Thursday, 17 February 2022

জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ। ১৭.০২.২০২২. Vol -649. The blogger in literature e-magazine


জীবনানন্দ দাশ

"সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি ; কবি—কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে, এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্যবিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে। কিন্তু' সকলকে সাহায্য করতে পারে না ; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্যপ্রাপ্ত হয় ; নানারকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়।"


 ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি  বাংলাদেশ অন্তর্গত বরিশাল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষগণ বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণার নিবাসী ছিলেন। পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৩৮-৮৫) বিক্রমপুর থেকে বরিশালে স্থানান্তরিত হন। সর্বানন্দ দাশগুপ্ত জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন; পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন। তিনি বরিশালে ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর মানবহিতৈষী কাজের জন্যে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হন। জীবনানন্দের পিতা সত্যানন্দ দাশগুপ্ত সর্বানন্দের দ্বিতীয় পুত্র। সত্যানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৬৩-১৯৪২) ছিলেন বরিশাল ব্রজমোহন স্কুলের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, বরিশাল ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদক এবং ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক।

জীবনানন্দের মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন গৃহিণী, কিন্তু তিনি কবিতা লিখতেন। তাঁর সুপরিচিত কবিতা আদর্শ ছেলে (আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়ো হবে) আজও শিশুশ্রেণির পাঠ্য। জীবনানন্দ ছিলেন পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান; তাঁর ডাকনাম ছিল মিলু। তাঁর ভাই অশোকানন্দ দাশ ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে এবং বোন সুচরিতা দাশ ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কম বয়সে স্কুলে ভর্তি হওয়ার বিরোধী ছিলেন বলে, বাড়িতে মায়ের কাছেই জীবনানন্দের বাল্যশিক্ষার সূত্রপাত।


অনিশ্চিত মধ্যবিত্ত জীবনের নানামাত্রিক অভিঘাতে জর্জরিত হয়ে একাকিত্ব এবং আধুনিক যুগযন্ত্রণা অবলম্বন করে কবিতাযাপনে ব্রতী ছিলেন তিরিশের প্রধান কবি জীবনানন্দ দাশ। নিসর্গের মোড়কে স্বদেশ, সমাজ, সমকাল এবং অস্তিত্বের হাহাকার উপজীব্য করে কবিতার যে সুদৃঢ় সৌধ তিনি নির্মাণ করেছেন, সেখানে নির্জনতা প্রিয় শুদ্ধ মনীষাকেই কেবল আমন্ত্রণ জানানো হয় না; তার কবিতা সৌধে অবগাহনের মাধ্যমে জীবন স্পর্শও সহজতর হয়। তিনি বলেছেন, ‘শ্মশানের দেশে তুমি আসিয়াছ- বহুকাল গেয়ে গেছ গান/সোনালি চিলের মতো উড়ে আকাশের রৌদ্র আর মেঘে-/লক্ষ্মীর বাহন যেই স্নিগ্ধ পাখি আশ্বিনের জোসনা আবেগে/গান গায়- শুনিয়াছি রাখি পূর্ণিমার রাতে তোমার আহ্বান।’ (শ্মশানের দেশে তুমি আসিয়াছ/রূপসী বাংলা)- সকরুণ ও স্নিগ্ধ এই আহ্বানের ভেতর জীবনানন্দের প্রকৃত কবিসত্তা দুল্যমান। এক জীবন রহস্যময় কবিতার পথে একাকী হেঁটে হেঁটে নিরালম্ব জীবনের আকাঙ্ক্ষাকেই মূর্ত ও বেগবান করেছেন তিনি, এঁকেছেন শাশ্বত মৃত্যুর রূপ, সকরুণ ও নম্র সে স্বর।

‘কি এক ইশারা যেন মনে রেখে এক-একা শহরের পথ থেকে পথেঅনেক হেঁটেছি আমি; অনেক দেখেছি আমি ট্রাম-বাস সব ঠিক চলে;তারপর পথ ছেড়ে শান্ত হ’য়ে চ’লে যায় তাহাদের ঘুমের জগতে:........এক-একা পথ হেঁটে এদের গভীর শান্তি হৃদয়ে করেছি অনুভব;তখন অনেক রাত- তখন অনেক তারা মনুমেন্ট মিনারের মাথানির্জনে ঘিরেছে এসে; মনে হয় কোনোদিন এর চেয়ে সহজ সম্ভব........উড়ে গেছে; বেবিলনে এক-একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতরকেন যেন; আজো আমি জানিনাকো হাজার-হাজার ব্যস্ত বছরের পর।’(পথ হাঁটা)

তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে। এর দীর্ঘ কাল পর ১৯৩৬-এ প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধূসর পাণ্ডুলিপি। ইত্যবসরে কবির মনোজগতে যেমন পরিবর্তন হয়েছে তেমনি রচনাকৌশলও অর্জন করেছে সংহতি এবং পরিপক্বতা। তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ বনলতা সেন প্রকাশিত হয় ১৯৪২-এ। এটি "কবিতাভবন সংস্করণ" নামে অভিহিত। সিগনেট প্রেস বনলতা সেন প্রকাশ করে ১৯৫২-তে। বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের কবিতাসমূহ সহ পরবর্তী কবিতাগ্রন্থ মহাপৃথিবী ১৯৪৪-এ প্রকাশিত। জীবনানন্দর জীবদ্দশায় সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮)। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুর কিছু আগে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা।

কবির মৃত্যু-পরবর্তী প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হলো ১৯৫৭-তে প্রকাশিত রূপসী বাংলা এবং ১৯৬১-তে প্রকাশিত বেলা অবেলা কালবেলা। জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলা'র পাণ্ডুলিপি তৈরি করে থাকলেও জীবদ্দশায় এর প্রকাশের উদ্যোগ নেন নি। তিনি গ্রন্থটির প্রচ্ছদ নাম নির্ধারণ করেছিলেন বাংলার ত্রস্ত নীলিমা। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশকালে এর নামকরণ করা হয় "রূপসী বাংলা।" তার অগ্রন্থিত কবিতাবলি নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলো হলো: সুদর্শনা (১৯৭৩), আলো পৃথিবী (১৯৮১), মনোবিহঙ্গম, হে প্রেম, তোমারে ভেবে ভেবে (১৯৯৮), অপ্রকাশিত একান্ন (১৯৯৯) এবং আবছায়া (২০০৪)।

কবির প্রকাশিত-অপ্রকাশিত গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত সকল কবিতার আঁকড় দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের কাব্যসংগ্রহ সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে। অব্যবহিত পরে গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত সকল কবিতার পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে আবদুল মান্নান সৈয়দের উদ্যোগে। পরবর্তী কালে আবিষ্কৃত আরো কবিতা অন্তর্ভুক্ত করে ক্ষেত্র গুপ্ত ২০০১-এ প্রকাশ করেন জীবনানন্দ দাশের কাব্য সমগ্র। ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে ভূমেন্দ্র গুহ প্রতিক্ষণ প্রকাশনী থেকে প্রকাশ করেন জীবনানন্দ দাশের প্রকাশিত-অপ্রকাশিত-গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত সকল কবিতার আঁকড় গ্রন্থ পাণ্ডুলিপির কবিতা (১৪ খন্ড)।

গল্পগ্রন্থ ও উপন্যাস 

জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত হয় অজস্র গল্প ও উপন্যাস। এগুলোর প্রথম সংকলন জীবনানন্দ দাশের গল্প (১৯৭২, সম্পাদনা : সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী)। বেশ কিছুকাল পর প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৮৯, সম্পাদনা: আবদুল মান্নান সৈয়দ।

প্রকাশিত ১৪টি উপন্যাস হলো : মাল্যবান (১৯৭৩), সুতীর্থ (১৯৭৭), চারজন (২০০৪ : সম্পাদক : ভূমেন্দ্র গুহ ও ফয়সাল শাহরিয়ার)।

প্রবন্ধ

মূলত কবি হলেও সাহিত্যের অধ্যাপক কবি জীবনানন্দ দাশ জীবৎকালে কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা ও প্রকাশ করেছিলেন। ওগুলো প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। এর একটি অংশ নিয়ে কবিতার কথা প্রবন্ধগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে। বাকি প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলো দীর্ঘকাল অপ্রকাশিত ছিল। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে সর্বপ্রথম জীবনানন্দের প্রকাশিত-অপ্রকাশিত-গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত সকল প্রবন্ধ এক মলাটে আবদ্ধ করে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধ সমগ্র। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে জীবনানন্দ দাশের জন্ম শতবর্ষে আরো কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ আবিষ্কৃত হলে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের অগ্রন্থিত প্রবন্ধ সমগ্র।

পত্র 

দীপেনকুমার রায়-এর উদ্যোগে ও সম্পাদনায় জীবনানন্দ দাশের পত্রাবলী প্রকাশিত হয় বাংলা ১৩৮৫ সনে। পরবর্তী কালে আবদুল মান্নান সৈয়দ জীবনানন্দ দাশের পত্রাবলী প্রকাশ করেন ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে। ১০১টি চিঠির সংকলন জীবনানন্দ দাশের চিঠিপত্র (আইএসবিএন ৯৭৮ ৯৮৪ ৫০২ ২৫৫ ২) প্রকাশিত হয় ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে।


                      কবিতার রহস্যময় পথে হাঁটতে হাঁটতে জীবনানন্দ দাশ কালক্রমে হয়ে উঠেছেন সুদূরপ্রসারী এক নির্জন পথের অভিযাত্রী। কেননা, ‘পথ’ মানবজাতির জীবনযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ‘পথ’ কেবল চলার মাধ্যম নয়, পথ লক্ষ্যে পৌঁছারও উপায়। ‘অনেক হেঁটেছি আমি’, ‘একা-একা পথ হেঁটে এদের গভীর শান্তি হৃদয়ে করেছি অনুভব;’ কিংবা, ‘বেবিলনে এক-একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর’- কবির এমন উচ্চারণের মধ্য দিয়ে উপলব্ধ হয়, পথ বহুমাত্রিক, তারও শাখাপ্রশাখা রয়েছে। অনুসন্ধানী সব সময় শতপথের ঠিকানা প্রত্যাশী। জীবনানন্দ দাশ শুধু শহর পরিক্রমণই নয়, গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যময় নিসর্গশোভায় হেঁটে সঞ্চয় করেছেন মানবপ্রেম, বিষণ্নতা, বিপন্ন মানবতার বেদনা এবং হতাশাবোধ। যাপনের এসব অনুষজ্ঞ যুথবদ্ধ হয়েছে জীবনানন্দের বোধে আর প্রকাশিত হয়েছে কবিতায়। তবে পরিবর্তমান কাল, অতীত, বর্তমান এবং ইতিহাসের রূপকাশ্রয়ী বিষাদময় প্রকাশও তার কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। জীবনানন্দের কবিতা চেতনাকে এমনভাবে হরণ করে নেয় যে, জীবনের যাবতীয় কোলাহল-মুখরতা যেন নিমেষেই নিস্তব্ধ হয়ে যায়।

জীবনানন্দ দাশের কবিতার প্রকাশ স্নিগ্ধ, যার অন্তঃস্থলে কোমল ও গভীর চেতনা অনুরণিত হয় সম সময়। এতে পাঠক মোহাবিষ্ট হন। তার কবিতার নান্দনিক সৌন্দর্যে আকণ্ঠ অবগাহনের মাধ্যমে পাঠকের ঘোরগ্রস্ত না হয়ে কোনও উপায় থাকে না। কবির আত্মানুসন্ধান, বিষয়ভাবনা ও নির্মাণকৌশলের ভিন্নতাও স্বতন্ত্র। আপাত পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত সহজ ও সরল শব্দের গাঁথুনিতে তার কবিতা মূর্ত হলেও জীবন চেতনার অন্তর্গত অসুখ ও হাহাকারের ক্রমবর্ধিষ্ণু ধারাটি এখানে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ফলে তার কবিতা হয়ে ওঠে মানবজীবনের গভীর বোধ পরিগ্রহ করে সমাজ সচেতন এবং নগর জীবনের দ্বান্দ্বিকতার সাক্ষ্যবাহী। ‘বোধ’ কবিতায় তিনি বলেন- ‘আলো-অন্ধকারে যাই- মাথার ভিতরেস্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;স্বপ্ন নয়- শান্তি নয়- ভালোবাসা নয়,হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;আমি তারে পারি না এড়াতে,সে আমার হাত রাখে হাতে,সব কাজ তুচ্ছ হয়- পণ্ড মনে হয়,সব চিন্তা- প্রার্থনার সকল সময়শূন্য মনে হয়,শূন্য মনে হয়।’অস্বীকারের উপায় নেই যে, শিল্পের অর্থ বহুরৈখিক। ভাবনা বা দর্শনের ডালপালা মেলে দেয়া তার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মানুষের যাপিত জীবনে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা নানান অর্থ তৈরি করে। যাপনের বাইরেও জীবনের আরও অনেক অর্থ থাকে যা বিশ্লেষিত হতে হতে বহু বিস্তৃত ক্ষেত্রকে স্পর্শ করার সুযোগ ঘটে। এভাবেই কেন্দ্রমুখী সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে জীবনানন্দ দাশ এমন এক ঋদ্ধ অনুভূতিতে পৌঁছান, যেখানে ব্যক্তিক নৈঃসঙ্গ মহৎ শিল্পে স্ফূর্তি লাভ করে। জীবনানন্দের ‘বোধ’ কবিতাটিই এর অনন্য উদাহরণ। বৈশ্বিক চেতনা স্পর্শ করে এ কবিতায় যে বাঁক পরিলক্ষিত হয় তা জীবনের সম্পূর্ণ অভিজ্ঞানকে পরিপূরক করে। তিনি যখন আবারও বলেন-‘সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে!কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারেসহজ লোকের মতো; তাদের মতন ভাষা কথাকে বলিতে পারে আর; কোনো নিশ্চয়তাকে জানিতে পারে আর?’

সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে!’- এই বিস্ময়বোধক অভিব্যক্তি, ‘আলোয় আঁধারে’র বিপরীতমুখী অবস্থান থেকেই সৃষ্ট। মানুষের কাজ ও বাস্তবতাজ্ঞানই তাকে চিন্তা বা উপলব্ধির দিক থেকে সজাগ করে। চিন্তা মানসিক উপাদান, তাই তাকে এড়ানো সহজ নয়। জীবনানন্দ এটা বোঝেন এবং সঙ্গত কারণে মানেন বলেই তার পরিভ্রমণ চলতে থাকে প্রাত্যহিক বাস্তবতার ভেতর। জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই এটা উপলব্ধিতে এনে এক সময় তিনি শূন্যতার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এই ‘শূন্য’ একদিকে জীবনের উদ্ভাসন এবং অপরদিকে নির্বাণের উৎস হিসেবে কবির বোধে প্রকট হয়। ‘বোধ’ কবিতায় তিনি উল্লেখ করেছেন:‘নক্ষত্রের তলে শুয়ে ঘুমায়েছে মনএক দিন;এই সব সাধজানিয়াছি একদিন- অবাধ- অগাধ;’


জীবনানন্দ দাশের কবিতায় অস্তিত্ববাদী চেতনাও স্পষ্ট। বলাই বাহুল্য, ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্ব বিষয়গত সত্য নয় বরং বিষয়ীগত বা ‘Subjective Truth’. ব্যক্তি-অস্তিত্ব চরমে পৌঁছালে জন্ম হয় ‘Paradoxical Situation’-এর। ফলে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পিছিয়ে পড়লে চলে না। দার্শনিক কিয়ের্কেগার্দ ঈশ্বরপ্রেম ও দার্শনিক তত্ত্বে এভাবেই ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্বকে বড় করে দেখেছেন। ঈশ্বরকে অস্বীকার করেননি। জীবনানন্দ দাশও তার ঈশ্বরকে অস্বীকার না করে অস্তিত্ববাদী দার্শনিক তত্ত্বের কাব্যিক প্রয়োগ করেছেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের পুরাণ থেকে আদিম দেবতাদের স্বরূপ তুলে ধরেছেন। ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে প্রকৃতির মিশ্রণ ঘটেছে কবিতায়। তিনি লিখেছেন-


‘আগুন বাতাস জল: আদিম দেবতারা তাদের সর্পিল পরিহাসে তোমাকে দিল রূপ- কী ভয়াবহ নির্জন রূপ তোমাকে দিল তারা; তোমার সংস্পর্শের মানুষের রক্তে দিল মাছির মতো কামনা।’ (আদিম দেবতারা: মহাপৃথিবী)

জীবনানন্দ জানতেন, ‘কবিতা কালজ্ঞানশূন্য প্রপঞ্চ নয়; সময়কে আশ্রয় করে হয়ে ওঠা ব্যক্তির আবেগ ও প্রজ্ঞার সততাপূর্ণ স্মারক’- যে কারণে তিনি ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘কেউ কেউ কবি’। এ উক্তিটি জীবনানন্দ দাশ একজন প্রকৃত কবির স্বাতন্ত্র্যকে বোঝানোর জন্য ব্যবহার করেছেন। বলেছেন, কবিকে তার স্বতন্ত্র ‘সারবত্তা’র কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হয়। ‘সারবত্তা’ শব্দটি মৌলিক, সুনির্বাচিত এবং অসাধারণ। শব্দটি গবেষণালব্ধ। জীবনানন্দ বলেছেন ‘উপমাতেই কবিত্ব’। ‘উপমা’ নিজেই অন্যতম সারবত্তা। ‘উপমা’ কবিতা রচনার অন্যতম উপকরণ বা শিল্পগত উপায়। উপমার ব্যবহারে এমন অনেক কবিতা আছে যা আমাদের পরিচিত এবং বহুল পঠিত হয়ে থাকে। সে সূত্রে উপমার ব্যবহার শুধুমাত্র কবির ক্ষেত্রেই সম্ভব যেহেতু তিনি বুঝে কবিতা লেখেন। জীবনানন্দ দাশ নিজের প্রতিভা ও প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্রটিকে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করেছেন। তার প্রায় সব কবিতায় দ্বিধাহীনভাবে যাপিত সত্যের উদ্বোধনও লক্ষ্যণীয়। আবার-


‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতনসন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজনতখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী- ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।(বনলতা সেন)

জীবনানন্দ দাশ ছিলেন প্রবল ধ্বনিসচেতন কবি। পাঠকের চেতন-অনুভূতিতে নাড়া দেবার প্রত্যাশায় তিনি ধ্বনি নিয়ে নিরীক্ষা করেছেন। এ কবিতায় অশ্রবণীয় শিশির-পতনের শব্দ আর মৃত্যুর নিঃশব্দ আগমন-বার্তার মধ্য দিয়ে নীরব-অন্ধকার হাজির হয়; যেন, কবি অনুভব করেন প্রকৃতির নিয়মতান্ত্রিক চালচিত্র, জীবজন্তুর নিয়তিতাড়িত জীবনযন্ত্রণা। মানুষের বাধ্যবৃত্তিজনিত এই অসহায়ত্বের আড়ালে এই কবিতায় নির্মিতি পায় আশ্বাস-বারতা আর সবশেষে নিথর পৃথিবীর ভয়াবহ নির্জনতা। অন্ধকারে মুখোমুখি নিরালাপ দাঁড়িয়ে থাকার নিষ্প্রয়োজনীয়তার বোধও প্রকারান্তরে পাখা মেলে।


তবে ‘বোধ’ কবিতায় তিনি আমিত্ব ও বহুত্বের ব্যাপকতায় জীবনের প্রকৃত ‘বোধ’কে নানান ক্ষুদ্র বোধের সমষ্টিরূপে সম্পূর্ণ শিল্পে রূপান্তরিত করে তুলেছেন। যে বোধ থেকে প্রতিমুহূর্তে মানুষের নবজাগরণ ঘটতে পারে। সত্য যে, বোধ থেকে মানুষের মুক্তি নেই। কেননা, ইন্দ্রিয়জ উপলব্ধিগুলোকে কিছুতেই এড়ানো যায় না। তিনি যে চেতনে কিংবা অবচেতনে অত্যন্ত নিরীক্ষাপ্রবণ, তাও এ কবিতাটিতে স্পষ্ট। ‘বোধ’ কবিতায় কবির ‘অবাধ’ ও ‘অগাধ’ জীবনের সূক্ষ্ম, গভীর বা বহুমাত্রিক অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ দৃশ্যময়তা অনেক নতুন জিজ্ঞাসার উপাদানকেই তুলে ধরে। জীবনের এই মৌলিক বোধ উপলব্ধিতে আসে বলেই কবি নির্দ্ধিধায় উচ্চারণ করতে পারেন- ‘নক্ষত্রের তলে ঘুমায়েছে মন’। এছাড়া এ কবিতায়, ‘আমি থামি- সেও থেমে যায়’- কবির এই বক্তব্যকে জীবনের পরিসমাপ্তিতে মৃত্যুর সঙ্গে ‘বোধ’ সমাপ্তির নির্দেশক হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।


নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে পরিবর্ধিত সিগনেট সংস্করণ বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটি বাংলা ১৩৫৯-এর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ বিবেচনায় পুরস্কৃত করা হয়। কবির মৃত্যুর পর ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ফেব্রুয়ারি মাসে জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৫৪) সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করে।


==={===={{{{{{{{{{{{========}}}}}}}}}}}====



Tuesday, 15 February 2022

জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি। অমিতা ঠাকুর। ১৬.০২.২০২২. Vol -647. The blogger in literature e-magazine

অমিতা ঠাকুর। 


"লাবণ্যের মেয়েটি বেশ সুন্দর দেখতে হয়েছে। বেচারা অসুখে ভুগছে কিন্তু তবু তার প্রফুল্লতার অবসান নেই। তাকে নিয়ে আমার দাড়ি সামলানো ভারি শক্ত হয়েছে’। মীরা দেবীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের এই চিঠিতে যে শিশুকন্যার কথা বলা হয়েছে তিনি অমিতা ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য অজিতকুমার চক্রবর্তী ও লাবণ্যলেখা দেবীর কন্যা অমিতার জন্ম ১৯১১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি।

 বাল্যবিধবা লাবণ্যলেখার পুনর্বিবাহ দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অমিতার শৈশব, কৈশোর কেটেছে শান্তিনিকেতনে। কবির ছত্রছায়ায়। পাঠভবনে লেখাপড়া, দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে গান আর অভিনয়ের তালিম নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। মাত্র ষোল বছর বয়েসে তাঁর বিবাহ হয় দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র অজীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। এই বিবাহ উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ ‘এসো এসো আমার ঘরে এসো’, ‘অনন্তের বাণী তুমি’ ইত্যাদি গানগুলি রচনা করেছিলেন।

 শান্তিনিকেতনের আশ্রমকন্যা অমিতা নানান নাটকে অভিনয় করেছেন, গান গেয়েছেন ছোট থেকেই কিন্তু সঙ্কোচ কাটত না তাঁর। নন্দিতা কৃপালনীকে এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন সে কথা, ‘বহু কষ্টে অমিতাকে সুদর্শনার পালায় নামাতে পেরেছি। শেষ পর্যন্ত টিকলে হয়’। ‘নটীর পূজা’য় অমিতা করতেন মালতীর অভিনয়।

 আকন্দ ফুলের মালা জড়ানো বেণী চুড়ো করে বেঁধে, গলায় কুঁচ ফলের মালায় সেজে যখন বলতেন ‘যার ডাকে আমার ভাই গেল চলে, যার ডাকে…’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়তেন তখন দর্শকদের চোখেও নামত জলের ধারা। ‘তপতী’ যখন হল অমিতা তখন জোড়াসাঁকোর বধূ। এই নাটকে তাঁর অভিনয় মুগ্ধ করেছিল রসিকজনেদের।

 শান্তিনিকেতনের আর এক আশ্রমকন্যা, অমর্ত্য সেনের মা অমিতা সেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “দেশে বিদেশে বহু প্রসিদ্ধ অভিনয় দেখেছি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ‘তপতী’র মতো অভিনয় আর কোথাও দেখিনি”। ….অপূর্ব অভিনয় অমিতার, অপূর্ব অভিনয় রবীন্দ্রনাথের। এই অভিনয়ে আপ্লুত হয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথও, “অমিতা তপতী সেজে অগ্নিতে প্রবেশ করছে, সে এক অদ্ভুত রূপ। প্রাণের ভিতর গিয়ে নাড়া দেয়। আমি ‘তপতী’র সমস্ত ছবি এঁকে রেখেছিলুম। পরে যত অভিনয়ই হয়েছে আজকাল অমন আর দেখলুম না - সে সত্যি কথাই বলব”।

প্রথমে কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ইতস্তত করেছিলেন অমিতাকে তপতীর ভূমিকা দিতে। দীনেন্দ্রনাথ বললেও কবি খুব নিশ্চিত হতে পারেননি। মহড়া দেখে অবশ্য মুগ্ধ হয়ে যান। এক মাসের ওপর মহড়া দিয়ে পরপর চারদিন অভিনীত হয়েছিল তপতী’। এই অভিনয়ের পর থেকেই রবীন্দ্রনাথ অমিতাকে ‘মহিষী’ সম্বোধন করতেন। কবি অমিতাকে এই নামে একটি পত্রলিপিও পাঠিয়ে ছিলেন।

 মহিষী

তোমার দুটি হাতের সেবা

জানি না মোরে পাঠালো কেবা

যখন হল বেলার অবসান-

দিবস যখন আলোক হারা

তখন এসে সন্ধ্যা তারা

দিয়েছে তারে পরশ সম্মান।

বিক্রম।

 সেবা অবশ্য অনেকই করেছেন অমিতা। রোগশয্যায় কবির সেবা করা ছাড়াও জীবনের শেষ পর্বে যখন কবি ডাক্তারের পরামর্শে আবার মাছমাংস খেতে শুরু করেছিলেন তখন একটা সময় তাঁর কোনকিছুই খেতে ভালো লাগছিল না। সেই সময়পর্বে কবি ছিলেন জোড়াসাঁকোয়, তখন অমিতা তাঁকে পাঁঠার মাংসের হালকা ঝোল করে দিলে তিনি তৃপ্তি করে খেয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরে রবীন্দ্রনাথ গেলেন কালিম্পং।

প্রতিমা দেবী তখন সেখানে ছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, “কলকাতায় অমিতা নাতবৌয়ের হাতের মাংস রান্না অনেক দিন পরে মুখে ভালো লেগেছিল, বার বার বললেন…”। কবির কথা শুনে প্রতিমা দেবীও পাঁঠার মাংস রান্না করলেন। সুধাকান্ত রায়চৌধুরী তখন কবির কাছে ছিলেন। তিনি বললেন, “আজ বৌদি পাঁঠার মাংস রেঁধেছেন, খেয়ে দেখুন”। রবীন্দ্রনাথ তখনও অমিতার রান্নায় এতটাই আপ্লুত ছিলেন যে উত্তর দিয়েছিলেন, “নাতবৌয়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া শক্ত হবে”।


 


কালিম্পং-এই কবি খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁকে নিয়ে আসা হল কলকাতায়। এই সময় টানা দু-মাস তিনি ছিলেন জোড়াসাঁকোয়। সেখানে যাঁরা তাঁর সেবা করেছিলেন তাঁদের অন্যতম অমিতা ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের সেবা করা সহজ কাজ ছিল না। প্রতিমা দেবীর মতে কবির মনের মতো সেবক হতে গেলে “সে ব্যক্তির স্পর্শ হবে কোমল, থাকা চাই তার ঈষৎ ইঙ্গিতেই সব বুঝে নেবার মতো প্রখর কল্পনাশক্তি এবং সে হবে সদাপ্রফুল্ল, হাতের কাজে নিপুণ, উপরন্তু রহস্যালাপের সমঝদার”।


 


রোগজর্জর অবস্থায় লেখা কিছু কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হল “রোগশয্যায়”। উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছিলেন, “রোগের সৌভাগ্য নিয়ে তাঁর আবির্ভাব/ দেখেছিনু যে দুটি নারীর / স্নিগ্ধ নিরাময় রূপে / রেখে গেনু তাদের উদ্দেশে / অপটু এ লেখনীর প্রথম শিথিল ছন্দোমালা”। এই “দুটি নারীর” একজন নন্দিতা কৃপালনী আর অন্যজন অমিতা ঠাকুর। নভেম্বর মাসে কবি ফিরে গেলেন শান্তিনিকেতনে।

কিছুদিন সেখানে থাকার পর নানান অসুস্থতায় জর্জরিত কবিকে ডাক্তারদের পরামর্শে ২৫ জুলাই শান্তিনিকেতন থেকে আনা হল কলকাতায়। কে জানত এই তাঁর শেষ আসা। সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিতেও ছিল সেই দিনটির কথা - “হাওড়া স্টেশন থেকে কর্তাবাবাকে গাড়িতে করে আনা হল জোড়াসাঁকোয় - ছ নম্বরের দোতলায় রইলেন।

 নাতনী বুড়িদি (নন্দিতা কৃপালনী), অমিতা কাকী (অমিতা ঠাকুর), অমিয়া কাকী (অমিয়া ঠাকুর), রাণীদি (রাণী মহলানবিশ) ওঁর সেবা শুশ্রূষায় সারাদিন ব্যস্ত থাকতেন”। প্রতিমা দেবী অসুস্থ থাকায় কবির সঙ্গে শান্তিনিকেতন থেকে আসতে পারেননি। অপারেশনের দিন স্থির হলে তিনি রবীন্দ্রনাথকে যে চিঠিটি লিখেছিলেন, সেটি পড়ে শুনিয়েছিলেন অমিতা ঠাকুর।

 অসামান্যা সুন্দরী অমিতা শান্তিনিকেতনের একটি অন্যরকম অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের চীন ভ্রমণের সময় সু-সী-মো নামে একজন তরুণ সাহিত্যিক তাঁর দোভাষীর কাজ করেছিলেন। দেশে ফিরে কবি একদিন শান্তিনিকেতনের অধ্যাপকদের জাপানী প্রথায় চা-চক্রে আহ্বান করেছিলেন। সেই চা-অনুষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছিল সু-সী-মো চা চক্র।

 সেই অনুষ্ঠানে অমিতা দেবীকে জাপানী সাজে সাজানো হয়েছিল। অমিতা সেনের কথায়, “অমিতা চক্রবর্তী শোভন ধীর মন্থর জাপানী প্রথায় চা পরিবেশন করল। সেদিন তাকে সুন্দর জাপানী মেয়ে বলেই মনে হয়েছিল, এতই মানিয়েছিল তাকে জাপানী পোশাকে”।

অমিতার লেখার হাতটিও ছিল বড় সুন্দর। কবিতা অথবা গদ্য সবেতেই তার ছিল সহজ বিচরণ। “মহলের পর মহল গড়ে ওঠা বাড়িটিকে সাতমহলা বাড়িই বলা যায়। অন্ধকার সব চোরাকুঠুরি, গলিঘুঁজি, স্যাঁতসেঁতে ঘর, উঠোন কত যে আছে তা আর কী বলব! আর এইরকম সব গা-ছমছম করা নিস্তব্ধ নিঝুম জায়গাতেই যে ভূতেরা সংসার পাতে তা কে না জানে!” জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির এই ভূতের গল্পটি রহস্য, রোমাঞ্চ আর পারিবারিক স্মৃতির চমৎকার এক মেলবন্ধন।

 অমিতার লেখা কবিতাও সহজ, সরল ও আন্তরিক। “অন্তহীন পাওয়া সে যে ঋতুতে ঋতুতে / বর্ষণে গানে বিচিত্রিতা মাঝে / শূন্য পাত্র পূর্ণ করি রাখে যে সদাই / তাই মোর দুঃখ কিছুই নাই”। অমিতার পুত্র অভীন্দ্রনাথের অটোগ্রাফ খাতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “হাবলুবাবুর মন পাব বলে/করি চকোলেট আমদানি / আজ শুধু মোর নাম দিয়ে / সাজালেম তার নামদানি”।

 ভালো গানও গাইতেন অমিতা। অথচ মাত্র একটি রেকর্ডে ধরা আছে একটিমাত্র গান - “তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে”। ১৯৯২ সালের মার্চ মাসের ৮ তারিখে রবীন্দ্রনাথের ‘মহিষী’ অমিতা ঠাকুর প্রয়াত হন।।


===={={{{{{{{{{{{={==============={{===



Monday, 14 February 2022

জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। কেদারনাথ বন্দোপাধ্যায় ১৫.০২.২০২২.vol -644. The blogger in literature e-magazine


কেদারনাথ বন্দোপাধ্যায়

 জন্ম ১২৬৯ বঙ্গাব্দের ৪ঠা ফাল্গুন (১৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৮৬৩) রবিবার উত্তর ২৪ পরগণার দক্ষিণেশ্বরে। পিতা গঙ্গানারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কেদারনাথেরা ছিলেন তিন ভাই। গঙ্গাপ্রসাদ ও বিন্দুবাসিনী দেবীর মধ্যম পুত্র কেদারনাথ। দক্ষিণেশ্বর বঙ্গ-বিদ্যালয়ে ( এখনকার দক্ষিণেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয় ) কিছুদিন পড়াশোনা করে উত্তরপাড়া হাই ইংলিশ স্কুলে (বর্তমান উত্তরপাড়া গভর্ণমেণ্ট স্কুল) ভর্তি হন; কিন্তু গঙ্গা পার হয়ে যাতায়াত করতে হত বলে মায়ের আপত্তিতে দু'বছর পর কুটিঘাটা স্কুলে চলে আসেন। দাদা মিরাটে বদলি হয়ে যাওয়ায় সবাই মিরাটে চলে যান। সেখানে কোন্নগর-নিবাসী কেদারনাথ দত্তের স্কুলে ভর্তি হলেন। দু’বছর পরে দাদা বদলী হয়ে চলে আসেন আম্বালায়। আম্বালায় অতি কষ্টে ইংরেজদের একটি কোচিং ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হয়েছিলেন। তারপর ভর্তি হলেন লক্ষ্ণৌ ক্যানিং কলেজিয়েট স্কুলে।


কলকাতায় এসে কেদারনাথ প্রথমে‘হাউণ্ড এলেন কোম্পানী’র সওদাগরি দপ্তরে এবং পরে ‘কমিস্যারিয়েণ্ট অ্যাকাউণ্ট’ অফিসে কাজ করেছেন। অবশ্য ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে মে মাসে 'বালক' মাসিক পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের বেনামি রচনার উপর শ্রীকেদার, দক্ষিণেশ্বর' স্বাক্ষরে 'রত্নোদ্ধার' নামে সরস পত্র লিখে সাহিত্য ক্ষেত্রে আত্মপ্রকাশ করেন। উত্তর কলকাতায় থাকাকালে ১৮৮৮ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতায় 'সংসারদর্পণ’ মাসিক পত্রিকাল সম্পাদনা ও প্রকাশনা শুরু করেন। কেদারনাথের প্রথম প্রকাশিত কাব্যনাটকের 'রত্নাকর' প্রকাশিত হয় ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে। এরপর তিনি আড়াই বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রায় তিন'শ প্রাচীন কবি সঙ্গীত সংগ্রহ করে একখানি সংকলন গ্রন্থ 'গুপ্ত রত্নোদ্ধার' নামে প্রকাশ করেন। কবি হেমচন্দ্র গ্রন্থটির প্রশংসা করেছেন এবং রবীন্দ্রনাথও 'সাধনা’পত্রিকার ১৩০২-এর জ্যৈষ্ঠ সংখ্যাতে এই সঙ্কলনটির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে একটি সুদীর্ঘ নিবন্ধও প্রকাশ করেন। ‘দৈনিক চন্দ্রিকা’ও ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় ‘নন্দীশর্মার নোট’ বা ডায়েরি নামে তিন বছর ধরে হাস্যরসাত্মক ‘চুটকি’ প্রকাশ করেছেন কেদারনাথ। সেনাবাহিনীতে চাকরির সময় কেদারনাথ নানা দেশ ঘুরে ১৯০২ খ্রীষ্টাব্দের জুলাই মাসে চীনে চলে যান। ১৯০৫-এ চীন থেকে ফিরে এসে কানপুরে ষ্টোর অফিসের ভার গ্রহণ করেন এবং সেখানকার ‘বঙ্গ-সাহিত্য-সমাজ’ লাইব্রেরীর সম্পাদকের পদ গ্রহণ করেন। তার আগ্রহ এবং উদ্যোগে এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ-কে আমন্ত্রণ জানান হয় - উদ্দেশ্য ছিল প্রবাসী বাঙালীদের মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ বর্ধন। কেদারনাথের কোন পুত্র সন্তান ছিল না। একমাত্র কন্যার বিয়ের পর তিনি চাকরি ছেড়ে দিতে মনস্থ করেন। ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে চাকরিতে স্বেচ্ছাবসর গ্রহণ করেন এবং কাশীতে বসবাস শুরু করেন। কেদারনাথ 'চীনপ্রবাসীর পত্র’ নামে 'ভারতী’ পত্রিকায় ( চৈত্র ১৩১০ ও বৈশাখ ১৩১১ ) দুটি লেখা লেখেন। লেখা দুটিতে উল্লেখিত নারী শিক্ষা সম্বন্ধে তার নারীদের অর্থকরী বিদ্যাশিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কাশীতে অবস্থান কালেও কেদারনাথ তার সাহিত্য চর্চা চালিয়ে গেছেন। তিনি লিখেছেন -"অন্তরে কিন্তু সাহিত্য প্রীতির আসন পাতাই ছিল। কোথাও না লিখলেও বাড়ীতে একখানা খসরা খাতা খোলা থাকত, অবসর বিনোদনের উপায়ছলে। দশাশ্বমেধে সাধুসন্ত দেখে বেড়াই, সুযোগ হলে সঙ্গও খুঁজি। তদ্ভিন্ন বিশেষ কিছু চোখে পড়লে বাসায় ফিরে অন্তর কণ্ডুয়নবৃত্তি হিসেবে লিখে রাখি। খাতা খানি ক্রমে পুষ্ট হতে থাকে।" এই খাতা অবলম্বন করেই ‘নন্দিশর্মা’ ছদ্মনামে তার ‘কাশীর-কিঞ্চিৎ’ পুস্তক প্রকাশিত হয় ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে। কাশীতে তার সঙ্গে রসরাজ অমৃতলাল বসু ও কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রেরও সাক্ষাৎ হয়। ১৩২৭ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে কাশী থেকে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা‘প্রবাস-জ্যোতিঃ’বছর খানেক সম্পাদনা করেছিলেন কেদারনাথ। দাদা গোপালচন্দ্র সাহিত্য-চর্চাও করতেন। ‘ইণ্ডিয়ান মিররে’ তিনি নিয়মিত লিখতেন। বঙ্কিমচন্দ্র যেমন উচ্চবিত্ত, রবীন্দ্রনাথ যেমন বুদ্ধিজীবী এবং শরৎচন্দ্র যেমন নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালীদের লইয়া সাহিত্য-সংসার রচনা করিয়াছেন, কেদারনাথ তেমনই দরিদ্র বাঙালী কেরাণীদের লইয়া এক নূতন সংসার গঠন করিয়াছেন।

 রচনা কর্ম:

‘রত্নাকর’ (অভিনয় কাব্য, ১৮৯৩

'গুপ্তরত্নোদ্ধার’ ( প্রাচীন কবিদের সঙ্গীত সংগ্রহ, ১৮৯৪

'কাশীর কিঞ্চিৎ’ (রস কবিতা, ১৯১৫

‘কাশী সঙ্গীতাঞ্জলি' (১৯১৬

'চীনযাত্রী' (ভ্রমণ কাহিনী, ১৯২৫

'শেষ খেয়া' (উপন্যাস, ১৯২৫

'আমরা কি ও কে' (লিপিচিত্র, ১৯২৭

‘কবলুতি' (লিপিচিত্র, ১৯২৮

‘কোষ্ঠির ফলাফল' (উপন্যাস, ১৯২৯

'পাথেয়' (গল্প সমষ্টি, ১৯৩০

’ভাদুড়ী-মশাই' (উপন্যাস, ১৯৩১

'দুঃখের দেওয়ালী' (গল্প-সমষ্টি, ১৯৩২

’উড়ো-খৈ’ (রহস্য কবিতা, ১৯৩৪

’আই হ্যাজ' (উপন্যাস, ১৯৩৫

’পাওনা' (উপন্যাস, ১৯৩৬

'মা ফলেষু’ (গল্প সমষ্টি, ১৯৩৬

’সন্ধ্যাশঙ্খ' (গল্পসমষ্টি, ১৯৪০

'নমস্কারী' (গল্পসমষ্টি, ১৯৪৪

’স্মৃতিকথা' (১৯৪৫)। সজনীকান্ত দাশের অনুরোধে ৮২ বৎসর বয়সে তিনি নিজের জীবনের কিছু কথা নিয়ে লেখেন'স্মৃতিকথা'


১৯৩৩ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি জগত্তারিণী স্বর্ণপদকলাভ করেন। সাহিত্য-মহলে কেদারনাথ 'দাদামহাশয়’ নামে পরিচিত ছিলেন। কেদারনাথ ছিলেন ‘প্রবাসী বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলন’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সাহিত্য সেবার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি দিল্লী (১৯২৬), মিরাট (১৯২৭), নাগপুর (১৯৩৪), কলকাতা, কাশী প্রভৃতি স্থানে অনুষ্ঠিত‘প্রবাসী বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলন’-এর সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেছে


শেষ বয়সে বিপত্নীক কেদারনাথ বিধবা কন্যা ও দৌহিত্রদের নিয়ে পুর্ণিয়াতে বসবাস করতেন। সেখানেই ১৩৫৬ বঙ্গাব্দের ১২ই অগ্রহায়ণ (২৯ শে নভেম্বর ১৯৪৯) সোমবার শেষরাত্রিতে ৮৭ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন. 


==========={{======={{{{{{{{{{========

Sunday, 13 February 2022

জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। পঞ্চানন বর্মা । ১ লা ফাল্গুন, ১৪২৮. Vol -645 The blogger in literature e-magazine


পঞ্চানন বর্মা 


আয় আয় রে ক্ষত্রিয়গুলা, তোমাক ডাকোং বারম্বার।

তোমার কান নাই কি, অন্তর নাই কি কান্দন শুনবার? 

হউক না কেনে দূর দূরান্তর, পর্বত নদী মাঝে। 

ক্ষত্রিয় যদি ঠিক হইস তুঞি, তেঞো শুনবু কাছে।। 

আতুরা কান্দন ক্ষত্রিয় কানে আপনে আসি নাগে। 

হিদ্দে উঠে হুড়কা তুফান, শরীলে শক্তি জাগে।। 

ক্ষত্রিয় তখন কি করে! – 

“পাঞোএর ডরে পাহাড় ডাঙ্গে, ফিরিয়া না চায় বীর। 

দুষ্টাক মারি আর্ত্তক তারি, তবে সে হয় রে থির।। 

 

ক্ষত্রিয় এর ধর্ম্ম কি? 

হিন্দু মুসলমান বিচার নাইরে, মানুষ জন্তু নয় ভিন্। 

উল্সি ধায়া আর্ত্তের উদ্ধার, এই ক্ষত্রিয়ের চিন।। 

বিপদ ঝন্ঝাট যতএ আইসে, ততএ উলসে চিত।

আপন বলে বিপদ দমায়, আর গায় ইষ্টের গীত।। 

ক্ষত্রিয় নামটা শক্তি সমূদয়, ভগবানও যাক চায়। 

সেই নামের এই দশা দেখিয়া হিয়া ফাটিয়া যায়। 

 যিনি ঠাকুর পঞ্চানন ও রায় সাহেব নামেও পরিচিত, তিনি কোচবিহারের একজন রাজবংশী নেতা, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, এবং সমাজ সংস্কারক ছিলেন। তিনি নিজের সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে ব্রাহ্মণ্য মূল্যবোধ ও রীতিনীতি পুনঃ জাগিয়ে তোলার জন্য একটি ক্ষত্রিয় সভা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 

১৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৬ তারিখে কোচবিহার রাজ্যের মাথাভাঙ্গা মহকুমার খলিসামারী গ্রামে জোতদার পরিবারে পঞ্চানন বর্মার জন্ম হয়। জন্মের পর তার নাম রাখা হয় পঞ্চানন সরকার। পিতা খোসাল সরকার ছিলেন একজন জোতদার এবং মাথাভাঙ্গা মহকুমা কাচারির মোক্তার। তার মাতা ছিলেন শ্রীমতি চম্পলা সরকার। পঞ্চানন বর্মা ১৯৩৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কলকাতায় 

পরলোকগমন করেন। 


তিনি ১৮৯৩ সালে সংস্কৃত ভাষায় অনার্স নিয়ে কলকাতা কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ১৮৯৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানসিক ও নৈতিক দর্শন বিষয়ে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯০০ সালে কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজ থেকে তিনি এল.এল.বি ডিগ্রি অর্জন করেন। রাজবংশী সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বপ্রথম তিনিই এমএ ডিগ্রি এবং আইন বিষয়ে স্নাতক অর্জন করেন। 


কর্মজীবনের প্রথমদিকে তিনি রংপুর আদালতে আইন অনুশীলন শুরু করেন। রংপুরে তিনি পূর্বে ব্যবহৃত টোগা (উকিলের গাউন) ব্যবহারে উচ্চ বর্ণের আইনজীবীর অস্বীকৃতি দেখে হতবাক হয়েছিলেন। 


তিনি বাংলার বর্ণবাদী হিন্দুদের দৌরাত্ম ও নির্যাতনের শিকার রাজবংশী সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষত্রিয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি উত্তরবঙ্গের ক্ষত্রিয়দের অবহেলিত ক্ষত্রিয় থেকে আর্য জাতির পৌন্ড্রক্ষত্রিয় হিসেবে উচ্চবর্ণের বাঙালিদের শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি অর্জন করতে এই আন্দোলন করেন। তিনি মনে করেছিলেন রাজবংশীদের অবশ্যই সংগঠিত ও শিক্ষিত হওয়া উচিত যা তিনি ক্ষত্রিয় সভার মাধ্যমে অর্জন করার চেষ্টা করেছিলেন। এই সমিতিটি প্রমাণ করে যে রাজবংশীরা রাজকীয় বংশের ক্ষত্রিয় ছিলেন এবং কোচবিহারের রাজা বিশ্ব সিংহের সাথে তাদের ঐতিহাসিক ভাবে যোগসূত্র রয়েছে। সংস্কৃত সাহিত্য এবং ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের উপর ভিত্তি করে তারা শতাব্দী ধরে পরশুরামের ভয়ে নিজেদের সত্য পরিচয় গোপনকারী ক্ষত্রিয় বলে প্রমাণ করেছিল। এই দাবির সমর্থনে এই আন্দোলনটি একটি আনুষ্ঠানিক ক্ষত্রিয়করণ প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। বাংলা ১৩১৯ সালের ২৭ মাঘ পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে লক্ষাধিক রাজবংশীর গণউপনয়ন করা হয় । যার ফলে উত্তরবঙ্গের গ্রামগুলিতে কয়েক হাজার রাজবংশীকে ‘ক্ষত্রিয় রাজবংশী’ হিসাবে প্রমাণ করার জন্য তাদের মধ্যে ব্রাহ্মণ্য রীতিনীতির পুনঃপ্রবর্তন করা হয়েছিল। 

ক্ষত্রিয় আন্দোলন করায় তিনি নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। তাই তিনি রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। ১৯২০ সালে সর্বপ্রথম তিনি সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। একই ধারাবাহিতায় তিনি ১৯২৩ ও ১৯২৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও তিনি জয়লাভ করেন। 



তিনি রাজবংশীদের জন্য ১৩১৭ সালের ১৮ জ্যৈষ্ঠ রংপুর জেলায় ক্ষত্রিয় সমিতি তৈরি করেন । তিনি রংপুর জিলা স্কুলে রাজবংশী ছাত্রদের আবাসন সমস্যা সমাধানের জন্য ক্ষত্রিয় ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠা করেন। দরিদ্র রাজবংশীদের সহায়তা করতে তিনি কুড়িগ্রামে ক্ষত্রিয় ব্যাংক স্থাপন করেন। এছাড়াও তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি ক্ষত্রিয় পত্রিকা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। রাজবংশী সম্প্রদায়ের অবস্থার উন্নতির জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি চাকরিতে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন।


তিনি রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তার সম্প্রদায়ের মধ্যে সাহিত্য বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রকাশিত রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় ১৩১৩ থেকে ১৩১৯ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। 



রাজবংশী সম্প্রদায়ের অধিকার আদায় এবং তাদের অবস্থার উন্নতিকল্পে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার কর্তৃক তিনি ‘রায় সাহেব’ এবং মেম্বার অফ ব্রিটিশ এম্পায়ার (এমবিই) উপাধিতে ভূষিত হন। 


অনেকেই তাকে রাজবংশী জাতির জনক হিসেবে অভিহিত করেন। 


1901 সালে ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার রংপুরে যাওয়ার আগেই হরমোহন খাজান্চী মহাশয় ক্ষত্রিয় আন্দোলন শুরু করেন অর্থাৎ রাজবংশীরা ক্ষত্রিয় এটা সেনসাস রিপোর্টে লেখার দাবী তোলেন। 1317 সালের 18ই বৈশাখ রবিবার রংপুর নাট্যমন্দিরে ক্ষত্রিয় সমিতির প্রথম অধিবেশন আরম্ভ হয়। এই অধিবেশনে প্রায় 400 লোকের সমাগম হয়। 



ক্ষত্রিয় আন্দোলনের সময় 5টা প্রস্তাবের অন্যতম হল দ্বিতীয় প্রস্তাব – রাজবংশী ও কোচজাতি দুইটি পৃথক জাতি ইহা গভর্নমেন্ট কে জানানো। 



কোচ জাতি এই নামটা বা শব্দটা ঐ সময়ে প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ সরকার বা এথনোলোজিস্টদের কাছে আগের থেকেই লিপিবদ্ধ ছিল এই কোচ শব্দটা। রাজবংশী শব্দটা সেই অর্থে কিন্ত নতুন সৃষ্টি। নামের থেকে বড় কথা হল ক্ষত্রিয় আন্দোলনের যিনি প্রথম আহ্বায়ক ওঁনার আর তার সহযোগী কিছু ব্যক্তিবর্গের ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। যদি কোচ আর রাজবংশীর ভাষা কৃষ্টি ও সংস্কৃতি মিলে যায় তাহলে নাম দিয়ে কি যায় আসে। তাছাড়া তিওর রাজবংশী বলে একটা জাতি আছে যাদের দক্ষিণবঙ্গে বসবাস। সেইসময়ে কিছু ব্যক্তিবর্গের তিওর রাজবংশী যোগসূত্র থাকাটা সম্ভব কিনা বলা মুশকিল। 

ক্ষত্রিয় সমিতির প্রথম সভার অন্য প্রস্তাবনার মধ্যে ছিল-

ধনভান্ডার স্থাপন:

প্রথম সভাতেই মোট 960 টাকা সংগৃহীত হয়।

ছাত্র নিবাস:

14700 টাকা ব্যয়ে 32জন ছাত্র বাসের জন্য পাকা বাড়ি নির্মিত হয়। (এই সভার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত যাদবেশ্বর তর্করত্ন মহাশয়।) 



উপনয়ন গ্রহণ :

জলপাইগুড়ির দেবীগন্জের করতোয়া নদীর তীরে। যা দেবীগন্জের মিলন ক্ষেত্র নামে পরিচিত। “27শে মাঘ নির্ব্বিঘ্নে মিথিলা, কামরুপ ও নবদ্বীপের বিখ্যাত পন্ডিত মহাশয়গণের অধ্যক্ষতায় উপনয়ন সমাপ্ত হয় এবং সম্পাদক পঞ্চানন বর্মা তাঁহার মাতা চম্পলা দেবীর নিকট ভিক্ষা গ্রহণ করেন। “



রংপুর কলেজ ও ক্ষত্রিয় সমিতি:

রংপুর কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য গুপ্ত সাহেব (মিঃ জে এন গুপ্ত, আই সি এস, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ) 25 হাজার টাকা চেয়েছিলেন কিন্তু অন্যান্য জেলার ক্ষত্রিয়গণের বিরোধিতায় সমিতি থেকে কোনো সাহায্য দেওয়া হয়নি।


জার্মান যুদ্ধ:

1322 সালে গোয়ালপাড়া থেকে 400/450 ক্ষত্রিয় সৈন্য যোগ দেয়। করাচীর সেনাধক্ষ্য পন্চানন বর্মার নিকট স্বেচ্ছায় লিখিলেন “The men of this (Kshatrya) Community make better soldiers than most of others.” 

সাহিত্য সেবা :

ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার বঙ্গ সাহিত্যে দান যথেষ্ট। শ্রীযুক্ত সুরেন্দ্র চন্দ্র রায় চৌধুরী মহাশয় ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার সহযোগিতায় “উত্তরবঙ্গ সাহিত্য পরিষদ” প্রতিষ্ঠা করেন। ছিল্কা স্বাধীন কামরুপ বা কুচবিহার রাজ্যের গ্রাম্য ভাষায় রচিত তা উদ্ধার আর প্রচারের জন্য অশেষ যত্ন ও চেষ্টা করেছিলেন। 



ক্ষত্রিয় পত্রিকা :

অশিক্ষিত ক্ষত্রিয় সমাজ প্রচলিত সংবাদপত্রের খবর রাখেনা।তাদের গ্রামের বাইরেও যে বিশাল জগৎ আছে এবং দৈনিক কিছু না কিছু ঘটতে চলেছে তার খবর রাখে না। ক্ষত্রিয় সমাজের জন্য রায়সাহেব “ক্ষত্রিয়” নামে এক মাসিক পত্রিকা চালু করেছিলেন। 

ক্ষত্রিয় ব্যাঙ্ক :

1320 সালের সাধারন সভায় রায়সাহেব ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা একটি ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তাব তোলেন ক্ষত্রিয় সমাজকে অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। রংপুর টাউনে উপযুক্ত ক্ষত্রিয় না থাকায় সেখানে ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্ত 1327 সালে ক্ষেত্রনাথ সিংহ মহাশয় কুড়িগ্রাম থেকে রংপুরে ওকালতি করতে আসলে ওনার উদ্যোগেই পরবর্তীতে ক্ষত্রিয় ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।

লাইব্রেরী :

শাস্ত্র প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তিনি একটি লাইব্রেরির অভাব অনুভব করে যত্নপূর্বক একটি ছোট্ট লাইব্রেরী স্থাপন করেছিলেন। 


ডাংধরী মাও

নিদ্রিত ক্ষত্রিয়কে জাগিয়ে তোলার আকূল আগ্রহে রায়সাহেব ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা বিহ্বলমনা হয়েছিলেন, বৃদ্ধবয়সে যুজনচিত ভাব “ডাংধরী মাও” রুপে কবিতায় কাব্যে প্রকাশ পেয়েছিল। পুরুষ যদিও ডাকে সাড়া দিচ্ছিলনা কিন্তু মহাশক্তির অংশরুপা নারী জাতি জেগে উঠল নারীর আর্ত্তনাদে- 

চমকি উঠিল ডুকরণ শুনি, ডাংধরী মোর মাও। 

দিশাদুওর নাই খালি কোল্লহার, দেখে সংসারের ভাও।। 

সোয়ামীর কোলা, বাপ ভাইর ঘর, আর যেইটে নারী থাকে। 

জোর করিয়া নুচ্ছাগুন্ডায় নিয়া যাইতেছে তাকে।। 

বেটা ছাওয়ালা উঠিয়া আইসে, ফ্যাল্ ফ্যাল্ ফ্যাল্ চায়।

ডাংধরী মাও, কোর্দ্ধে হাকি, গাইন ধরিয়া ধায়।

বেটা ছাওয়ার প্রতি-

ছিকো ছিকো রে মরা বেটা ছাওয়া, ধিক্ ধিক্ তোক্ ধিক 

মাও বইনক তোর পরে নিগায়, তেঞো থাকিস্ তুই ঠিক।

আরে মরদ্ মরদ্ কওলাইস রে তুঞি কেমন তোর মর্দানি।

কেবল পাথার বাড়ী হাতে আসি, মাইয়ার আগত কেরদানী?

লাজ নাই তোর, হিয়াও নাই তোর, বল্ নাই তোর ধড়ে।

এই বাদে তোক টেপো বউ ছিকো ছিকো করে।।

কেবল দুষ্টাদমন মোকদ্দমায়, ফিরে না ধরম মান।

ভাঙ্গি নুচ্ছার হাড়, মাও বইনের রক্ষা, বাপের বেটার কাম।।

রাখির না পারিস, মাও মাও বইনক যদি আপন বাহুবলে।

পাপের বোঝা বইছিল মাও তোর, এই দশা তার ফলে।। “

ডাংধরী মায়ের ডাকে যখন নিদ্রিত পুরুষ যখন জাগল না, মানুষ উঠল না, তখন কে অত্যাচারিত কে রক্ষা করে! হতাশ হয়ে” ডাংধরী মাও” ক্ষাত্র শক্তিকে ডাকতে লাগলেন।


শেষজীবন ও মৃত্যু 

মৃত্যুর কয় বছর আগের থেকেই ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা সাংসারিক অভাব অভিযোগে বিশেষ কষ্ট পেয়েছিলেন। কুচবিহার রাজ্য থেকে অবিচারে 5 বছর বহিস্কৃত হওয়ার জন্য সংসারের কোনো শৃঙ্খলা রক্ষা করতে পারেন নি। একমাত্র পুত্র শ্রীমান পুষ্পজিত বর্মন বহু চেষ্টা করেও বি. এ পাশ করতে না পারায় তিনি মনে বড় আঘাত পেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সংযমী চরিত্রের। উদারতা আর মহত্তগুণে তাঁহার চরিত্র আরো মনোরম হয়ে উঠত। তিনি নির্ভীক ও স্পষ্ট বক্তা ছিলেন। ক্ষত্রিয় সমিতিকে তিনি প্রাণের সহিত ভালো ভাসতেন এবং দিনরাত সমাজের কিভাবে উন্নতি করা যায় সেই চিন্তায় করতেন। 


1935 সালের জলপাইগুড়িতে সমিতির বার্ষিক অধিবেশনের ব্যবস্থার সময় অর্থ সংগ্রহের জন্য গ্রামে গ্রামে ঘুরে এবং অতিরিক্ত পরিশ্রমের দরুন শরীর খারাপ হয়ে যায়। অধিবেশনের কাজ শেষ হওয়ার পরে পরেই তিনি ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন ও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হন। কিন্ত ডাক্তারদের চেষ্টা ও অন্যান্যদের আন্তরিক শুশ্রষা সত্বেও রক্তহীনতা ও পক্ষাঘাত রোগে অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যেতে থাকে। মোটামুটি 20/22 দিন রোগ যন্ত্রণা ভোগের পর ইংরেজি 1935 সালের 9 সেপ্টেম্বর তারিখে মেডিক্যাল কলেজেই দেহত্যাগ করেন। তাঁহার মৃত্যু উপলক্ষে কলকাতা ও বিভিন্ন জেলায় বহু শোক সভার অনুষ্ঠান হয়েছিল। 


================{{================



জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। আহমেদ শরীফ। ১৩.০২.২০২২. Vol -642. The blogger in literature e-magazine


আহমেদ শরীফ

 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। সেইসাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অন্যতম রূপকার ছিলেন তিনি।

তাঁর জন্ম ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার সূচক্রদণ্ডীতে। পিতার নাম আব্দুল আজিজ ও মাতার নাম মিরাজ খাতুন। তার পিতা আব্দুল আজিজ ছিলেন চট্টগ্রামের প্রধানতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম সরকারি কলেজিয়েট স্কুলের একজন করণিক। এ মুসলিম পরিবারের অন্দর মহলে শিক্ষার আলো ঢুকিয়েছিল উনিশ শতকেই। তার ষষ্ঠ পূর্ব্বপুরুষ কাদের রজা সন্তানের জন্য কাজী দৌলতের সতী ময়না লোরচন্দ্রানী পুঁথিটি নিজ হাতে নকল করেছিলেন। তার পিতামহ আইন উদ্দিন (১৮৪০ - ১৯৩৭)ছিলেন সরকারি জজ কোর্টের নকল নবিস। চট্টগ্রামের মুসলমানদের মধ্যে প্রথম এন্ট্রাস পাস করা এবং বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি বলে খ্যাত আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছিলেন তার কাকা ও পিতৃপ্রতিম। জন্মের পর হতে আহমদ শরীফ সাহিত্যবিশারদ ও তার স্ত্রীর কাছে পুত্র স্নেহে লালিত-পালিত হয়েছেন। ফলত অনেকের কাছেই তিনি সাহিত্য বিশারদের সন্তান হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তাদের পিতা-পুত্রের এ সম্পর্ক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিল। ১৯৪৭ সালের ৭ নভেম্বর সালেহা মাহমুদের সঙ্গে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তার মৃত্যু ২৪শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯।


আহমদ শরীফ ১৯৩৮ সালে পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় হতে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৪০ সালে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৪২ সালে চট্টগ্রাম কলেজ হতে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক পাস করেন। পরবর্তীকালে ১৯৪৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ২য় বিভাগে ৪র্থ স্থান অধিকার করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে সৈয়দ সুলতান তাঁর গ্রন্থাবলী ও তাঁর যুগ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।


১৯৪৪ সালে দুশ পঞ্চাশ টাকার বেতনে গ্রিভেন্সিভ অফিসার হিসেবে দুর্নীতি দমন বিভাগে চাকরি দিয়ে তার পেশাগত জীবন শুরু করেন। কিন্তু নীতিগত কারণে সেই চাকরি বেশিদিন করেননি। আসলে তার রক্তের শিরায় প্রবাহিত ছিল শিক্ষকতার নেশা, ফলে তিনি ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাস হতে ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত লাকসামের পশ্চিম গাঁও নওয়ার ফয়জুন্নেসা কলেজে অধ্যাপনা করেন। তখন বেতন ছিল মাত্র ১১৫ টাকা। ১৯৪৮ সালে ডিসেম্বর হতে ১৯৪৯ সালের জুন পর্যন্ত ফেনী ডিগ্রি কলেজে অধ্যাপনায় কাটে আরো কিছুদিন। এরপর ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম রিসার্চ অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে যোগ দেন তিনি। চাকরির শর্ত ছিল এই যে, তিনি আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদের বিশাল পুঁথির সম্ভার বিনা অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়ে দিবেন এবং তার বিনিময়ে ঐ পুঁথি দেখভালের জন্য তাকে নিয়োগ করা হবে। এই শর্তের সূত্রেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার ছাড়পত্র লাভ করেন।

১৯৫২ হতে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে বাংলা বিভাগের অস্থায়ী লেকচারার এবং ১৯৫৭ সালে লেকচারার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৬২ সাল হতে তিনি সাংবাদিকতা বিভাগের খণ্ডকালীন অধ্যাপকও ছিলেন। ১৯৬৩ সাল হতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার সেকশনের পাশাপাশি অধ্যাপনায় যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে তিনি বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৩ সালের ৩১ অক্টোবর চূড়ান্তভাবে অবসর গ্রহণ করেন। জীবনের ৩৬ বছরের সম্পর্ক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তার। চাকরি জীবনে তিনি একাধিকবার আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত ‘নজরুল অধ্যাপক পদে’ যোগ দেন এবং ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ঐ পদে কর্মরত ছিলেন।আহমদ শরীফ বড় হয়ে উঠেছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের দুর্লভ অমূল্য পুঁথির ভাণ্ডার ও সাময়িক পত্রপত্রিকার সম্ভারের মধ্যে। তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি ব্যয় করেছেন মধ্যযুগের সাহিত্য ও সামাজিক ইতিহাস রচনার জন্য। যা ইতিহাসের অন্যতম দলিল। বিশ্লেষণাত্মক তথ্য, তত্ত্ব ও যুক্তিসমৃদ্ধ দীর্ঘ ভূমিকার মাধ্যমে তিনি মধ্যযুগের সমাজে ও সংস্কৃতির ইতিহাস বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে দিয়ে গেছেন যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অমর গাঁথা হয়ে থাকবে।



তার লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। তার প্রথম সম্পাদিত গ্রন্থ লায়লী মজনু ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় এই নামে দৌলত উজির বাহরাম খানও একটি গ্রন্থ সম্পাদনা করেন। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে মৌলিক গ্রন্থ বিচিত চিন্তা প্রকাশ হয়।

গ্রন্থতালিকা 

বিচিত চিন্তা
স্বদেশ চিন্তা
কালিক ভাবনা
যুগ যন্ত্রণা
বিশ শতকের বাঙালি
স্বদেশ অন্বেষা
মধ্যযুগের সাহিত্য সমাজ ও সংস্কৃতির রূপ
বাংলার সুফি সাহিত্য
বাঙালির চিন্তা-চেতনার বিবর্তন ধারা
বাংলার বিপ্লবী পটভূমি
এ শতকে আমাদের জীবনধারার রূপ রেখা

নির্বাচিত প্রবন্ধগ্রন্থ :

প্রত্যয় ও প্রত্যাশা
বাঙালি ও বাংলা সাহিত্য (দুই খণ্ড)
সম্পাদনা
একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায় (১৯৮৭)


ভাববাদ, মানবতাবাদ ও মাকর্সবাদের যৌগিক সমন্বয় প্রতিফলিত হয়েছিল তার চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, আচার-আচরণে এবং বক্তব্য ও লেখনীতে। তার রচিত একশতের অধিক গ্রন্থের প্রবন্ধসমূহে তিনি অত্যন্ত জোরালো যুক্তি দিয়ে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা, বিশ্বাস ও সংস্কার পরিত্যাগ করেছিলেন এবং আন্তরিকভাবে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের বিষয়ে আশাবাদী ছিলেন। পঞ্চাশ দশক হতে নব্বই দশকের শেষবধি সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, দর্শন ও ইতিহাসসহ প্রায় সব বিষয়ে তিনি অজস্র প্রবন্ধ লিখেছেন। দ্রোহী সমাজ পরিবর্তনকারীদের কাছে আজো তার পুস্তকরাশির জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়। তার বিশাল পুস্তকরাশির মধ্যে যেমন মানুষের আর্থসামাজিক রাজনৈতিক মুক্তির কথা রয়েছে তেমনি তৎকালীন পাকিস্তানের বেড়াজাল হতে পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তির লক্ষ্যে ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নেতা তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে গঠিত ‘নিউক্লিয়াস' (স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ)-এর সঙ্গে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ১৯৬৫ সালে তার লেখা ‘ইতিহাসের ধারায় বাঙালি’ প্রবন্ধে পূর্ব পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ এবং ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটির কথা উল্লেখ ছিল। এছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ব সময় হতে তার মৃত্যু অবধি তিনি দেশের সকল ক্রান্তিলগ্নে কখনো এককভাবে, কখনো সম্মিলিতভাবে তা প্রশমনের জন্য মুক্ত মনে এগিয়ে এসেছিলেন। উপমহাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে অসামান্য পণ্ডিত, বিদ্রোহী, অসাম্প্রদায়িক যুক্তিবাদী, দার্শনিক, বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব, প্রগতিশীল, মানবতাবাদী, মুক্তবুদ্ধির ও নির্মোহ চিন্তার এক অনন্য ধারক ছিলেন ড. আহমদ শরীফ।


১৯৯৫ সালে একটি উইলের মাধ্যমে তার মরণোত্তর চক্ষু ও দেহদান করার কথা লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন। সে উইলে লেখা ছিল, ‘চক্ষু শ্রেষ্ঠ প্রত্যঙ্গ, আর রক্ত হচ্ছে প্রাণ প্রতীক, কাজেই গোটা অঙ্গ কবরের কীটের খাদ্য হওয়ার চেয়ে মানুষের কাজে লাগাইতো বাঞ্ছনীয়’। তার উইল অনুযায়ী মৃত্যুর পর তার মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের জন্য দান করে দেয়া হয়।

ড. আহমদ শরীফ স্মৃতি পুরস্কার সম্পাদনা
আহমদ শরীফ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত স্বদেশ চিন্তা সংঘ কর্তৃক ড. আহমদ শরীফ স্মারক বক্তৃতা ও পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়েছে। প্রতি বছর এ পুরস্কার প্রদান করা হয়।
=========\\\\\\\\\\\\\\\\\\=========

Friday, 11 February 2022

জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ১২.০২.২০২২. Vol -635. The blogger in literature e-magazine


সুভাষ মুখোপাধ্যায়

"আমার শৈশব কেটেছে রাজশাহীর নওগাঁয়। বাবা ছিলেন আবগারির দারোগা। নওগাঁ শহর ছিল চাকরি, ব্যবসা, নানা বৃত্তিতে রত বহিরাগতদের উপনিবেশ। হিন্দু-মুসলমান এবং বাংলার নানা অঞ্চলের মানুষজনদের মেলানো-মেশানো দিলদরাজ আবহাওয়ায় আমরা একটু অন্যরকমভাবে মানুষ হয়েছিলাম। একদিকে প্রকৃতি, অন্যদিকে যৌথ জীবন। সব সম্প্রদায়েই এমন সব মানুষের কাছে এসেছি যাঁরা স্বধর্মে গোঁড়া, কিন্তু মানুষের সম্বন্ধে উদার। আমার অক্ষরপরিচয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা নওগাঁয়। পড়েছি মাইনর স্কুলে। পাঠ্যবইয়ের চেয়েও বেশি পড়েছি পাঠাগারের বই। সেই সঙ্গে আমাকে শিক্ষা দিয়েছে খেলার মাঠ, গান আবৃত্তি অভিনয়ের মঞ্চ। নওগাঁ শহরের জীবন আমার ব্যক্তিত্বের গোড়া বেঁধে দিয়েছিল".


“ প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা , 

চোখে আর স্বপ্নের নেই নীলমদ্য কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া ।

 চিমনির মুখে শোনো সাইরেন শঙ্খ গান গায় হাতুড়ি ও কাস্তে 

তিল তিল মরণেও অসংখ্য জীবনকে চাই ভালোবাসতে । ” 


কোনো রোমান্টিক ভাবনায় ভেসে যাওয়া নয় , মানুষের দিকে তাকিয়েছিলেন কবি । সেজন্যই কবি ‘ মিছিলের মুখ ’ – এ মুষ্টিবদ্ধ একটি শানিত হাত দেখতে পান , গর্জে ওঠেন শোষণের বিরুদ্ধে । মানুষের কথা বলার জন্য তিনি যে একদিন গদ্যকেও হাতিয়ার করবেন সে ইচ্ছেটি তার কবিভাবনার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ।


১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১২ ফেব্রুয়ারি নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে মামার বাড়িতে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম পিতা ক্ষিতিশচন্দ্র এবং মা যামিনী দেবী । পিতা আবগারি বিভাগে চাকরি করতেন । পিতার বদলির চাকরি হওয়ার জন্য শৈশবে সুভাষ মুখোপাধ্যায়কেও বিভিন্ন স্থানে কাটাতে হয়েছে প্রথমে নওগাঁর স্কুলে ভরতি হলেও ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে সুভাষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা মেট্রোপলিটান স্কুলে ভরতি হন । এরপর সত্যভামা ইনস্টিটিউশনে সপ্তম শ্রেণিতে এবং পরে ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশনে ভরতি হন । শিক্ষক হিসেবে কাছে পান কবি কালিদাস রায়কে । বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সংগীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে । ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করেন । ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএ পাস করেন । এই কলেজ থেকেই ১৯৪১ খ্রিস্টব্দে দর্শন বিষয়ে বিএ ( সাম্মানিক ) এবং পরবর্তী সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন.

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জীবনে রাজনীতির শুরু তাঁর ছাত্রজীবন থেকেই । ১৯৩২-১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে   'বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিশোর ছাত্রদল ‘ – এর সক্রিয় সদস্য হন । সমর সেনের দেওয়া ‘ হ্যান্ডবুক অফ মার্কসিজম্ ’ পড়ে মার্কসীয় মতবাদের প্রতি তিনি অনুরক্ত হন । এরপর ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেন । ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পীসংঘের কমিটিতে বিষ্ণু দে এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায় যুগ্ম – সম্পাদক নির্বাচিত হন । প্রসঙ্গত সাহিত্যিক সোমেন চন্দের নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে গড়ে উঠেছিল— ‘ Anti Fascist Writers and Artists Association ‘ । এরপর তিনি মাসিক পনেরো টাকা ভাতায় পার্টিকর্মী হিসেবে ‘ জনযুদ্ধ ’ পত্রিকায় কাজকর্মের জন্য নিযুক্ত হন । পরে ‘ দৈনিক স্বাধীনতা ‘ পত্রিকায় সাংবাদিকতার কাজে যোগ দেন । কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি ঘোষণা করা হলে সুভাষ মুখোপাধ্যায় কারাবরণও করেন । পরবর্তী সময়ে পার্টির কাজকর্মে বিরক্ত হয়ে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ বর্জন করেন ।

 ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘ পরিচয় ’ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নেন । কয়েক বছরের জন্য সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ‘ সন্দেশ ’ পত্রিকার যুগ্ম – সম্পাদকও হন ।১৯৫১ খ্রিস্টাব্দেই গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন । সুভাষ মুখোপাধ্যায় একজন সৃষ্টিশীল মানুষ । শুধুমাত্র কাব্য নয় , রিপোর্টাজ , ভ্রমণকাহিনি , উপন্যাস , শিশুসাহিত্য , অনুবাদসাহিত্য – সাহিত্যের সব শাখাতেই  সমান বিচরণ ছিল। 


সুভাষ মুখোপাধ্যায়  এর উল্লেখযোগ্য কাব্য : ‘ পদাতিক ‘ ( ১৯৪০ ) , ‘ অগ্নিকোণ ’ ( ১৯৪৮ ) , ‘ চিরকুট ’ ( ১৯৫০ ) , ‘ ফুল ফুটুক ’ ( ১৯৫৭ ) ‘ যত দূরেই যাই ’ ( ১৯৬২ ) , ‘ কাল মধুমাস ‘ ( ১৯৬৬ ) , ‘ এই ভাই ‘ ( ১৯৭১ ) , ‘ ছেলে গেছে বনে ’ ( ১৯৭২ ) , ‘ একটু পা চালিয়ে ভাই ‘ ( ১৯৭৯ ) , ‘ জল সইতে ’ ( ১৯৮১ ) , ‘ চইচই চইচই ’ ( ১৯৮৩ ) , ‘ বাঘ ডেকেছিল ’ ( ১৯৮৫ ) , ‘ যা রে কাগজের নৌকো ‘ ( ১৯৮৯ ) , ‘ ধর্মের কল ’ ( ১৯৯১ )।

অনুবাদ সাহিত্য :

 অনুবাদ সাহিত্য : ‘ নাজিম হিকমতের কবিতা ’ ( ১৯৫২ ) , ‘ দিন আসবে ’ ( ১৯৬১ ) , ‘ পাবলো নেরুদার কবিতাগুচ্ছ ’ ( ১৯৭৩ ) , ‘ রোগা ঈগল ’ ( ১৯৭৪ ) , ‘ হাফিজের কবিতা ‘ ( ১৯৮৪ ) , ‘ চর্যাপদ ‘ ( ১৯৮৬ ) , ‘ অমরু শতক ’ ( ১৯৮৮ ) , ‘ গাথা সপ্তসতী ‘ ( ১৯৯৮ ) ।

 উপন্যাস :

 ‘ হাংরাস ‘ ( ১৯৭৩ ) , ‘ কে কোথায় যায় ’ ( ১৯৭৬ ) , ‘ অন্তরীপ বা হ্যানসেনের অসুখ ’ ( ১৯৯০ ) , ‘ কাঁচা – পাকা ’ ( ১৯৮৯ ) ‘ কমরেড ’ , ‘ কথা কও ‘ ।

 কথা সাহিত্য :

 অনূদিত কথাসাহিত্য : ‘ কত ক্ষুধা ‘ ( ১৯৫৩ ) , ‘ রুশ গল্প সঞ্চয়ন ’ ( ১৯৬৩ ) , ‘ ইভান দেনিসেভিচের জীবনের একদিন ’ , ‘ তমস ’ ( ১৯৮৮ ) । 

ভ্রমন 

রিপোর্টাজ , ভ্রমণকাহিনি , প্রবন্ধ ও আত্মজৈবনিক : ‘ আমার বাংলা ‘ ( ১৯৫১ ) , ‘ ভূতের বেগার ‘ ( ১৯৫৪ ) , ‘ যখন যেখানে ’ ( ১৯৬৭ ) , ‘ ডাকবাংলার ডায়েরি ’ ( ১৯৭২ ) , ‘ ভিয়েতনামে কিছুদিন ‘ ( ১৯৭৪ ) , ‘ যেতে যেতে দেখা ’ , ‘ ক্ষমা নেই ’ ( ১৯৮১ ) , ‘ নারদের ডায়েরি ’ ( ১৯৭৬ ) , ‘ আবার ডাকবাংলার ডাকে ‘ ( ১৯৮১ ) , ‘ অগ্নিকোণ থেকে ফিরে ’ ( ১৯৮৪ ) , ‘ এখন এখানে ’ ( ১৯৮৬ ) , ‘ খোলা হাতে খোলা মনে ’ ( ১৯৮৭ ) , ‘ ঢোলগোবিন্দের আত্মদর্শন ‘ ( ১৯৮৭ ) , ‘ কুড়িয়ে ছিটিয়ে ’ ( ১৯৯০ ) , ‘ কবিতার বোঝাপড়া ’ ( ১৯৯৩ ) , ‘ টানাপোড়েনের মাঝখানে ’ ( ১৯৯৪ ) , ‘ ঢোলগোবিন্দের মনে ছিল এই ’ ( ১৯৯৪ ) । 


 ছোটদের লেখাগ্রন্থ :

   ‘ অক্ষরে অক্ষরে ‘ ( ১৯৫৪ ) , ‘ জগদীশচন্দ্র বসু ( ১৯৫৫ ) , বাঙালির ইতিহাস ( ১৯৫৯ ) , ‘ কথার কথা ’ ( ১৯৫৫ ) , ‘ ইয়াসিনের কলকাতা ‘ ( ১৯৭৮ ) , ‘ মিউ – এর জন্য ছড়ানো ছিটানো ‘ ( ১৯৮০ ) , ‘ টো টো কোম্পানী ‘ ( ১৯৮৪ ) , ‘ রূপকথার ঝুড়ি ’ ( ১৯৮৮ ) , ‘ জানো আর দ্যাখো জানোয়ার ’ ( ১৯৯১ ) ইত্যাদি ।

পুরস্কার ও সম্মাননা

যত দূরেই যাই ‘ কাব্যগ্রন্থের জন্য সুভাষ মুখোপাধ্যায় ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে পুরষ্কৃত হন । এ ছাড়াও ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে জ্ঞানপীঠ এবং ওই বছরই আনন্দ পুরস্কারেও ভূষিত হন পদাতিক কবি সুভাষচন্দ্র মুখোপাধ্যায় । 


 সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের গদ্যলেখায় মানবতাবাদের জয়গান ঘোষিত হয়েছে , আলোচিত হয়েছে সাধারণ মানুষের দুঃখকষ্ট এবং গুরুত্ব পেয়েছে তাদের ওপর সংঘটিত শোষণ অত্যাচারের কাহিনি । সুভাষ মুখোপাধ্যায় (Subhas Mukhopadhyay) রিপোর্টাজধর্মী লেখায় উঠে এসেছে গ্রামগঞ্জের নিখুঁত জীবনযাপনচিত্র , আঞ্চলিক সংস্কৃতি । সুগভীর পর্যবেক্ষণ এবং সাধারণ মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।

 ২০০৩ খ্রিস্টাব্দের ৮ জুলাই পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় অমৃতলোকে যাত্রা করেন ।


 শুধুমাত্র কবি ও গদ্যকার হিসেবেই নয় , একজন মানবতাবাদী মানুষ হিসেবেও পাঠকমহলের হৃদয় মন্দিরে চির ভাস্বর হয়ে থাকবেন ।

পদাতিক

এ গ্রন্থের বধূ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের স্নিগ্ধ রোম্যান্টিকতার বিপরীত ধ্বনি শোনা যায়; কতকটা কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো গানের অনুষঙ্গে –


“ ইহার মাঝে কখন প্রিয়তম

উধাও; লোক লোচন উঁকি মারে

সবার মাঝে একলা ফিরি আমি

-লেকের জলে মরণ যেন ভালো।


চিরকুট 

চিরকুট কাব্যটি বাংলা ফ্যাসিবিরোধী সাহিত্যের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন। শুধু ফ্যাসিবিরোধিতাই নয়, এই কাব্যে উঠে এসেছে ভারতের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের স্মৃতি। স্ফুলিঙ্গ, জবাব চাই, প্রতিরোধ প্রতিজ্ঞা আমার, ফের আসবো, এই আশ্বিনে, চিরকুট প্রভৃতি কবিতায় আছে বিশ্বাস, বলিষ্ঠতা, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ আবার আবেগের বিধুরতাও। ঘোষণা কবিতায় দেখা যায় –

“ গঙ্গার জোয়ার এসে লাগে

ভল্গার তীরের স্পর্শ,

চোখে নব সূর্যোদয় জাগে;

মুক্তি আজ বীরবাহু

শৃঙ্খল মেনেছে পরাভব;

দিগন্তে দিগন্তে দেখি

বিস্ফোরিত আসন্ন বিপ্লব।

অগ্নিকোণ 

১৯৪৮ সালে পার্টির দৈনিকের টাকা তোলার জন্য কবি লেখেন মাত্র পাঁচটি কবিতার সংকলন অগ্নিকোণ। কবির ভাষায়, “রাজনীতিকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতির জন্যেই অগ্নিকোণের প্রকাশ”।[৫] এই কাব্যে কবি উদ্বেল হয়েছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুক্তিসংগ্রামের সংবাদে –

“ লক্ষ লক্ষ হাতে

অন্ধকারকে দু’টুকরো ক’রে

অগ্নিকোণের মানুষ

সূর্যকে ছিঁড়ে আনে।


”অগ্নিকোণ ও ফুল ফুটুক কাব্য রচনার মধ্যবর্তী সময়ে কবি উপলব্ধি করেন এক চরম নান্দনিক সত্য:

“ সেই শিল্পই খাঁটি শিল্প, যার দর্পণে জীবন প্রতিফলিত। তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে যা কিছু সংঘাত সংগ্রাম আর প্রেরণা, জয়, পরাজয় আর জীবনের ভালোবাসা, খুঁজে পাওয়া যাবে একটি মানুষের সব কটি দিক। সেই হচ্ছে খাঁটি শিল্প যা জীবন সম্পর্কে মানুষকে মিথ্যা ধারণা দেয় না। কবিতার গদ্যের আর কথা বলবার ভাষার বিভিন্নতা নতুন কবি স্বীকার করেন না। এমন এক ভাষায় তিনি লেখেন – যা বানানো নয়, কৃত্রিম নয়, সহজ, প্রাণবন্ত, বিচিত্র গভীর, একান্ত জটিল – অর্থাৎ অনাড়ম্বর সেই ভাষা।[৬] ”

এই সত্য প্রতিফলিত হয় তার পরবর্তীকালের কাব্যগুলিতে। কমিউনিজমের বাঁধা বুলি ছেড়ে তিনি চিত্রকল্প নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষায় রত হন এই কাব্যগুলিতে। ফুল ফুটুক কাব্যের আরও একটা দিন কবিতায় অন্ধকারের এক আশ্চর্য ছবি আঁকেন কবি,

“ জলায় এবার ভাল ধান হবে –

বলতে বলতে পুকুরে গা ধুয়ে

এ বাড়ির বউ এল আলো হাতে

সারাটা উঠোন জুড়ে

অন্ধকার নাচাতে নাচাতে।





Thursday, 10 February 2022

জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি। চিত্র পরিচালক ও সাহিত্যিক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। ১১.০২.২০২২. Vol -643. The blogger in literature e-magazine


।    বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত।

১৯৪৪ সালে ১১ ফেব্রুয়ারি পুরুলিয়ার আনাড়ার জন্ম। তাঁর বাবা রেলে চাকরি করতেন। ১২ বছরে হাওড়ার স্কুলজীবন শুরু করেন। তারপর অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবেই কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। তারইমধ্যে চার্লি চ্যাপলিন, আকিরা কুরোয়াওয়া, রবার্তো রোসেল্লিনির মতো চলচ্চিত্র জগতের মহীরূহদের কাজের প্রতি ভালোবাসা গড়ে ওঠে বুদ্ধদেববাবুর। ১৯৭৮ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম ফিচার ফিল্ম ‘দূরত্ব’।


বুদ্ধদেব অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্যামসুন্দর কলেজে এবং কলকাতার সিটি কলেজের পাশে। ১৯৭৬ সালে যখন তিনি এই ফাঁক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন তখন তিনি অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন, যা তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য গ্রহণ করেছিলেন।  এদিকে, কলকাতা ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে তার সদস্যপদ, যেখানে তিনি প্রথম তার কাকার সাথে সিনিয়র হাই স্কুলে থাকা অবস্থা‌য় যাচ্ছিলেন,তা তাকে চার্লি চ্যাপলিন, ইঙ্গমার বার্গম্যান, আকিরা কুরোসাওয়া, ভিত্তরিও দে সিকা, রবার্টো রোসেলিনি এবং মাইকেল এনজেলো আন্তোনিওনির মত পরিচালকের কাজের সাথে পরিচয় করিয়েছিল। । যা পরবর্তীতে, তাকে অভিব্যক্তির একটি পদ্ধতি হিসাবে ফিল্ম তৈরি করতে অনুপ্রাণিত করে।  তিনি ১৯৬৮ সালে ১০ মিনিটের একটি ডকুমেন্টারি দ্য় কন্তিনেন্ত অব লাভ দিয়ে চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন,অবশেষে তিনি ১৯৭৮ সালে তার প্রথম সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ফিচার ফিল্ম, দোরাতওয়া (দূরত্ব) তৈরি করেছিলেন।


তার গীতসংহিতাও চলচ্চিত্রের সাথে বর্ধিত হয়। তার চলচ্চিত্রের কর্মজীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে, দাশগুপ্ত সত্যজিৎ রায়ের বাস্তবসম্মত চলচ্চিত্রগুলির দ্বারা অনুপ্রাণিত চলচ্চিত্রগুলি তৈরি করেছিলেন এবং পরবর্তীতে অন্যান্য রূপে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। বাঘ বাহাদুর, তাহাদের কথা, চারচার ও উত্তরা হল তার বেশিরভাগ প্রশংসিত চলচ্চিত্র।


দাম্পত্য সঙ্গী সোহিনী দাশগুপ্ত । বড় কন্যা, অলকানন্দ দাশগুপ্ত, একজন প্রশিক্ষিত শাস্ত্রীয় পিয়ানোবাদী, তার ২০১৩ সালের চলচ্চিত্র, আনোয়ার কা আজিব কিসসার জন্য পটভূমি স্কোর রচনা করেছিলেন।

সেই শুরু। তারপর থেকে ছক ভেঙে একাধিক সিনেমা করে গিয়েছেন বুদ্ধদেববাবু। ‘তাহাদের কথা’, ‘উত্তরা’, ‘চরাচর’, ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’, ‘বাঘ বাহাদুর', ‘গৃহযুদ্ধ’-এর মতো অসামান্য সিনেমার জনক ছিলেন। ‘উত্তরা’, ‘তাহাদের কথা’-র জন্য পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটক উত্তর যুগে বাংলা সিনেমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বের সামনে। চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, ছবির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। নির্দিষ্ট, ধরাবাধা ছকে এগিয়ে যাননি। বরং ছক ভেঙে এগিয়ে যাওয়াই হয়ে উঠেছিল বুদ্ধদেববাবুর স্বকীয়তা। 


ফিচার ফিল্ম 

সময়ের কাছে (১৯৬৮) (short)

দুরত্ব (১৯৭৮) (Distance)

নিম অন্নপূর্ণা (১৯৭৯) (Bitter Morsel)

গৃহযুদ্ধ (১৯৮২) (The Civil War)

অন্ধ গলি (১৯৮৪) (Blind Alley)

ফেরা (১৯৮৮) (The Return)

বাঘ বাহাদুর (১৯৮৯) (The Tiger Man)

তাহাদের কথা (১৯৯২) (Their Story)

চরাচর (১৯৯৩) (Shelter of the Wings)

লাল দরজা (১৯৯৭) (The Red Door)

উত্তরা (২০০০) (The Wrestlers)

মন্দ মেয়ের উপাখ্যান (২০০২) (A Tale of a Naughty Girl)

স্বপ্নের দিন (২০০৪) (Chased by Dreams)

আমি, ইয়াসিন আর আমার মধুবালা (২০০৭) (The Voyeurs)

কালপুরুষ (২০০৮) (Memories in the Mist)

জানালা (২০০৯) (The Window)[৪]

মুক্তি(২০১২)

পত্রলেখা (২০১২)

আনোয়ার কা আজিব কিসসা (২০১৩) (Sniffer, Hindi)[৫]

টোপ (২০১৭)

তথ্যচিত্র ও টিভিকর্ম সম্পাদনা

দ্য় কন্তিনেন্ত অব লাভ (১৯৬৮)

ধোলার রাজা খিরোড নত্ত (১৯৭৩)

ফিশারম্যান অব সুন্দরবন (১৯৭৪)

সারাচন্দ্র (১৯৭৫)

রিদম অব ষ্টিল(১৯৮১)

ইন্ডিয়ান সায়েন্স মার্চে অ্যাহেড (১৯৮৪)

বিজ্ঞান ও তার আবিষ্কার (১৯৮০)

গ্লাস স্টোরি (১৯৮৫)

ভারত অন দ্য মুভ (১৯৮৫)

সিরামিকস (১৯৮৬)

আরণ্যক (১৯৯৬)

কন টেম্পোরারি ইন্ডিয়ান স্ক্‌লাপচার (১৯৮৭)

হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান জুট(১৯৯০)


বছরের পর বছর ধরে তিনি গভীর আড়ালে, কফিন কিংবা সুটকেস, হিমজগ, ছাতা কাহিনি, রোবটের গান, শ্রেষ্ঠ কবিতা, ভোম্বোলের আশ্চর্য কাহিনি ও অন্যান্য কবিতা সহ কবিতার বিভিন্ন রচনা প্রকাশ করেছেন। 

২০২১ সালের ১০ই জুন দক্ষিণ কলকাতার নিজের বাসভবনে মৃত্যু হয় তার । সকাল ৬টায় ঘুমের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে। অনেকদিন ধরেই তিনি কিডনির অসুখে ভুগছিলেন। চলছিল ডায়ালিসিস। কিডনির সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বার্ধক্যজনিত সমস্যা। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর।

বুদ্ধদেববাবুর প্রয়াণে চলচ্চিত্র জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিচালক তরুণ মজুমদার বলেন, ‘খুবই বড় ক্ষতি। আমি হতবাক।’ পরিচালক গৌতম ঘোষ বলেন, ‘এই ভয়ংকর সময় এই খবরটা আরও মর্মান্তিক। শরীর খারাপ ছিল। তবে কবিতা লিখছিলেন। ফোনে কথা বলছিলেন। একসঙ্গে স্বপ্ন দেখছিলাম। তাঁর চলচ্চিত্র যাতে সংরক্ষিত হয়, সেই আর্জি জানাব।’

পুরস্কার ও সম্মাননা সম্পাদনা

২০০৮ সালের ২৭ মে স্পেনের মাদ্রিদ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তকে জীবনকালের কৃতিত্বের সম্মাননা প্রদান করা হয়।[১]

২০০৭ সালে এথেন্স আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন এথেনা পুরস্কার

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার

সেরা চলচ্চিত্র

১৯৮৯: বাঘ বাহাদুর

১৯৯৩: চরাচর

১৯৯৭: লাল দরজা

২০০২: মন্দ মেয়ের উপাখ্যান

২০০৮: কালপুরুষ

সেরা নির্দেশনা

২০০০: উত্তরা

২০০৫: স্ব‌প্‌নের দিন

সেরা চিত্রনাট্য

১৯৮৭: ফেরা

বাংলাতে সেরা ফিচার ফিল্ম

১৯৭৮: দোরাতওয়া

১৯৮৭: ফেরা

১৯৯৩: তাহাদের কথা

শ্রেষ্ঠ আর্টস / সাংস্কৃতিক ফিল্ম

১৯৯৮: এল পেইন্টার অফ ইলোকেন্ট সাইলেন্স: গণেশ পাইন

ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভাল

১৯৮২: এফআইপিআরএসসিআই পুরস্কার: গৃহযুদ্ধ

২০০০: শ্রেষ্ঠ পরিচালনার জন্য সিলভার লায়ন: উত্তরা

১৯৮২: গোল্ডেন লায়ন মনোনয়ন: গৃহযুদ্ধ

২০০০: গোল্ডেন লায়ন মনোনয়ন: উত্তরা

বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

১৯৮৮: গোল্ডেন বিয়ার মনোনয়ন: ফেরা[৬]

১৯৯৪: গোল্ডেন বিয়ার মনোনয়ন: চারাচার [৭]

লোকার্নো ফিল্ম ফেস্টিভাল

সমালোচকদের পুরস্কার: দোরাতওয়া

বিশেষ জুরি পুরস্কার: নিম অন্নপূর্ণা

এশিয়া প্যাসিফিক চলচ্চিত্র উৎসব

সেরা চলচ্চিত্র: জানালা

কার্লোভি ভারি ফিল্ম ফেস্টিভাল

বিশেষ জুরি পুরস্কার: নিম অন্নপূর্ণা

দামাস্কাস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

গোল্ডেন প্রাইজ: নিম অন্নপূর্ণা

ব্যাংকক আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভাল

সেরা এশিয়ান ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড (২০০৩): মন্দ মেয়ের উপাখ্য়‌ান।


কবিতায় সিনেমার রুদ্ধ দরজা খুলে দিয়েছেন তিনি। পাঠকের মনে হবে ছবি দেখছেন। শব্দে শব্দে গতিশীল ছবি। যা প্রবাহিত হচ্ছে অনুভবে, উপলব্ধিতে।  ছোট ছোট দৃশ্য দিয়ে বোনা হয়েছে কবিতার কোলাজ। যেমন-



শাড়ির ফলস পাড় উঠে পড়ছে অনেকদূর


চক্রাকারে বেড়ে উঠেছে ক্রমশ ঢের শান্ত এক তি


মাঝখানে আছে সময় যা পার হলে বোঝা যাবে স


মানুষের কোন কোন অঙ্গ  হৃদয়ের মতো বিষন্ন হ


মাইল মাইল ঘুরে আসার বদলে আমার হলুদ হাত

শুয়েছিল তোমার হাতের নীচে


অন্যরকম এক কবিতা। এই কবিতার নীচে শুয়ে আছে যত্নলালিত ছবি। যেন ক্যামেরার উজ্জ্বল লেন্স থেকে এক একটি শব্দ বেরিয়ে এসে সাজিয়ে তুলছে কবিতার খাতা। যেন  বিকেল শেষ  হয়ে গেছে। ম্লান আলোর ভেতর উঠে আসছে কয়েকটি লাই


"… শেষ হয়ে আসছিল তখন, বিকেল শেষ হয়ে এ

আমি ঘুরে দাঁড়ালাম,

দেখলাম আমার স্নানের জল

তুলে দিচ্ছে বুড়ি।

এক প্রসন্ন আশ্রয়ের ছবি ভেসে উঠছে সন্ধ্যের মর্মরিত আলোয়। কবিতা নয় এক সিনেমার দৃশ্যপট দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে পাঠক। বন্দুকের গল্প কবিতার দিকে যদি আমরা তাকাই কী দেখব, শব্দ দিয়ে বুনে ফেলা সিনেমা

হাড় হিম ছোট্ট ফোকরের ভেতর

সেই বন্দুক শুয়ে থাকে সারা রাত,

সারা রাত সমস্ত শহর জুড়ে  ফ্যান ঘোরার শব্দ

শুনতে পায় সেই বন্দু

বন্দুকের ঘুম হয় না


ছোট্ট এই ছবির ভেতর উঠে আসছে অস্থির সময়। রক্তলাঞ্ছিত সময়ের রূপ। কয়েকটি লাইন দিয়ে সেই চলমান ছবিটি ধরা আছে কলমের আশ্চর্য লেন্সে

ডিম কবিতায় আমরা জীবনের চিরন্তন ছবি দেখতে পাই।


"কেন না বেঁচে থাকা মানে

ক্রমাগত  ডিম পাড়ার স্বপ্ন দেখা  ও ডিম পাড়ার জন্য অপেক্ষা করা

আর কিছু ন

যার ভেতর থেকে একদিন মাথা ঠুকতে ঠুকতে  আমরাও বেরিয়ে এসেছি।


  কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কবিতায়  বাড়ি, ঘর, চার দেওয়াল, গাছপালা, জল মাটি, পাখি, পাখির ডিম, ছাতা, পাহাড় এসব বারবার এসেছে। জীবন মানে তো শুধু মানুষ নয়। শুধু মানুষ তো নির্জীব। দৃশ্যই পারে মানুষের ভেতরে যে জীবন যে সজীবতা তাকে বাঙময় করে তুলতে।


========}}}}}}}}{{{{{{{{{{==============



শুভ জন্মদিন শ্রদ্ধাঞ্জলি। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ।‌ একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ। Dt -26.11.2024. Vol -1059. Tuesday. The blogger post in literary e magazine.

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়   (২৬ নভেম্বর ১৮৯০ — ২৯ মে ১৯৭৭)  একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ.  মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্...