ের উর্ধ্বে। যার মধ্য দিয়ে আমরা অতীন্দ্রিয়ের জ্ঞান লাভ করি, তা-ই বেদ। ধর্ম এবং তার সাথে সম্পর্কযুক্ত কর্ম, কর্মের ফলস্বরূপ যজ্ঞ এবং যজ্ঞের ফলস্বরূপ স্বর্গ, পরলোকত্ব, অদৃষ্ট ইত্যাদির জ্ঞান বেদ থেকেই অর্জিত হয়; অর্জিত হয় ব্রহ্ম এবং মোক্ষের জ্ঞানও।
ভারতীয় আর্যদের কাছে বেদ সর্বাপেক্ষা প্রামাণিক গ্রন্থ, স্থান সকলের উপরে। ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকা না থাকা এখানে বিশেষ দোষের কিছু নয়, কিন্তু বেদে অবিশ্বাস ক্ষমার অযোগ্য। ঈশ্বরে বিশ্বাস রেখেও বেদে অবিশ্বাসী হবার দরুণ প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে নাস্তিক বলে অখ্যাত হতে হয়। অন্যদিকে, ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাস নিয়েও কেবল বেদে বিশ্বাস রেখে অনেকেই আস্তিক সাব্যস্ত হন।
গোড়ায় বেদের লেখ্য রূপ ছিল না। গুরুশিষ্যের মাধ্যমে প্রবাহিত হতো অন্তর থেকে অন্তরে। এইজন্য বেদের আরেক নাম শ্রুতি। পরবর্তীতে মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস সূক্তগুলো কাঠামোবদ্ধ করেন। প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ পাণিনি বেদকে অভিহিত করেছেন 'ছন্দস' নামে। ঋক, সাম, যজু - এই ত্রিবিদ মন্ত্রের দরুণ বেদকে ত্রয়ীও বলা হয়। বেদের যে মন্ত্রগুলোতে অর্থ অনুসারে ছন্দ ও পাদব্যবস্থা আছে; সেই মন্ত্রকে ঋক বলা হয়। ঋকের মধ্যে আবার যেগুলো গীতিযুক্ত বা গাওয়া যায়, তাদের বলা হয় সাম। এই ঋক ও সাম লক্ষণ ছাড়া বাকি সব ঋক ও যজুঃ মন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত।
বেদ নিয়ে আলোচনায় তার প্রাচীনত্ব মনে রাখা জরুরি। বেদের যুগে উপাসনা রীতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলো। প্রকৃতির বুকে যেখানে ঋষিশক্তি বা সৌন্দর্য্যের উৎস আবিষ্কৃত হয়েছে, তার উপরেই দেবত্ব আরোপ করে বর্ণিত হয়েছে স্তোত্র। এই স্তোত্রের নাম হলো সূক্ত। অনেকগুলো মন্ত্র নিয়ে সূক্ত নির্মিত; আর সূক্ত নিয়ে গঠিত বেদের মূল অংশকে বলা হয় সংহিতা। সূক্তগুলো রচিত প্রাচীন ভাষায়। বেদে ব্যবহৃত হয়েছে বলে তা 'বৈদিক ভাষা' নামে খ্যাতি পেয়েছে। আবার, শ্রদ্ধা নিবেদন কেবল মন্ত্র পাঠেই হয় না, তার জন্য কিছু আনুষ্ঠানিকতা আছে। বৈদিক যুগে সেই আচারাদি স্বীকৃত হতো যজ্ঞ নামে।
যজ্ঞের বিভিন্ন ধরণ আছে। কীভাবে পালিত হবে, কতদিন স্থায়ী হবে প্রভৃতি। বিভিন্ন যজ্ঞের বিধিনিষেধ এবং সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া যেখানে বর্ণিত আছে, তার নাম ব্রাহ্মণ। সুতরাং সংহিতা অংশের সূক্তগুলি এবং ব্রাহ্মণ অংশের বিধিনিষেধগুলি নিয়েই বেদ গঠিত। আবার, ব্রাহ্মণ অংশের অন্তিম ভাগকে আরণ্যক বলে। আর সেই আরণ্যকের অন্তিম অংশকে বলা হয় উপনিষদ। অর্থাৎ আরণ্যক এবং উপনিষদ মূলত ব্রাহ্মণেরই অংশ। তারপরও তাদের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য আছে।
ইতঃমধ্যে অনেক সংজ্ঞাই যেহেতু স্পষ্ট, আরেকটু ভেতরে যাওয়া বোধহয় অনুচিত হবে না।
মন্ত্র, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক এবং উপনিষদকে সামগ্রিকভাবে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে - কর্মকাণ্ড এবং জ্ঞানকাণ্ড। যজ্ঞ সম্পর্কিত বিষয়াদি নিয়ে কর্মকাণ্ড গঠিত। বেদের সংহিতা এবং ব্রাহ্মণ অংশ এর অন্তর্ভুক্ত। জ্ঞানকাণ্ড গঠিত ব্রহ্মতত্ত্বের বিষয় আলোচনা নিয়ে। এর অন্তর্ভুক্ত উপনিষদ। আরণ্যকের অবস্থান এদের মধ্যবর্তী; কারণ, তাতে কর্ম এবং জ্ঞান দুই-ই ঠাঁই পেয়েছে। প্রতি বেদের সাথে সংযুক্ত ব্রাহ্মণ আছে; কিন্তু প্রতি বেদের সাথে যুক্ত আরণ্যক থাকে না। যেমন, অথর্ববেদের একটি ব্রাহ্মণ থাকলেও কোনো আরণ্যক নেই।
প্রথম বেদাঙ্গ শিক্ষা, বেদের সংহিতা অংশই প্রধানত শিক্ষার আলোচ্য বিষয়।
দ্বিতীয় বেদাঙ্গ ব্যাকরণ, মন্ত্রকে যজ্ঞে প্রয়োগ করার সময় কোন কোন ক্ষেত্রে লিঙ্গ, বিভক্তি, সন্ধি প্রভৃতি ব্যাকরণের প্রয়োগ ঘটে।
তৃতীয় বেদাঙ্গ ছন্দ, মন্ত্র পাঠের সাথে ছন্দ স্বাভাবিকভাবেই জরুরি হয়ে পড়ে; কারণ, বেদের মন্ত্রগুলো ছন্দবদ্ধ।
চতুর্থ বেদাঙ্গ নিরুক্ত, পদকে অর্থ ভেঙে ব্যাখ্যা করাই নিরুক্ত। এটি ব্যাকরণের পরিপূরক। ব্যাকরণের সম্পর্ক শব্দ নিয়ে; আর নিরুক্তের সম্বন্ধ অর্থের।
পঞ্চম বেদাঙ্গ জ্যোতিষ, যজ্ঞানুষ্ঠানের সময় নির্ধারিত হয় অহোরাত্র, পক্ষ, মাস, ঋতু, অয়ন এবং সংবৎসর গণনা করে। ফলে জ্যোতিষের ভূমিকা ব্যাপক।
ষষ্ঠ বেদাঙ্গের নাম কল্প, তাতে আছে যজ্ঞের প্রয়োগবিধি এবং গার্হস্থ জীবনের সংস্কার নিয়ে আলোচনা।
বেদপাঠ
সঠিক ও সম্যকভাবে বেদের মন্ত্র জানতে হলে শুধু আক্ষরিক অর্থ জানলেই হবে না। জানতে হবে বেদমন্ত্রসমূহের ঋষি, ছন্দ, দেবতা, ব্রাহ্মণবাক্যের অর্থসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়। বেদমন্ত্রের দর্শককে ঋষি বলে। কথাটাকে আরো নির্দিষ্ট করে বলা যায়, তপস্যারত ব্রহ্মনিষ্ঠ ঋষিগণ ব্রহ্মের দয়ায় বেদমন্ত্র দর্শন করেছিলেন। যিনি যে মন্ত্র দর্শন করতেন, তিনি সেই মন্ত্রের দ্রষ্টা বা ঋষি। ঋষিরা কিন্তু বেদ মন্ত্রের কর্তা নন। কারণ বেদ অপৌরুষেয়, অর্থাৎ কোনো মানুষের রচিত নয়। যার সৃষ্টি আছে, তার বিনাশ আছে। বেদ এই সৃষ্টি-বিনাশের চক্র থেকে মুক্ত।

বেদের প্রতি মন্ত্রে দেবতার জ্ঞান অতি যত্ন সহকারে অর্জন করা আবশ্যক, দেবতা বিষয়ক জ্ঞান জন্ম নিলেই প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম হবে। প্রতিটি মন্ত্র একজন দেবতাকে উৎসর্গ করে বর্ণিত। সেই মন্ত্র দ্বারা নির্দিষ্ট সেই দেবতাকে আহবান বা স্তুতি করা হয়। এতে তারা খুশি হয়ে মনের বাসনা পূরণ করেন। দেব শব্দের অর্থ: যিনি দান করেন কিংবা যিনি নিজে প্রকাশ পেয়ে অন্যকে প্রকাশিত করেন। সচ্চিদানন্দস্বরূপ আত্মচৈতন্যই দেবতাগণের প্রকৃত রূপ। বিভিন্ন নামে ও বিভিন্ন রূপে তারা সেই এক অব্যক্ত অদৃশ্য পরম ব্রহ্মেরই প্রকাশ মাত্র। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে -
অগ্নিং যমং মাতরিশ্বানমাহু।
অর্থাৎ সেই এক অখণ্ড সৎ ব্রহ্মকে বিপ্রগণ বহু প্রকার নামে অভিহিত করেন। যথা - অগ্নি, যম এবং মাতরিশ্বা (বায়ুর অন্য নাম)।
ধ্যানস্থ থাকার সময় বৈদিক ঋষিগণের নিকট মন্ত্র যখন প্রকাশিত হচ্ছিল, তখন তারা যে স্পন্দন অনুভব করেন, তা-ই ছন্দ। বেদে ছন্দের সংখ্যা মোট ৭টি। গায়ত্রী, উষ্ণিক, অনুষ্ঠুপ, বৃহতী, পঙক্তি, ত্রিষ্টুপ এবং জগতী। বেদমন্ত্রের মোট অক্ষরসংখ্যা গুনে ছন্দ নির্ণয় করা হয়। তাই বেদের ছন্দকে অক্ষরছন্দও বলা হয়ে থাকে। অক্ষর মানে বর্ণ না, পদাংশকে বোঝায়। আবার, কোন যজ্ঞে কোন মন্ত্রের প্রয়োগ হবে, তা নির্ধারণ করাকে বলা হয় বিনিয়োগ।
পরবর্তী যুগে যেন পাঠবিকৃতি না ঘটে, এজন্য ঋষিগণ বেদের বিশুদ্ধতা রক্ষায় বেশ কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নেন। ঋষি শৌনক ‘চরণব্যূহ’ গ্রন্থে প্রতিটি বেদসংহিতার সূক্ত সংখ্যা, ঋক সংখ্যা, ঋকের পদসংখ্যা এবং সংহিতার অক্ষর সংখ্যা পর্যন্ত লিখে রেখে গেছেন। সেই প্রাচীনকাল থেকেই এই ধরনের পদক্ষেপ বিস্ময়কর।
যা হোক, এগারোভাবে বেদ পাঠ করা যায়। তার মধ্যে প্রকৃত পাঠ তিনটি; বাকিগুলো বিকৃত। প্রকৃত তিনটির নাম - সংহিতা পাঠ, পদ পাঠ এবং ক্রম পাঠ। বেদমন্ত্রসমূহ ঠিক যেভাবে সংহিতায় পাওয়া যায়, সেগুলোকে অবিকল একইভাবে সন্ধিযুক্ত, সমাসবদ্ধ করে যথাযথভাবে পাঠ করাকেই সংহিতা পাঠ বা বেদ পাঠ বলে।
সময়
বেদের ভাষা বিশ্লেষণ করে একটা নির্দিষ্ট কালের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ঠিক নির্দিষ্ট কাল নিয়ে মতবিরোধ আছে অবশ্য। জাপানের কাকাসু ওকাকুরা সুবিখ্যাত দ্য আইডিয়ালস্ অব দ্য ইস্ট গ্রন্থে দাবি করেছেন, বৈদিক যুগের বিস্তৃতি ৪,৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। বেদ সংকলিত হয় মহাভারত যুগের শেষ দিকে। অনেকেই মহাভারতের ঘটনাকে দুই হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দ বলে বর্ণনা করেন। ইংরেজ ভারতবিদ এফ. ই. পার্জিটার পুরাণে বর্ণিত রাজাদের তালিকা ঘেঁটে মহাভারতের সময়কাল ৯৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ বলে দাবি করেন। আলাদাভাবে বেদের ব্রাহ্মণ অংশে প্রাপ্ত তথ্য থেকে উপসংহারে পৌঁছেছেন হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী। সে হিসাবে মহাভারতের সময়কাল খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ অব্দ।
ভারতে প্রবেশ এবং বসতি স্থাপনের পরে ঋগ্বেদ রচনা শুরু করতে কয়েক শতক সময় লাগা স্বাভাবিক। এভাবে হিসাবে করে বেদের সময়কাল খ্রিষ্টপূর্ব দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী বলে ধরে নেয়া হয়।
অনুবাদ ও গবেষণা
বিদেশী পণ্ডিতদের মধ্যে বেদের অনুবাদে প্রথম হাত দেন ল্যাটিন ভাষার পণ্ডিত অধ্যাপক রোজেন। ১৮৩০ সালে ঋগ্বেদের কয়েকটি মন্ত্র অনুবাদ করেন তিনি। অল্প হলেও এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৮৪৬ সালে বেদের সাহিত্য ও ইতিহাসের উপর পুস্তিকা প্রণয়ন করেন রুডলফ রথ। তা ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয় রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে। এরপর এগিয়ে আসলেন পণ্ডিত ম্যাক্স মুলার। ১৮৭৭ সালে সমগ্র ঋকসংহিতা রোমান হরফে প্রকাশ করলেন, সঙ্গে শব্দসূচিও ছিল। আস্তে আস্তে ইউরোপিয়ান পণ্ডিতদের মাঝে বেদ গবেষণা জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। মার্টিন হগ, আলফ্রেড লুদভিগ, ব্লুমফিল্ড, লুই রেনু এবং হিলেব্রান্ট স্ব স্ব ভাষায় বেদ নিয়ে গবেষণা ও অনুবাদ করেছেন।
ভারতীয় পণ্ডিতেরা এগিয়ে গিয়েছিল আরো কয়েক ধাপ। শিবরাম শাস্ত্রী, দয়ানন্দ সরস্বতী, রাম গোবিন্দ ত্রিবেদী, রঘুবীর, ক্ষেমকরণ ত্রিবেদীর মতো অনেক পণ্ডিতেরাই বেদের বিভিন্ন অংশ অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ করেন। অনেকে গবেষণা করেছেন বৈদিক সাহিত্য ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে। চিন্তামনি বিনায়ক বৈদ্য ১৯৩০ সালে প্রকাশ করেন ‘বৈদিক সাহিত্যের ইতিহাস’। ঋগ্বেদের ইতিহাস ও সমাজচিত্রের উপর অবিনাশ চন্দ্র দাস রচনা করেন ‘Rigvedic India’ এবং ‘Rigvedic Culture’ নামে দুটি বই। সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শনকে বিষয়বস্তু করে হয় আলোচনা। যুক্ত হয় আরো অনেক নাম।
বাঙালি পণ্ডিতদের অবদানও নেহায়েত কম না এখানে। ঋগ্বেদের প্রথম বাংলা অনুবাদ করেন রমেশচন্দ্র দত্ত। তবে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছেন আচার্য সত্যব্রত সামশ্রমী। ‘বৈদিক গ্রন্থ প্রত্ন’ নামে একটা মাসিক পত্রিকাও প্রকাশ করেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বহু পণ্ডিত তার প্রশংসা করেছেন। রাজেন্দ্র লাল মিত্র এবং দুর্গাদাস লাহিড়ীর বেদ গবেষণা বেশ স্পষ্ট। পণ্ডিত দীনবন্ধু বেদশাস্ত্রী, চন্দ্রকান্ত তর্কালঙ্কার, ড. অমরেশ্ব ঠাকুরের মতো অনেক নামও পাওয়া যাবে সেই তালিকায়।
বেদ কেবল ধর্মগ্রন্থ নয়, জীবনচক্রের এক অনন্য দলিলও বটে। সেই যুগের সমাজ বিন্যাস, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, মানুষের বিভিন্ন বৃত্তি, সমাজে নারীর স্থান, রাজনৈতিক টানাপোড়েন প্রভৃতি তথ্য বেদের বিরাট সাহিত্য ভাণ্ডার থেকেই সংগ্রহ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, হিন্দু ধর্মে ঋষির অবস্থান সবার উপরে। ঋগ্বেদে অন্তত সাতজন নারী ঋষির নাম পাওয়া যায়। নারী ঋষিগণের মধ্যে বিবাহ সূক্তের ঋষি সূর্যা অন্যতম। এ থেকে তৎকালীন নারীর সামাজিক অবস্থা নিয়ে ধারণা পাওয়া যায়।
মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও হৃদয়বৃত্তিকে অবলম্বন করেই মানুষের ধর্মবোধ অঙ্কুরিত হয়। মানুষ প্রতিকূলতায় সহায় খোঁজে, আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য বৃহৎ শক্তির সাহায্য কামনা করে। অবলম্বনের এই আকৃতিই হলো ধর্মবোধের বীজ। পরিণত হয়ে উঠার সাথে সাথে বিস্তার লাভ করে ভক্তি ও দার্শনিক জিজ্ঞাসা। এইজন্য বেদ পাঠের সময় মানব ইতিহাস এবং মানব অস্তিত্বের ক্রমপরিবর্তনকে মনে নিয়েই পাঠ করতে হয়। কখনো একেশ্বরবাদ, কখনো সর্বেশ্বরবাদ, আবার কখনো নিরেশ্বরবাদে চিন্তাধারা প্রবাহিত হলেও তার আদি অবস্থান বেদেই চিহ্নিত। এইজন্যই বলা হয়, বেদ মানবজ্ঞানের আদি ভাণ্ডার।
বেদদদদদদদ∆∆∆∆∆∆∆বেদদদদদদদ
শুভ জন্মদিন শ্রদ্ধাঞ্জলি। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় । একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ। Dt -26.11.2024. Vol -1059. Tuesday. The blogger post in literary e magazine.
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (২৬ নভেম্বর ১৮৯০ — ২৯ মে ১৯৭৭) একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ. মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্...
-
চারুচন্দ্র চক্রবর্তী (জরাসন্ধ) "কাঁচা আর পাকার মধ্যে ব্যাবধানটা কালগত। কাল পূর্ণ হলেই কাঁচা লঙ্কায় পাক ধরে, কাঁচা মাথা পাকা...
-
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (২৬ নভেম্বর ১৮৯০ — ২৯ মে ১৯৭৭) একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ. মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্...
-
অতুল প্রসাদ সেন " শেষে ফিরব যখন সন্ধা বেলা সাঙ্গ করে ভবের খেলা জননী হয়ে তখন কোল বাড়ায়ে রবে আমার যে শূন্য ডা...
