Tuesday, 23 August 2022

স্মরণীয় প্রয়াণ দিবস। বাঙালি স্থপতি নীলমণি মিত্র। Vol -837. Dt -24.08.2022. ৭ই ভাদ্র, ১৪২৯. বুধবার। The bolgger in litareture e-magazine.





নীলমণি মিত্র


মৃত্যু - ২৪ আগষ্ট,১৮৯৪. ৬৬ বছর বয়স। 

একজন ভারতীয় বাঙালি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার তথা পুর-প্রকৌশলী এবং স্থপতি।  যিনি ঊনিশ শতকের কলকাতার বিখ্যাত প্রাসাদের পরিকল্পনা ও নকশা তৈরি করেছিলেন । তিনিই ছিলেন বিহারের মধুপুরে বাঙালিদের বসতি স্থাপনের পথপ্রদর্শক ।
তিনি ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি ডায়মন্ড হারবার ২ নম্বর উন্নয়ন ব্লকের অন্তর্গত বারাদা গ্রামে তাঁর মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন।[৪] তার পিতা ছিলেন সুখময় মিত্র। নীলমণির শৈশব কেটেছে মামার বাড়িতে। স্কুলের পড়াশোনার শুরু হয় পাঠ কলকাতার ভবানীপুরের লন্ডন মিশনারি স্কুলে। পরে ভর্তি হন তৎকালীন ফ্রি চার্চ ইনস্টিটিউশনে (বর্তমানে স্কটিশ চার্চ কলেজ)। তার হাতের লেখা ভালো ছিল না, সেকারণে উপযুক্ত কাজের সুযোগ না পেয়ে চলে যান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অধীনস্থ কলেজ অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাট রুরকি তে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করতে। তিনি প্রথম বাঙালি স্নাতক প্রকৌশলী হন।
কলেজের পাঠ শেষ করে প্রথম বাঙালি হিসেবে রুড়কি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করেন। সরকারি ইঞ্জিনিয়র হিসেবে শুরু করলেও পরে স্বাধীন ভাবে স্থপতি হিসেবে কাজ করেছেন। বাগবাজারে নন্দলাল বসুর বাড়ি, যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের ‘প্রাসাদ’ ও এমারেল্ড বাওয়ার-সহ কলকাতার বহু বিখ্যাত বাড়ি তৈরি করেন তিনি। সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ, মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন, কাল্টিভেশন অব সায়েন্স-এর বাড়ি তৈরির জন্য কোনও পারিশ্রমিকও নেননি। মধুপুরে বাঙালি উপনিবেশের পথ দেখান তিনিই। ২৫ অগস্ট সন্ধে সাড়ে ছ’টায় তাঁর একটি আবক্ষ মূর্তি ও স্মারক-ফলক বসানো হবে তাঁরই নামাঙ্কিত টালার নীলমণি রো-তে। থাকবেন হেরিটেজ কমিশনের সভাপতি শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য, পুরসভার চেয়ারম্যান সচ্চিদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, ইতিহাসবিদ হিমাদ্রিশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। ‘পাইকপাড়া-টালার ঐতিহ্য ও নীলমণি মিত্র’ শীর্ষক নীলমণি মিত্র স্মারক বক্তৃতা দেবেন কলকাতা-গবেষক দেবাশিস বসু। অনুষ্ঠানে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের লেখা সর্ব্বপ্রথম বাঙ্গালী এঞ্জিনীয়র নীলমণি মিত্র বইটি প্রকাশ করবেন অনিন্দ্য কারফরমা।


নীলমণি তার কর্মজীবন শুরু করেন গঙ্গা নদী প্রকল্পের গাঙ্গেয় ক্যানাল বিভাগে। এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিভাগের সহকারী স্থপতি হন তিনি। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি তিরিশ বৎসর বয়সে, সহকারী প্রকৌশলী তথা অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদে উন্নীত হন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে মতপার্থক্যের কারণে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন এবং প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেন। ঊনবিংশ শতকের প্রাসাদনগরী কলকাতার বহু প্রাসাদ-অট্টালিকা নির্মাণে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। কলকাতার 'সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ'এর ভবন ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন তথা বিদ্যাসাগর কলেজ ভবনের পরিকল্পনা তিনি বিনা পারিশ্রমিকে করেন। মহেন্দ্রলাল সরকারের ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্স’এর বৌবাজারস্থিত প্রথম ভবনটি তিনি কেবল বিনা খরচে তৈরি করেন নি, বরং বিজ্ঞান গবেষণার মহৎ উদ্দেশ্যে তিনি এক হাজার টাকা দান করেছিলেন। এছাড়াও তিনি নন্দলাল বসুর প্রসাদ, বাগবাজারের পশুপতিনাথ বসু, কীর্তিচাঁদ মিত্রের মোহনবাগান ভিলা, যতীন্দ্র মোহন ঠাকুরের প্রাসাদ এবং বর্তমানে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের এমারল্ড বোওয়ার নকশা নীলমণি মিত্রের পরিকল্পনাপ্রসূত। মাহেশের বিখ্যাত জগন্নাথ দেবের রথের নকশাও তার তৈরি। তৎকালীন বিহারের (অধুনা ঝাড়খণ্ডের) মধুপুরে বাঙালি-বসতি স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন।

নীলমণি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিজ্ঞানসভার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি একটি 'করদাতা সমিতি' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
উত্তর কলকাতার আর জি কর হাসপাতালের পিছনে টালায় 'নীলমণি রো' তার নামে নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়াও বেনিয়াটোলা অঞ্চলের গরানহাটায় একটি রাজপথ তার নামে "নীলমণি মিত্র স্ট্রিট" নামে রাখা হয়েছে। নীলমণি মিত্রের ১১৬ তম প্রয়াণ বার্ষিকীর পরেরদিন টালায় কুমারটুলির নব পাল দ্বারা ফাইবার গ্লাসে নির্মিত নীলমণি মিত্রের আবক্ষ মূর্তি স্থাপনা করা হয়। 


নীলমণি'রা ছিলেন কাশীশ্বর মিত্রের অগ্রজ রূদ্রেশ্বর মিত্রের বংশধর যিনি কলকাতায় নামী ঘাটটি নির্মাণ করেছিলেন।  মিত্র পরিবারের আদি নিবাস ছিল গোবিন্দপুর গ্রামে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দ্বিতীয় ফোর্ট উইলিয়াম নির্মাণের সময় মিত্র পরিবার উৎখাত করলে তারা ভবানীপুর অঞ্চলের জেলেপাড়ায় বসতি স্থাপন করেন।

চারুকলা অনুষদ - রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের এমারল্ড বোওয়ার ক্যাম্পাস।


Saturday, 13 August 2022

স্মরণীয় প্রয়াণ দিবস। জার্মান কবি ও নাট্যকার বার্টল্ট ব্রেখট। Vol -826. Dt -14.08.2022. ২৭ শ্রাবণ,১৪২৯. রবিবার। The blogger in literature e-magazine


১৯৫৬ সালের ১৪ আগস্ট মাত্র ৫৮ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত জার্মানির বার্লিন শহরে বার্টল্ট ব্রেখটের মৃত্যু হয়।

সারাজীবনে অনেক নাটক, গল্প ও সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য লিখেছেন তিনি। তাঁর রচিত কিছু বিখ্যাত বই ‘স্টোরিস অফ মিস্টার কেউনার’, ‘টু দোজ বর্ন আফটার’, ‘লাভ পোয়েমস’, ‘টেলস ফ্রম দ্য ক্যালেন্ডার’ প্রভৃতি। ব্রেখটের গল্প থেকে তৈরি হয়েছে অনেক চলচ্চিত্র, যেমন ‘গ্যালিলিও’, ‘দ্য মাদার’, ‘দ্য শেমলেস ওল্ড লেডি’ ইত্যাদি। তাঁর লেখা কিছু বিখ্যাত কবিতা হল, ‘আ ব্যাড টাইম ফর পোয়েট্রি’, ‘চিলড্রেন’স ক্রুসেড’, ‘ফ্রম আ জার্মান ওয়ার প্রাইমার’, ‘জার্মানি’ ইত্যাদি। মৃত্যুর সময় তাঁর অনেক নাটক অসমাপ্ত ছিল ও অনেক সমাপ্ত নাটকও অভিনীত হয়নি।

সাহিত্যকর্ম


(১৯২৮) ডি দ্রাইগ্রোশেন্‌ওপার (Die Dreigroschenoper, বাংলায় "তিন পেনির অপেরা")
(১৯৩০) আউফষ্টিগ উন্ট ফাল ডের ষ্টাট মাহাগোনি (Aufstieg und Fall der Stadt Mahagonny, বাংলায় "মাহাগোনি শহরের উত্থান ও পতন")
(১৯৪১) মুটার কুরাগে উন্ট ইরে কিন্ডার (Mutter Courage und ihre Kinder, বাংলায় "মা সাহস ও তার সন্তানেরা")
(১৯৪৩) লেবেন ডেস গালিলাই (Leben des Galilei, বাংলায় "গ্যালিলিওর জীবন")
(১৯৪৮) ডের কাউকাজিশে ক্রাইডেক্রাইস (Der kaukasische Kreidekreis, বাংলায় "ককেশীয় চকবৃত্ত")

রচনাবলি
The Threepenny Opera
Life of Galileo
Mother Courage and Her Children
The Good Person of Szechwan
The Caucasian Chalk Circle
Mr Puntila and his Man Matti
The Resistible Rise of Arturo Ui

১৮৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জার্মানির অগসবার্গ (Augsburg) শহরে ব্রেখট-এর জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম ছিল ইউগেন বার্থোল্ড ফ্রেডরিখ ব্রেখট (Eugen Berthold Friedrich Brecht)। তাঁর বাবার নাম বার্থোল্ড ফ্রেডরিখ ব্রেখট এবং মায়ের নাম ছিল সোফি। তাঁরা উভয়েই খ্রীস্টান ধর্মে বিশ্বাসী হলেও সোফি ছিলেন ধার্মিক প্রটেস্ট্যান্ট এবং ফ্রেডরিখ ছিলেন রোমান ক্যাথলিক। তিনি একটি কাগজের কলে কাজ করে জীবিকানির্বাহ করতেন। পরবর্তীকালে কিশোর ব্রেখটের সাথে পাওলা বানহোলজার (Paula Banholzar) নামে এক মহিলার সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তাঁদের ফ্রাঙ্ক ব্রেখট নামে একটি পুত্রসন্তানও জন্ম নেয়। কিন্তু এই সম্পর্ক পরিণতি পায়নি। মারিয়ানি জোফ (Marianne Zoff) নামে এক মহিলাকে ব্রেখট বিবাহ করেন। এই দম্পতির হ্যানি হাইওব (Hanne Hiob) নামে একটি কন্যাসন্তান জন্ম নিয়েছিল। তবে এই বিবাহও স্থায়ী হয়নি বেশিদিন। অভিনেত্রী হেলেন ওয়েগেল (Helen Weigel)-এর সঙ্গে ব্রেখটের পুনরায় বিবাহ হয়। হেলেন ও ব্রেখটের স্টিফান ব্রেখট (Stefan Brecht) নামে এক পুত্র ও বারবারা মেরি ব্রেখট (Barbara Marie Brecht) নামে এক কন্যা ছিল।

তাঁর মায়ের কথায় ছোটবেলায় ব্রেখট বাইবেল শিখেছিলেন যা সারাজীবন ধরে তাঁর লেখায় প্রভাব ফেলেছিল। অগসবার্গের বিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে ব্রেখটের পরিচয় হয় ক্যাসপার নেহার (Caspar Neher)-এর সাথে। এই বন্ধুত্ব আজীবন ছিল। পরবর্তীকালে নেহার তাঁর অনেক নাটকের সেট আঁকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে নানাভাবে ব্রেখটকে সাহায্য করেন।

যখন ব্রেখটের বয়স ১৬ বছর, তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে এ বিষয়ে উৎসাহী হলেও সেনাবাহিনীর হাতে তাঁর সহপাঠীদের নিগৃহীত হতে দেখে তিনি মন পরিবর্তন করেন। ১৯১৫ সালে বিখ্যাত রোমান কবি হোরাসে (Horace)-এর একটি বিখ্যাত কবিতার লাইন “Dulce et decorum est pro patrika mori” (দেশের জন্য জীবন বিসর্জন মধুর ও গৌরবময়)-এর প্রতিবাদে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তাঁর মতে এটি ছিল “একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সস্তা প্রচার” (Zweckpropaganda) এবং একজন বুদ্ধিহীন ব্যক্তিকেই এইভাবে দেশের জন্য মৃত্যুবরণ করতে প্ররোচিত করা যেতে পারে। এই প্রবন্ধ লেখার জন্য তিনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের রোষনজরে পড়েন এবং তাঁকে বিদ্যালয় থেকে বিতাড়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বিদ্যালয়ের সহশিক্ষক পাদ্রী রোমুয়াল্ড সাওর (Romuald Sauer)-এর হস্তক্ষেপে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারেনি।
তাঁর বাবার সুপারিশে ব্রেখট নানা অজুহাত দিয়ে সৈন্যবাহিনীতে যোগদান করা এড়িয়ে যান। পরবর্তীকালে ১৯১৭ সালে ব্রেখট মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মেডিক্যাল কোর্সে ভর্তি হন। এখানে তিনি আর্থার কুচার (Arthur Kutscher)-এর কাছে নাটক শিক্ষা করেন। কুচার তরুণ ব্রেখটকে ব্যতিক্রমী নাট্যকার ও ক্যাবারে তারকা ফ্রাঙ্ক ওয়েডকাইন্ড (Frank Wedekind)-এর প্রশংসায় অনুপ্রাণিত করেন।

তার আগে থেকেই ‘বার্ট ব্রেখট’ নাম নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে ব্রেখট প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। ১৯১৮ সালের শরৎকালে একমাত্র জন্মভূমি অগসবার্গে ফিরে আসার জন্যই তিনি সামরিক জীবনে যোগ দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেন। তিনি সামরিক যৌনস্বাস্থ্য সম্বন্ধীয় চিকিৎসাকেন্দ্র (vd clinic)-এ একজন কর্মী হিসেবে অগসবার্গে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এর এক মাস পরেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়য়।

১৯১৮ সালে ব্রেখট তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের নাটক ‘বাল’ লেখা শেষ করেন। তিনি বলতেন, “যে কেউই সৃজনশীল হতে পারে।” এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯১৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে সম্পূর্ণ হয় তাঁর দ্বিতীয় নাটক ‘ড্রামস ইন দ্য নাইট’। ১৯২০ অথবা ১৯২১ সালের কোনো এক সময় ব্রেখট মিউনিখের কৌতুকাভিনেতা কার্ল ভ্যালেন্টিন (Karl Valentin)-এর রাজনৈতিক দলের একটি ছোট অংশ হয়েছিলেন। তিনি এরপর ভ্যালেন্টিনের অনেক অনুষ্ঠান দেখছিলেন এবং ভ্যালেন্টিনকে তুলনা করেছিলেন সর্বকালের সেরা কৌতুকাভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন-এর সঙ্গে।

১৯২১ সালের নভেম্বর থেকে ১৯২২ সালের এপ্রিলের মধ্যে ব্রেখট অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গের সাথে পরিচিত হন। নাট্যকার আর্নল্ট ব্রনেন (Arnolt Bronen)-এর সাথে যুগ্মভাবে তিনি ‘আর্নল্ট ব্রনেন/বার্টল্ট ব্রেখট কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এইসময় ব্রেখট তাঁর নামের প্রথম অংশ পরিবর্তন করেন ও ‘আর্নল্ট’ নামের সঙ্গে মিলিয়ে রাখেন ‘বার্টল্ট’। এরপর থেকে তিনি সর্বত্র এই নামে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯২২ সালে মিউনিখে থাকাকালীন ব্রেখট বার্লিনের প্রভাবশালী সমালোচক হারবার্ট ইহারিং (Herbert Iharing)-এর সংস্পর্শে আসেন। হারবার্ট তাঁর নাটকগুলির সমালোচনা করেন, যা ব্রেখটকে প্রভাবিত করে। ১৯২৩ সালে একটি ছোট কৌতুক বিষয়ক চলচ্চিত্র ‘মিস্ট্রিজ অফ এ বারবারশপ’-এর জন্য ব্রেখট চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। এটি পরিচালনা করেছিলেন এরিক এঙ্গেল (Erich Engel) এবং অভিনয় করেছিলেন কার্ল ভ্যালেন্টিন। প্রস্তাবিত সাফল্য না পেলেও এই ছবিটি সমালোচকদের মন জয় করেছিল। তাই জার্মানির চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছবি হিসেবে এটি জায়গা করে নেয়। এই বছরেই অভিনীত হয়েছিল ব্রেখটের রচিত প্রথম নাটক ‘বাল’। মে মাসে মিউনিখে অভিনীত হয় তাঁর আরও একটি নাটক ‘ইন দ্য জাঙ্গল’। পরিচালনা করেছিলেন এরিক এঙ্গেল।
১৯২৪ সালে ব্রেখট ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার লায়ন ফুটওয়াঙ্গার (Lion Feuchtwanger)-এর সাথে যৌথ সাহিত্য রচনা নিয়ে কাজ করেছিলেন। এইসময় রচিত হয় ‘এডওয়ার্ড ২’, যা ছিল ব্রেখটের অন্যতম জনপ্রিয় কাজ। সেই বছরেই সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যশালা ডয়েচ (Deutsches) থিয়েটারে সহযোগী নাট্যকারের কাজ নিয়ে ব্রেখট বার্লিনে চলে যান।

এই ভূমিকা গ্রহণ করে ব্রেখট অত্যন্ত উৎসাহিত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর নিজের কাজ অনেক কম ছিল। নভেম্বর মাসে এই মঞ্চেই অভিনীত হয়েছিল ব্রেখটের তৃতীয় নাটকের নতুন সংস্করণ ‘জাঙ্গল: ডেক্লাইন অফ আ ফ্যামিলি’। কিন্তু এটি তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। ১৯২৫ সালে তিনি দুটি সিনেমা দেখেছিলেন, যেগুলি তাঁর নাট্যজীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এগুলি হল চার্লি চ্যাপলিনের ‘দ্য গোল্ড রাশ’ এবং আইজেনস্টাইনের ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’। ১৯২৬ সালে ব্রেখটের নামে প্রকাশিত হয় একগুচ্ছ ছোটগল্প, যদিও এগুলি লিখতে অনেকেই তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। সেই বছরই ডয়েচ থিয়েটারে অভিনীত হয় তাঁর নাটক ‘ম্যান ইকুয়ালস ম্যান’। বিগত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অনেক ঘটনার উপর ভিত্তি করে এই নাটকটি লিখেছিলেন তিনি। এরপর মার্ক্সবাদ ও সমাজবাদ নিয়ে তিনি পড়াশোনা শুরু করেন।

১৯২৮ সালে কার্ট ওয়েল (Kurt Weill) ও ক্যাসপার নেহারের সঙ্গে যৌথভাবে ব্রেখট তৈরি করেন তাঁর বিখ্যাত নাটক ‘দ্য থ্রিপেনি অপেরা’। এটিকে গীতিনাট্যও বলা যায়। জন গে রচিত ‘দ্য বেগার’স অপেরা’-র এলিজাবেথ হপম্যান কর্তৃক অনুবাদকে ভিত্তি করে এটি রচিত হয়েছিল। ১৯৩০ সালে কার্ল ওয়েলের কম্পোজিশনে মঞ্চস্থ হয় ব্রেখটের নাটক ‘রাইজ অ্যান্ড ফল অফ দ্য সিটি অফ মহাগনি’। এটি ছিল এটি রাজনৈতিক কৌতুকনাট্য। ১৯৩২ সালে ব্রেখট জার্মান চলচ্চিত্র ‘কুহলে ওয়াম্পে’ (Khule Wampe)-এর জন্য চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। এই চলচ্চিত্রটিতে তৎকালীন সমাজের বেকারত্ব ও বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল।

১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে তিনি ‘লাইফ অফ গ্যালিলিও’ নাটকটি রচনা করেন। কিন্তু ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এটি অভিনীত হয়নি। বিখ্যাত ইতালীয় বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলেই-এর জীবনের অন্তিম দিকের কিছু ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছিল এই নাটক। ১৯৩৯ সালে মার্গারেট স্টেফিনের সাথে ব্রেখট সহ-রচিত ‘মাদার কারেজ এন্ড হার চিলড্রেন’ নাটকটিকে অনেকে বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ নাটক মনে করেন। পরবর্তীতে এই নাটকটি অনেকবার চলচ্চিত্রে রূপায়িত করা হয়েছিল।

১৯৪১ সালে তিনি তাঁর জীবনের একমাত্র হলিউড চলচ্চিত্র ‘হ্যাংম্যান অলসো ডাই!’-এর জন্য চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। ‘দ্য হ্যাংম্যান অফ প্রাগ’ রেনহার্ড হেড্রিক (Reinhard Heydrich)-এর মৃত্যু নিয়ে কাহিনীটি রচিত হয়েছিল।
ব্রেখট এরউইন পিসকেটর (Erwin Piscator) ও ভি মায়ারহল্ড (Vsevolod Mayerhold)-এর গবেষণার উপর ভিত্তি করে ব্রেখট ‘এপিক থিয়েটার’-এর তত্ত্ব প্রকাশ করেন। এই তত্ত্ব বলে যে একটি নাটক দর্শককে তার সামনে চরিত্র বা কর্মের সাথে আবেগগত ভাবে চিহ্নিত করতে পারে না, বরং এর পরিবর্তে যুক্তিসঙ্গত আত্ম-প্রতিফলন এবং সমালোচক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে পারে।
============}}}{{{{{{}}}}}{{{{∆∆∆∆∆¶¶¶¶¶



Friday, 12 August 2022

স্মরণীয় প্রয়াণ দিবস। লেখক কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য। Vol - 825. dt -13.08.2022. ২৬ শ্রাবণ, ১৪২৯. শনিবার। The bolgger in litareture e-magazine


কৃষ্ণ কমল ভট্টাচার্য


মৃত্যু - ১৩ আগষ্ট,১৯৩২ সাল। 



১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন । সে সময়ে সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর । ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা এবং ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে সিনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে বৃত্তিলাভ করেন । ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে এন্ট্রান্স পরীক্ষা শুরু হলে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে এক বছর পড়েন । ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিএ পাস করেন। 

বিএ পাস করার পর তিনি প্রথমে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এরপর বিদ্যালয়সমূহের উপ-পরিদর্শক এবং ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন । এখানে এগারো বছর অধ্যাপনা করবার পর বিএল পাস করেন এবং ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ওকালতি করবার জন্য কলেজ ত্যাগ করেন । ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা 'ঠাকুর আইন অধ্যাপক' নিযুক্ত হন । ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রিপন কলেজে (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) অধ্যক্ষতা করেন । 


কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্যের রচিত গ্রন্থ -

 দুরাকাঙ্ক্ষের বৃথা-ভ্রমণ এবং
 বিচিত্রবীর্য 

তাঁর অপরিণত বয়সের রচনা হলেও তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে । তাঁর পৌল ও ভর্জিনী মূল ফরাসি থেকে অনুবাদ । তিনি সাপ্তাহিক পত্রিকা হিতবাদী র প্রথম সম্পাদক ছিলেন । ভারতী, অবোধবন্ধু এবং পূর্ণিমা পত্রিকায় তাঁর প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল ।  তিনি হিন্দুশাস্ত্র চতুর্থ ভাগ সঙ্কলন করেছিলেন এবং বাচস্পত্যাভিধান সঙ্কলনে তারানাথ তর্কবাচস্পতিকে সাহায্য করেন । তারানাথ তর্কবাচস্পতি তাকে বিদ্যাম্বুধি উপাধি দিয়েছিলেন । 

তাঁর দুরাকাঙ্ক্ষের বৃথা-ভ্রমণ সম্পর্কে সাহিত্যিক অক্ষয়চন্দ্র সরকার বলেছেন :

...ইহাতে কাদম্বরীর আড়ম্বর নাই, বিদ্যাসাগরের সরসতা নাই, অক্ষয়কুমারের প্রগাঢ়তা নাই, প্যারীচাঁদের গ্রাম্য সরসতা নাই, অথচ যেন সকলই আছে । এবং উহাদের ছাড়া আরও যেন কিছু নূতন আছে । ... আমার বিশ্বাস দুরাকাঙ্ক্ষের ভাষা বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষার জননী । 

তিনি সংস্কৃত কাব্যগুলির ছাত্রপাঠ্য সংস্করণ প্রকাশ করে ছাত্রদের সংস্কৃত শিক্ষার পথ সহজ করেছিলেন। তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সদস্য ছিলেন । 

কঁৎ-এর পজিটিভিজম দর্শনে বিশ্বাসী কৃষ্ণকমল ছিলেন নাস্তিক। প্রখ্যাত পণ্ডিত রামকমল ভট্টাচার্য তাঁর অগ্রজ ছিলেন। 

===={{{{{{{{{{{{{{{{{∆∆∆¶¶¶¶}}}}}}}}}}}}======

Thursday, 11 August 2022

স্মরণীয় প্রয়াণ দিবস। ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী। Vol -825. Dt -12.08.2022. ২৬ শ্রাবণ,১৪২৯. শুক্রবার। The blogger in literature e-magazine.

  
 ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী 

১৯৬০ সালের ১২ আগস্ট তিনি মারা যান।


"কাকু আজীবন আমাদের সাহিত্য, সংগীত এবং চিত্রকলা শেখার জন্য উৎসাহ যুগিয়ে গেছেন। তার শেষ জীবনের প্রান্ত ভাগে এসে সেই চিত্রকলাকে প্রাণপণের আঁকড়ে ধরেন নিজস্ব চিন্তাধারা দিয়ে। চিত্রকলার কিছু আদিরূপ অংকনে তিনি আমাদের নিয়োজিত করে গেছেন."


ইন্দিরা দেবী ঠাকুর পরিবারে মেয়েদের মধ্যে ছিলেন প্রথম বিএ পাস করা কন্যা। ১৮৯২ সালে বিএ পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান লাভ করেন তিনি। তার মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘পদ্মাবতী’ পদক লাভ করেন।
ইন্দিরা দেবী পিয়ানো, বেহালা, সেতারবাদন এবং রবীন্দ্রসংগীতে পারদর্শী ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে সুরকার এবং গীতিকার। রবীঠাকুরের ‘স্বরলিপি’ রচনা তার এক অমর কীর্তি। তাছাড়াও ‘কালমৃগয়া’, ‘ভানুসিংহের পদাবলী’, ‘মায়ার খেলা’ প্রভৃতিসহ আরও দুশো রবীন্দ্র সঙ্গীত তিনি রচনা করেছেন। এছাড়াও চাচার বহু স্বরলিপি গ্রন্থের সম্পাদক ছিলেন ইন্দিরা দেবী।

তার দেওয়া সুরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেক সংগীত রচনা করেছেন। নারীদের সংগীতসংঘের মুখপাত্র ‘আনন্দ সংগীত’ পত্রিকার তিনি ছিলেন অন্যতম যুগ্ম সম্পাদিকা। রবী ঠাকুরের মৃত্যুর পর তিনি শান্তিনিকেতনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলে সেখানে নিয়মিত রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষাদান করতেন
১৯৪৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ‘ভুবনমোহিনী’ স্বর্ণপদক, ১৯৫৭ সালে বিশ্বভারতী ‘দেশিকোত্তম’ এবং ডি-লিট ডিগ্রী লাভ করেন এবং ১৯৫৯ সালে রবীন্দ্রভারতী সমিতি প্রথমবারের মতো ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’-এ ভূষিত করে।


মৌলিক রচনা

শ্রুতি স্মৃতি,
রবীন্দ্রসঙ্গীতে ত্রিবেণী সঙ্গম (১৯৫৪)
রবীন্দ্রস্মৃতি (৫ খন্ড, ১৯৫৯)।
তার সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে:-

নারীর উক্তি (১৯২০),
বাংলার স্ত্রী-আচার (১৯৫৬),
স্মৃতিকথা,
পুরাতনী (১৯৫৭)
গীতপঞ্চশতী।

 সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর মেয়ে। ২৯ ডিসেম্বর, ১৮৭৩ সালে ইন্দিরা দেবীর জন্ম তৎকালীন বোম্বাই প্রদেশের কারোয়ারে (বর্তমান কর্ণাটক রাজ্যে)। পৈতৃক নিবাস কলকাতা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। তাঁর মাতা জ্ঞানদানন্দিনীও ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী, বিদুষী ও প্রগতিশীল মহিলা। একমাত্র দাদা সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর চেয়ে দেড় বছরের বড়। ইন্দিরা দেবী ১৮৯৯ সালে তিনি তাঁর স্বনির্বাচিত পাত্র প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন।


১৮৮১ সালে প্রথমে সিমলার অকল্যান্ড হাউজে এবং পরে কলকাতার লরেটো হাউজে পড়াশোনা করেন। ১৮৮৭ সালে তিনি এন্ট্রান্স ও পরে এফএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৮৯২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান লাভ করে তিনি ‘পদ্মাবতী’ স্বর্ণপদকে ভূষিত হন।


বাদ্রিদাস মুকুলের নিকট উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিক্ষা গ্রহণ করেন। কিছুদিন সেতার বাজানও শিখেছিলেন। অনুবাদক হিসেবে ইন্দিরা দেবী অল্পবয়সেই খ্যাতি অর্জন করেন। কৈশোরে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরিচালিত ও মাতা জ্ঞানদানন্দিনী সম্পাদিত বালক পত্রিকায় রাস্কিনের রচনার বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন। পরে ফরাসি শিখে তিনি রেনে গ্রুসের ভারতবর্ষ, পিয়ের লোতির কমল কুমারিকাশ্রম এবং মাদাম লেভির ভারতভ্রমণ কাহিনী অনুবাদ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহু কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধসহ জাপানযাত্রীর ডায়রী-র ইংরেজি অনুবাদও তিনি প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে বামাবোধিনী, বঙ্গলক্ষ্মী, সাধনা, পরিচয়, সবুজপত্র প্রভৃতি পত্রিকায় সঙ্গীত ও সাহিত্যবিষয়ে তার অনেক মৌলিক রচনা প্রকাশিত হয়। বঙ্গনারীর শুভাশুভ বিষয়ে তার মতামত নারীর উক্তি নামক প্রবন্ধটি ছাপানো হয়।


শান্তিনিকেতনে ইন্দিরা দেবী ‘আলাপনী মহিলা সমিতি’ প্রতিষ্ঠা ও তার মুখপত্র ঘরোয়া প্রকাশ করেন। মহিলা কল্যাণে গঠিত ‘বেঙ্গল উইমেন্স এডুকেশন লীগ’, ‘অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্স’, ‘হিরণ্ময়ী বিধবা আশ্রম’ ইত্যাদি সংগঠনের সভানেত্রী ছিলেন তিনি। ১৯৫৬ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বও পালন করেন।
অনুবাদক হিসেবে ইন্দিরা দেবী অল্পবয়সেই খ্যাতি অর্জন করেন। কৈশোরে তিনি রবীন্দ্রনাথ পরিচালিত ও মাতা জ্ঞানদানন্দিনী সম্পাদিত বালক পত্রিকায় রাস্কিনের রচনার বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন। পরে ফরাসি শিখে তিনি রেনে গ্রুসের ভারতবর্ষ, পিয়ের লোতির কমল কুমারিকাশ্রম এবং মাদাম লেভির ভারতভ্রমণ কাহিনী অনুবাদ করেন। রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধসহ জাপানযাত্রীর ডায়রী-র ইংরেজি অনুবাদও তিনি প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে বামাবোধিনী, বঙ্গলক্ষ্মী, সাধনা, পরিচয়, সবুজপত্র প্রভৃতি পত্রিকায় সঙ্গীত ও সাহিত্যবিষয়ে তাঁর অনেক মৌলিক রচনা প্রকাশিত হয়। বঙ্গনারীর শুভাশুভ বিষয়ে তাঁর মতামত ‘নারীর উক্তি’ নামক প্রবন্ধে বিধৃত হয়েছে। ইন্দিরা দেবী রবীন্দ্রসঙ্গীতে এবং পিয়ানো, বেহালা ও সেতারবাদনে পারদর্শিনী ছিলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বরলিপি রচনা তাঁর এক অমর কীর্তি। ‘মায়ার খেলা’, ‘ভানুসিংহের পদাবলী’, ‘কালমৃগয়া’ প্রভৃতিসহ আরও দুশো রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বরলিপি রচনা এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতের বহু স্বরলিপি গ্রন্থ তিনি সম্পাদনা করেন।


রবীন্দ্রনাথ ও ইন্দিরা দেবী

সেই শৈশব থেকেই ইন্দিরা দেবীর সাথে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল এক অটুট বন্ধনে গাঁথা। ভাতিজীকে রবীন্দ্রনাথ কতটা স্নেহ করতেন তা বোঝা যেত ইন্দিরাকে পাঠানো তার চিঠিগুলো দেখলেই!

রবী ঠাকুরের সাহিত্যকর্মের অন্যতম এক শাখা হলো তার পত্র সাহিত্য। প্রায় ২২টি জায়গা থেকে বিভিন্ন সময়ে তিনি এই পত্রগুলো লিখেছিলেন। সবচেয়ে বেশি লিখেছিলেন শিলাইদহ থেকে। আর সবচেয়ে বেশি চিঠি লিখতেন ভাতিজি ইন্দিরাকে। রবীন্দ্রনাথের সেসব চিঠির খণ্ডাংশ নিচে তুলে ধরলে বোঝা যাবে ইন্দিরা দেবীর আসন তার চাচার কাছে কতটা অতুলনীয় ছিল!

তিনি লিখেছিলেন,

‘অনেক কাল বোটের মধ্যে বাস করে হঠাৎ সাজাদপুরের বাড়িতে এসে উত্তীর্ণ হলে বড়ো ভালো লাগে। বড়ো বড়ো জানলা দরজা, চারিদিক থেকে আলো বাতাস আসছে…যেদিকে চেয়ে দেখি সেই দিকেই গাছের সবুজ ডালপালা চোখে পড়ে এবং পাখির ডাক শুনতে পাই।…বিশেষত এখানকার দুপুর বেলাকার মধ্যে একটা নিবিড় মোহ আছে। রৌদ্রের উত্তাপ, নিস্তব্ধতা, নির্জনতা, পাখিদের—বিশেষত কাকের ডাক, এবং সুন্দর সুদীর্ঘ অবসর— সবসুদ্ধ আমাকে উদাস করে দেয়। …কেন জানি নে মনে হয়, এইরকম সোনালি রৌদ্রে ভরা দুপুর বেলা দিয়ে আরব্য উপন্যাস তৈরি হয়েছে।…আমার এই, সাজাদপুরের দুপুর বেলা গল্পের দুপুর বেলা। মনে আছে, ঠিক এই সময়ে এই টেবিলে বসে আপনার মনে ভোর হয়ে পোস্টমাস্টার গল্পটা লিখেছিলুম। ’

এই সকল চিঠিতে উপস্থিত থাকত তার (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের) কল্পনা, ভাবনা, ব্যাকুলতা, আকাঙ্ক্ষা, ধ্যানধারণা, মানুষজন, নদনদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের এক সাবলীল উপস্থাপন।

 জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা শিক্ষা অর্থনীতি বিনোদন লাইফস্টাইল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রবাস মতামত। 

প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে সম্পর্ক

প্রমথ চৌধুরী তখন সবেমাত্র ব্যারিস্টারি পাস করে প্র্যাক্টিস শুরু করেছেন। তার পান্ডিত্য এবং সাহিত্যপ্রীতির কথা জানতে পারেন ঠাকুরবাড়ির লোকেরা। অপরদিকে তার অগ্রজ আশুতোষ চৌধুরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যসঙ্গী। সাহিত্যানুরাগী হওয়ায় পরবর্তীতে প্রমথ চৌধুরীর সাথে রবীন্দ্রনাথের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

   ‌ 



আর এভাবেই তিনি আইনজীবী প্রমথ চৌধুরী থেকে সাহিত্যিক প্রমথ চৌধরীতে পরিণত হলেন। ইন্দিরা দেবী যাকে ১৮৯৯ সালে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। উনিবিংশ শতাব্দীর মতো গোঁড়া একটি সমাজব্যবস্থার মধ্যে থেকেও তিনি (ইন্দিরা দেবী) নিজ পছন্দে বিয়ে করেছিলেন। বিখ্যাত ‘সবুজপত্র’ সাহিত্যপত্রের সম্পাদক এই প্রমথ চৌধুরী ছিলেন তার স্বনির্বাচিত বর, যাকে আমরা রবীন্দ্রনাথের জামাতা বলে চিনি।

রবীন্দ্রনাথ ও ইন্দিরা দেবী

সেই শৈশব থেকেই ইন্দিরা দেবীর সাথে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল এক অটুট বন্ধনে গাঁথা। ভাতিজীকে রবীন্দ্রনাথ কতটা স্নেহ করতেন তা বোঝা যেত ইন্দিরাকে পাঠানো তার চিঠিগুলো দেখলেই!

রবী ঠাকুরের সাহিত্যকর্মের অন্যতম এক শাখা হলো তার পত্র সাহিত্য। প্রায় ২২টি জায়গা থেকে বিভিন্ন সময়ে তিনি এই পত্রগুলো লিখেছিলেন। সবচেয়ে বেশি লিখেছিলেন শিলাইদহ থেকে। আর সবচেয়ে বেশি চিঠি লিখতেন ভাতিজি ইন্দিরাকে। রবীন্দ্রনাথের সেসব চিঠির খণ্ডাংশ নিচে তুলে ধরলে বোঝা যাবে ইন্দিরা দেবীর আসন তার চাচার কাছে কতটা অতুলনীয় ছিল!

তিনি লিখেছিলেন,

‘অনেক কাল বোটের মধ্যে বাস করে হঠাৎ সাজাদপুরের বাড়িতে এসে উত্তীর্ণ হলে বড়ো ভালো লাগে। বড়ো বড়ো জানলা দরজা, চারিদিক থেকে আলো বাতাস আসছে…যেদিকে চেয়ে দেখি সেই দিকেই গাছের সবুজ ডালপালা চোখে পড়ে এবং পাখির ডাক শুনতে পাই।…বিশেষত এখানকার দুপুর বেলাকার মধ্যে একটা নিবিড় মোহ আছে। রৌদ্রের উত্তাপ, নিস্তব্ধতা, নির্জনতা, পাখিদের—বিশেষত কাকের ডাক, এবং সুন্দর সুদীর্ঘ অবসর— সবসুদ্ধ আমাকে উদাস করে দেয়। …কেন জানি নে মনে হয়, এইরকম সোনালি রৌদ্রে ভরা দুপুর বেলা দিয়ে আরব্য উপন্যাস তৈরি হয়েছে।…আমার এই, সাজাদপুরের দুপুর বেলা গল্পের দুপুর বেলা। মনে আছে, ঠিক এই সময়ে এই টেবিলে বসে আপনার মনে ভোর হয়ে পোস্টমাস্টার গল্পটা লিখেছিলুম। ’

এই সকল চিঠিতে উপস্থিত থাকত তার (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের) কল্পনা, ভাবনা, ব্যাকুলতা, আকাঙ্ক্ষা, ধ্যানধারণা, মানুষজন, নদনদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের এক সাবলীল উপস্থাপন।




রবীন্দ্রনাথ ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাকে লিখছেন,

‘তোকে আমি যে-সব চিঠি লিখেছি তাতে আমার মনের সমস্ত বিচিত্র ভাব যে রকম ব্যক্ত হয়েছে এমন আমার আর কোনো লেখায় হয়নি। …তোকে আমি যখন লিখি, তখন আমার এ কথা কখনো মনে উদয় হয় না যে, তুই আমার কোন কথা বুঝবি নে, কিম্বা ভুল বুঝবি, কিম্বা বিশ্বাস করবি নে, কিম্বা যেগুলো আমার পক্ষে গভীরতম সত্য কথা সেগুলোকে তুই কেবলমাত্র সুরচিত কাব্যকথা বলে মনে করবি। সেই জন্যে আমি যেমনটি মনে ভাবি ঠিক সেই রকমটি অনায়াসে বলে যেতে পারি।’

চিন্তা চেতনা, ভাব-আদর্শের দিক থেকে রবিঠাকুরের সাথে তার এতটাই মিল ছিল যে তাকে রবিঠাকুরের ভাবশিষ্যা বলা হতো। রবী ঠাকুর তাকে ভালোও বাসতেন খুব। উপরে বর্ণিত ইন্দিরাকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠির অংশটুকুতে তিনি তার আদরের ভ্রাতুষ্পুত্রীকে নিজের মনের অনুভূতি যেভাবে প্রকাশ করেছেন, তা থেকে উপলব্ধি করা যায় ইন্দিরা দেবী শুধু আদরের ভাতুষ্পুত্রী নয় তার মানসসঙ্গীও ছিলেন।

======[[====={==[[[==={={={{{{{[{{{]]]]]]





Tuesday, 9 August 2022

বিশেষ প্রতিবেদন। ভারত ছাড়ো আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলন : বাংলা সাহিত্য। Vol - 823. Dt -10.08.2022. ২৪ শা শ্রাবণ, ১৪২৯. বুধবার। The blogger in literature e-magazine

ভারত ছাড়ো আন্দোলন ও 

স্বদেশী আন্দোলন :  বাংলা সাহিত্য। 


"বাংলার মাটি বাংলার জল

 বাংলার বায়ু বাংলার ফল 

পূর্ণ হ‌উক পূর্ণ হ‌উক পূর্ণ হ‌উক হে ভগবান। "


১৯৪২ ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে শ্বেতাঙ্গ-বিরোধী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ প্রথম স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপক আন্দোলন (Quit India Movement, 1942)। ক্রিপস মিশন এর অস্পষ্ট প্রস্তাবাবলি- যেমন, যুদ্ধ পরবর্তীকালে ভারতের জন্য ডোমিনিয়ন মর্যাদা প্রদান, প্রাদেশিক আইনসভা ও দেশীয় রাজ্যগুলির দ্বারা সংবিধান প্রণয়ন কমিটি নির্বাচন, প্রদেশগুলির এতে যোগদান করা না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ধারা, যুদ্ধে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের আশু অংশগ্রহণ কিন্তু ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রাখা প্রভৃতি কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারে নি। বরং এ প্রেক্ষিতে বলকান উপদ্বীপের মতো ভারতের ভাগ্য বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দেয়। মালয়, বার্মা ও সিঙ্গাপুর থেকে ব্রিটিশদের কলঙ্কজনক পলায়নের ফলে তাদের অধীনস্থ ভারতীয়দের নিজেদেরকেই আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে হয়। এসব ভারতীয়ের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অবর্ণনীয় দুর্দশাপূর্ণ অবস্থা, ভারতের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত শ্বেতাঙ্গ সৈন্যদের দ্বারা ভারতীয়দের ওপর জাতিগত বিদ্বেষমূলক আচরণ, সকল প্রকারের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে যুদ্ধের কাজে লাগানোর কারণে সম্ভাব্য জাপানি আক্রমণের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের বাংলায় অনুসৃত ‘পোড়ামাটি নীতি’, যুদ্ধকালীন জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি, কালোবাজারী এবং মুনাফাখোরদের দৌরাত্মে সবকিছুই শ্বেতাঙ্গ-বিরোধী উত্তেজনা সৃষ্টি করতে বিশেষ অবদান রাখে। সর্বোপরি, যুদ্ধের শুরু থেকেই ১৯৩২ সালের আদলে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের ব্যাপক কঠোর নীতি গ্রহণ করার প্রয়াস ছিল।


৯ আগস্ট ভোরে কংগ্রেস নেতাদের গ্রেপ্তার দেশব্যাপী এক নজিরবিহীন গণরোষের সৃষ্টি করে, যা বাংলার শহরগুলিতে, বিশেষ করে বড় শহরগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে।


ভারত ছাড় আন্দোলনের প্রধান তিনটি পর্ব দেখা যায়। প্রথম পর্বে এ আন্দোলন প্রধানত শহর অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। এ পর্যায়ে প্রধান শহরগুলিতে হরতাল, ধর্মঘট, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ ছিল লক্ষণীয় বিষয়। এ পর্বের আন্দোলন ছিল খুবই ব্যাপক এবং সহিংস। কিন্তু দ্রুততার সাথেই এ আন্দোলনকে দমন করা হয়।

আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় আগস্টের মধ্যভাগ থেকে। এ পর্যায়ে জঙ্গী ছাত্ররা বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে পড়ে। তারা যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয় এবং একই সঙ্গে উত্তর ও পশ্চিম বিহার, উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চল, বাংলার মেদিনীপুর জেলা এবং মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও উড়িষ্যার বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক বিদ্রোহের নেতৃত্ব গ্রহণ করে। এ সময় বেশ কয়েকটি অঞ্চলে স্বল্প স্থায়ী আঞ্চলিক ‘জাতীয় সরকার’ও গঠিত হয়।


সেপ্টেম্বর মাসের শেষদিকে আন্দোলনের তৃতীয় পর্ব শুরু হয়। এ পর্বের বৈশিষ্ট্য হলো শিক্ষিত যুবক সম্প্রদায় ও কৃষক দলের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা এবং গেরিলা যুদ্ধ। এ সময়ে মেদিনীপুরের তমলুক, মহারাষ্ট্রের সাতারা, উড়িষ্যার তালচের অঞ্চলে এই জাতীয় সরকার কাজ করছিল। তিনটি পর্বের আন্দোলনকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে দমন করা হয়। আন্দোলন দমন করতে সরকার আকাশ থেকে মেশিনগানও ব্যবহার করেছিল।


ভারত ছাড় আন্দোলনের প্রকৃতি সম্পর্কে বেশ মতবিরোধ আছে। এ সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, এটা কি কোন স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব, নাকি একটি সুসংগঠিত বিদ্রোহ। ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির (বোম্বাইর) অধিবেশনে বিখ্যাত ভারত ছাড় আন্দোলনের প্রস্তাব পাস হয় এবং পরপরই যতদূর সম্ভব ব্যাপকভাবে অহিংস পথে গান্ধীর নেতৃত্বে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। প্রস্তাবের সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ একটি অতিরিক্ত ধারা সংযোজিত হয় এবং তা হলো- কংগ্রেস নেতৃত্বকে যদি গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে প্রত্যেক ভারতবাসী যিনি স্বাধীনতা চান এবং তার জন্য সংগ্রাম করেন তিনি নিজেই তার পথপ্রদর্শক হবেন। ১৪ জুলাইর ওয়াদা ওয়ার্কিং কমিটির প্রস্তাবেও সামাজিক র‌্যাডিক্যালিজমের বিশেষ বৈশিষ্ট্যাবলি উল্লিখিত হয়। ২৭ এপ্রিল থেকে ১ মে পর্যন্ত সময়ে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির অধিবেশনে গান্ধীর কড়া নীতিকে একযোগে সমর্থন করেন ডানপন্থী প্যাটেল, রাজেন্দ্র প্রসাদ ও কৃপালনী এবং সমাজতন্ত্রী অচ্যুত পাটওয়াবর্ধন ও নরেন্দ্রদেব। জওহরলাল প্রথমদিকে দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও পরিশেষে গান্ধীর নীতিকেই সমর্থন করেন এবং একমাত্র কমিউনিস্টরাই ভারত ছাড় প্রস্তাবের বিরোধিতা করে।



ভারতের  স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্নি ফুলিঙ্গ- স্বদেশী আন্দোলন। পরাধীন দেশে শাসকের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের সাহিত্য সৃষ্টি মানেই বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া কিংবা রাজদ্রোহির অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া। 

 ফলে লেখককে যে কোনো ধরনের মূল্য দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হতো। ফলে অন্য যে কোনো সাধারণ সময়ের চেয়ে এ সময়ের সাহিত্য যেমন অতীব গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এসব সাহিত্যিকরাও জাতির কাছে চির সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হন।

পরাধীনতার যন্ত্রণার বিষাক্ত ছোবলে নানামাত্রিক সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে, অগ্নিফসলের মতো, যা বুলেটের চেয়েও ভয়ংকর ছিল। বাংলার প্রায় সব প্রধান লেখকই সে অগ্নিকালকে ধারণ করে সাহিত্যে আগুনের ফসল ফলিয়েছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত করেছেন দৃঢ় প্রত্যয়, অপ্রতিরোধ্য জাগরণ। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখাতে সে সত্য প্রতিষ্ঠিত। তবে সে সময়ে আন্দোলনের ধারা একরৈখিক ছিল না।


একদিকে অহিংস বা আপসকামিতা, অন্যদিকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পরাধীনতা থেকে মুক্তির পন্থা সুনির্দিষ্ট। ধারা দুটি স্পষ্ট। সাহিত্য সৃষ্টিতেও তা লক্ষণীয়। কবিতা, নাটক বা প্রবন্ধে অথবা গল্পে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন যেভাবে ব্যাপক প্রভাব রেখেছে, সে তুলনায় উপন্যাস সৃষ্টি হয়েছে তুলনামূলকভাবে কম। তখনকার প্রধান লেখকদের মধ্যে এক্ষেত্রে উদাসীনতা বা নীরবতার ব্যাপারটিও সহজেই অনুমানযোগ্য।


স্বদেশী আন্দোলন মূলত গড়ে উঠেছিল আত্মশক্তির ভিত্তির ওপর নির্ভর করে। এ আন্দোলন ব্রিটিশশাসিত ভারতের প্রথম ব্যাপক জাতীয় আন্দোলন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। সেসময়ের কবি-সাহিত্যিকরাও কলমের মাধ্যমে এ আন্দোলনকে আরও তীব্র এবং গতিশীল করেছিল। ফলে সেসব সৃষ্টি অগ্নিময়তাকে ধারণ করে নির্মিতি পায়। সব দেশেরই যে কোনো ক্রান্তিকাল-দুঃসময়-যুদ্ধ-বিগ্রহ-পরাধীনতার যন্ত্রণা কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়। সেই যন্ত্রণাই তাদের সৃষ্ট সাহিত্য ও শিল্পকর্মে রূপ নেয়।


আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সাহিত্যের ক্ষেত্রে নতুন নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। সাহিত্যে এসেছিল নতুন রূপ ও ভিন্নতর গতি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে স্বদেশী আন্দোলনও সাহিত্যের একটি বিরাট অধ্যায় হয়ে উঠেছিল। অসংখ্য কবিতা-গল্প-নাটক-উপন্যাস-প্রবন্ধ রচিত হয়েছে স্বদেশী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে।


পত্রিকা প্রকাশ হয়েছে এ আন্দোলনকে ধারণ করে। ফলে স্বদেশী আন্দোলন সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি বদলিয়ে নতুন এক অধ্যায় ও ধারা তৈরি করেছিল। স্বদেশী আন্দোলনে প্রবল গতি সৃষ্টি করেছিল বঙ্গভঙ্গ। ব


ঙ্গভঙ্গ বাঙালির জীবনে বিরাট এক আঘাত, যা সাহিত্যিকের চিন্তা-জগতেও বিশাল এক পরিবর্তন ঘটায়। জাতির সংকট তাদের ভাবিত করে। কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরাও অনুধাবন করেন জাতির এ সংকটে বিপ্লব ঘটানো অনিবার্য ও অপরিহার্য। এ ভাবনা থেকেই লেখকরা তাদের সাহিত্যকর্মে বিপ্লবী মনোভাব সৃষ্টি করে সাধারণ যুবকদের চেতনায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন।


তাদের সাহিত্যকর্মে সুনির্দিষ্ট একটা ম্যাসেজ ছিল। সেসময় গতানুগতিক সাহিত্যকর্ম পাঠকের কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। দেশমাতৃকাকে মুক্ত করতে যে সাহিত্য অগ্নিবারুদের মতো কাজ করে, সেই সাহিত্যই তাদের কাছে কাঙ্ক্ষিত ও আদরণীয় হয়ে উঠেছিল। কারণ এটা ছিল সময়ের প্রয়োজন।


এসব সাহিত্য বিপ্লবীদের যেমন অনুপ্রাণিত করেছিল, তেমনি ইতিহাসের স্বাক্ষর হিসেবেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ অগ্নিসময়ে স্বদেশী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাহিত্যকর্ম করেছেন বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অমৃতলাল বসু, রজনীকান্ত সেন, গোবিন্দচন্দ্র রায়, বিজয়চন্দ্র মজুমদার, কার্তিকচন্দ্র দাশগুপ্ত, সতীনাথ ভাদুড়ী, প্রমথনাথ রায় চৌধুরী, গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী এবং সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।


তাদের সাহিত্য সৃষ্টি যুবসমাজের মধ্যে স্বদেশী আন্দোলন সম্পর্কে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল। ফলে যুবসমাজ ব্যাপকভাবে স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। ভারতকে মুক্ত করাই ছিল তাদের একমাত্র প্রতিজ্ঞা।


ভারতমুক্তির জন্য তারা হাসতে হাসতে মৃত্যুর সোপানে জীবন লিখে দিয়েছিল। স্বদেশী আন্দোলন নিয়ে বাংলাসাহিত্যে কালজয়ী বেশকিছু উপন্যাস সৃষ্টি হয়েছে। সেসব উপন্যাস বিপ্লবীর কাছে ‘ধর্মগ্রন্থে’র মতো পবিত্রতা পেয়েছিল।


স্বদেশী আন্দোলনভিত্তিক প্রথম উপন্যাস রচনা করেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ রাজনৈতিক উপন্যাস না হলেও কালের যাত্রায় রাজনৈতিক উপন্যাসের তিলকটিই এ উপন্যাসের কপালে লেগে গেছে। বঙ্কিমচন্দ্র সচেতনভাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পূর্ণাঙ্গ কোনো উপন্যাস রচনা করেননি। উপন্যাসের নাম ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮৪)।


স্বদেশী প্রেক্ষাপটে রচিত বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ একদিকে সাহিত্যিক-চিত্তে যেমন আলোড়ন তৈরি করেছিল, তেমনি বিপ্লবীদের বিপ্লবী-দীক্ষা নিতেও উদ্বুদ্ধ করেছিল। এ উপন্যাসের মাধ্যমেই বঙ্কিমচন্দ্র নিজেকে ‘জাতিসংগঠক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এ উপন্যাসে ব্যবহৃত ‘বন্দেমাতরম্’ গানটি তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।


ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে ১৮৯৬ সালে সর্বপ্রথম ‘বন্দেমাতরম্’ গানটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্থান পায়। এছাড়া ১৯০৫ সালে সংগঠিত স্বদেশী আন্দোলনকে ‘বন্দেমাতরম্’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয় বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’এ ব্যবহৃত গান ‘বন্দেমাতরম্’-এর অনুসারে। দেশকে মা বলে মনে করে স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাসে এ গানটির অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে-বাইরে’, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবি’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘কুহেলিকা’- এ তিনটি উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের স্বদেশী আন্দোলনভিত্তিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষের নানামাত্রিক আন্দোলন ও ইংরেজদের দুঃশাসন সেসময় অনেক লেখকের রক্ত-কালিতে ফণা হয়ে ফুটে উঠেছিল।


রবীন্দ্রনাথের গল্পে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন কখনও কখনও জায়গা করে নিলেও উপন্যাস হিসেবে পাওয়া যায় ‘ঘরে-বাইরে’। স্বদেশী আন্দোলনকে ঘিরে এ উপন্যাস রচিত হলেও রাজনৈতিক পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস হিসেবে এটিকে অভিহিত করা যায় না। কারণ স্বদেশী আন্দোলনের প্রকৃত স্বরূপ এ উপন্যাসে ধরা পড়েনি। সন্দ্বীপের ভেতর দিয়ে স্বদেশী আন্দোলন বরং এখানে বিকৃত রূপ লাভ করেছে।


স্বদেশী আন্দোলনকে ব্যবহার করে নিজে নেতা হয়ে উঠতে চেয়েছেন- যেখানে ব্যক্তিস্বার্থ বড় হয়ে উঠেছে। স্বদেশী আন্দোলনের নেতাদের চরিত্রের সঙ্গে যা কোনোভাবেই যায় না। কারণ তাদের কাছে ব্যক্তিস্বার্থ তো দূরে থাক, নিজের জীবনের চেয়েও দেশের স্বাধীনতালাভ তাদের কাছে বড়। সন্দ্বীপে আমরা তা লক্ষ করি না।


অনুমান করা হয় সন্দ্বীপ চরিত্রটি অরবিন্দর ছায়া অবলম্বনে তৈরি। কিন্তু বাস্তবে অরবিন্দর সঙ্গে সন্দ্বীপের আদর্শিক মিলের পার্থক্য অনেক। যদি সন্দ্বীপ অরবিন্দর ছায়ায় তৈরি ধারণা করি, তাহলে অরবিন্দ এখানে বিকৃত হয়েছে।


বিমলা চরিত্রের ভেতর দিয়েই বোঝা যায় সেসময়ের নারীরা দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য কতটা উদগ্রীব ছিল। দেশের মুক্তির স্বার্থে তারা কতটা নিবেদিত ছিল। নিখিলেশ চরিত্রে উঠে এসেছে সেসময়ের আর এক বাস্তবতা- ব্যবসা বাণিজ্য ও ধীরস্থির আপসকামিতা। অগ্নিযুগের পুরোপুরি রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে ‘ঘরে-বাইরে’ মান্য করা যায় না। 

শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবি’ রাজনৈতিক উপন্যাস। শরৎচন্দ্র নিজেও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু খাঁটি রাজনৈতিক উপন্যাস তিনি একটিই লিখেছেন-‘পথের দাবি’। কিন্তু একটিমাত্র কেন- এ প্রশ্নের উত্তর মেলানো ভারি মুশকিল। ‘পথের দাবি’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সব্যসাচী বাস্তবতা থেকেই গৃহীত হয়েছিল।


স্বদেশী আন্দোলনের বিখ্যাত নেতা এমএন রায়ের চরিত্র অবলম্বনে তিনি সব্যসাচী চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন। এমএন রায় জার্মানি থেকে অস্ত্র-বারুদের সাহায্য নিয়ে সশস্ত্র বিপ্লব ঘটিয়ে ব্রিটিশ বিতাড়িত করে ভারতকে স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন। ‘পথের দাবি’র মূল চরিত্র সব্যসাচী তৈরি হয়েছে এমএন রায়কে কেন্দ্র করে। ‘পথের দাবি’ বিপ্লবীদের কাছে আদর্শগ্রন্থ হিসেবে মর্যাদা পেয়েছিল।


নজরুল অগ্নিযুগের সাহিত্যিকদের মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপুর্ণ। কবিতা লিখে জেল খেটেছেন। অনশন করেছেন। কবিতার মতো তার উপন্যাসেও সেই অগ্নি-বারুদ ফুটে উঠেছিল। সেই সময়কালই ছিল অগ্নি-বারুদের ওপর দাঁড়ানো। নজরুলের ‘কুহেলিকা’ উপন্যাস ‘পথের দাবি’ প্রভাবিত বলেই স্বীকৃত। এ উপন্যাসের প্রমত্ত দা ও বজ্রপাণি মূলত এমএন রায় ও বিপ্লবী বাঘা যতীন চরিত্র অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে।


সতীনাথ ভাদুড়ী’র ‘জাগরী’ (১৯৪৫) উপন্যাসটিও বিপ্লবী-ধারার উপন্যাস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। সতীনাথ ভাদুড়ী একজন সাহিত্যিক হিসেবে যেমন প্রতিষ্ঠিত তেমনি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেও সক্রিয় ছিলেন।


সতীনাথ ভাদুড়ী ‘আগস্ট আন্দোলন’কে কেন্দ্র করে রচনা করেন- ‘জাগরী’। ১৯৪২ সালে ৯ আগস্ট ‘ইংরেজ, ভারত ছাড়’ গান্ধীজির এ অগ্নিগর্ভ উদাত্ত আহ্বানে অসংখ্য মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে এসে আগস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল।


পরিণতিতে তাদের কারাবরণ করতে হয়েছিল। ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছিল। এসব নিয়েই ‘জাগরী’ সৃষ্টি। গঙ্গাচরণ নাগের মতো প্রাজ্ঞ লেখক স্বদেশী আন্দোলন চলাকালীন কলম-যুদ্ধ করেছেন। স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি লিখেছেন ‘রাখী-কঙ্কন’ উপন্যাস। ১৩১৪ বঙ্গাব্দে বরিশাল থেকে গ্রন্থকার কর্তৃক এটি প্রকাশিত হয়।


অবশ্য উপন্যাসটি সম্পূর্ণ নয়, প্রথম খণ্ড মাত্র। তখন বরিশালে থেকে নীরবে নিভৃতে বসে এ ধরনের উপন্যাস লেখা হয়তো সম্ভব ছিল; কিন্তু সেখান থেকেই এটি প্রকাশ করা কতটা অসাধ্যকে সাধন করার মতো ব্যাপার ছিল, তা ভাবাও কঠিন। নিঃসন্দেহে লেখক একটা দুঃসাহসিক কাজ করেছেন।

কারণ সেসময় বরিশালের স্বদেশী-আন্দোলনের সঙ্গে যেসব তরুণ-তরুণী যুক্ত হয়েছিল, স্বদেশদ্রোহী আত্মীয়স্বজনের কাছে তাদের ভয়ংকরভাবে নিগৃহীত হতে হয়েছিল। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ‘রাখী-কঙ্কন’ লেখা হয়েছিল। ফলে বরিশালে উপন্যাসটি প্রকাশ করে পাঠকের কাছে পৌঁছানো ব্যাপারটি সহজসাধ্য ছিল না। এও এক বিপ্লব সাধন করেছিলেন গঙ্গাচরণ নাগ।


নারায়ণচন্দ্র ভট্টাচার্যও স্বদেশী আন্দোলনকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। তার উপন্যাসের নাম ‘নববিধান’। এ উপন্যাসের প্রধান দিক হল উপন্যাসটিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বদেশী আন্দোলন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং ব্রিটিশদের অত্যাচারের জবাব দেয়ার জন্য জনগণের মধ্যে আন্দোলন গড়ে তোলা। সে বিবেচনায় উপন্যাসটি গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময়কালে এ উপন্যাসটি ‘সুলিখিত উপন্যাস’ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিল। তিনি মূলত গল্পকার ছিলেন।


এসব কীর্তিমান লেখক ছাড়া আরও অনেক লেখক অগ্নিযুগ বিশেষ করে স্বদেশী আন্দোলন নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। এসব লেখকও সময়কালে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য রমণীমোহন ঘোষ, রজনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়, গঙ্গাচরণ দাশগুপ্ত, জীবেন্দ্রকুমার দত্ত, ইসমাইল হোসেন সিরাজী প্রমুখ।


এদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। মূলত এদের অধিকাংশই কবিতার মাধ্যমেই স্বদেশী আন্দোলনকে জনগণের মধ্যে চেতনার অগ্নিবারুদ করে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছিলেন। তবে এখানে নজরুলের নামটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।


কারণ নজরুলের মতো করে আর কেউ ব্রিটিশ মসনদ তছনছ করা কবিতা লিখতে পারেননি। কবিতায় তিনিই সবচেয়ে বেশি আগুন জ্বালিয়েছিলেন। ‘আনন্দময়ীর আগমন’ কবিতা লিখে তিনি জেল খেটেছেন। ‘অগ্নিবীণা’ কাব্য বাজেয়াপ্ত হয়েছে।


বিপ্লবী বাঘা যতীনকে নিয়ে লেখা ‘নব-ভারতের হলদিঘাট’ কবিতার জন্য ‘প্রলয়-শিখা’র ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। নজরুল ‘বিদ্রোহী’, ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’, ‘আগমনী’, ‘ধূমকেতু’সহ অসংখ্য বিদ্রোহাত্মক ও প্রতিবাদী কবিতা লিখে ব্রিটিশদের ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। নজরুলকেও এজন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছিল।


অগ্নিযুগে আগুনভরা অসংখ্য গান রচিত হয়েছে। স্বদেশী আন্দোলনকারীদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা গানের সুর ও ছন্দ হয়ে তরুণদের রক্তে আগুন জ্বালিয়েছে।


কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় কাব্যবিশারদ, কামিনীকুমার ভট্টাচার্য, অশ্বিনীকুমার দত্ত, মুকুন্দ দাস, গোবিন্দচন্দ্র দাস, মনোমোহন চক্রবর্তী, প্রমথনাথ দত্ত, বরদাচরণ মিত্র, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, করালী (ছদ্মনাম) এবং রাজকৃষ্ণ রায়ের নাম উল্লেখযোগ্য। স্বদেশী আন্দোলনে এদের রচিত দেশাত্মবোধক গান স্বদেশ প্রেমে বিপ্লবীদের বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল।


সেই প্রবল সংকটকালীন ছয়টি সংগীত সংকলন- রজনীকান্ত পণ্ডিতের ‘স্বদেশী পল্লী-সংগীত’, যোগেন্দ্রনাথ শর্মার ‘স্বদেশী-সংগীত’, যোগেন্দ্রনাথ সরকারের ‘বন্দেমাতরম্’, যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের ‘স্বদেশ-গাথা’, হীরালাল সেনগুপ্তের ‘হুঙ্কার’, ও নলিনীরঞ্জন সরকারের ‘বন্দনা’ প্রকাশিত হয়েছিল। এটি সহজসাধ্য কোনো ব্যাপার ছিল না।


বাংলা নাটকেও স্বদেশী আন্দোলনের প্রভাব সুস্পষ্ট। স্বদেশী আন্দোলন নাট্যকারের চিত্তে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছিল। নাট্যকাররা কল্পনাপ্রসূত নাটক লেখা থেকে সরে এসে ভারতে পরাধীনতার যন্ত্রণা ও স্বদেশী আন্দোলনকে নাটকের উপজীব্য হিসেবে গ্রহণ করেন।


গিরিশচন্দ্র ঘোষের ‘সিরাজদ্দৌলা’, ‘মীরকাসিম’, ‘ছত্রপতি শিবাজী’, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘প্রতাপসিংহ’, ‘দুর্গাদাস’, ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের ‘প্রতাপ-আদিত্য’, ‘পলাশীর প্রায়শ্চিত্ত’, অমরেন্দ্রনাথ দত্তের ‘বঙ্গের অঙ্গচ্ছেদ বা Partition of Bengal’, কুমুদনাথ চট্টোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গের অঙ্গচ্ছেদ যজ্ঞ’-এসব নাটক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গল্পও রচিত হয়েছিল। এক্ষেত্রে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার ‘দেশী ও বিলাতী’ গল্পগ্রন্থের তিনটি গল্পে স্বদেশী আন্দোলনের প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। গল্পগুলো ‘উকিলের বুদ্ধি’, ‘খালাস’ এবং ‘হাতে হাতে ফল’। স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সেই সময়কালে উল্লেযোগ্যভাবে প্রবন্ধ রচিত হয়নি।


এটা খুব স্বাভাবিক যে, আন্দোলনের সময় যে আবেগ আর উত্তেজনা সাধারণ মানুষের মধ্যে কাজ করে, সেসময় চিন্তানিষ্ঠ সাহিত্য পাঠককে খুব বেশি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয় না। ফলে লেখকের আগ্রহও সেদিকে কম থাকে।


তারপরও সেসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সখারাম গণেশ দেউস্কর, ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরী, নিখিলনাথ রায় ও ধীরেন্দ্রনাথ চৌধুরী প্রমুখ স্বদেশী আন্দোলনভিত্তিক প্রবন্ধ রচনা করে প্রায় একরকম অসাধ্যই সাধন করেছিলেন।


অগ্নিযুগে সৃষ্ট সাহিত্য বহুমাত্রিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব সাহিত্য বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত করেছে, দেশপ্রেমে অগ্নিস্পৃহা শক্তি জুগিয়েছে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে। ফলে এসব সাহিত্য শুধু সৃজনশীলতায় বন্দি নয়- ইতিহাসের উজ্জ্বল স্বাক্ষর হিসেবে সেই সময়ের পুরো ছবিটাও বহন করে।

.....ও আমার দেশের মাটি তোমার পায়ে ঠেকাই মাথা. "


==================================

Monday, 8 August 2022

স্মরণীয় প্রয়াণ দিবস। Hermann Karl Hesse- জার্মান নোবেলজয়ী কথাসাহিত্যিক। Vol - 822. Dt - 09.08.2022. ২৩ শ্রাবণ,১৪২৯. মঙ্গলবার। পবিত্র মহরম উৎসব। The blogger in literature e-magazine

Hermann Karl Hesse. 
হেরমান হেস 



 ৯ আগস্ট, ১৯৬২ পরলোকগমন করেন। 

 জার্মানি র একজন কবি এবং চিত্রকর, যিনি পরবর্তিতে সুইজারল্যান্ডীয় নাগরিক হন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত সাহিত্যকর্মগুলির মধ্যে রয়েছে: স্টেপেনউলফ, সিদ্ধার্থ, এবং দ্য গ্লাস বিড গেম (যেটি ম্যাজিস্টার লুডি নামেও পরিচিত)। তিনি ১৯৪৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন


তিনি ১৮৭৭ সালের ২ জুলাই জার্মান সাম্রাজ্যের ভুর্টেমবার্গের কাল্ভের ব্ল্যাক ফরেস্ট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতামহরা ভারতে বেসেল মিশন নামে একটি প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান মিশনারি সমাজের অধীনে একটি মিশনে কাজ করেছিল। তার মাতামহ হেরমান গুন্ডার্ট মালয়ালম ভাষার বর্তমান ব্যাকরণ রচনা করেন, মালয়ালম -ইংরেজি অভিধান সংকলন করে এবং মালয়ালম ভাষায় বাইবেল অনুবাদে অবদান রাখেন। হেসের মা মারি গুন্ডার্ট ১৮৪২ সালে ভারতে এমন একটি মিশনে জন্মগ্রহণ করেন। তার নিজের শৈশব বর্ণনা করে তিনি বলেন, " আমি একজন সুখী শিশু ছিলাম না ...", যা সেই সময়ে মিশনারিদের মধ্যে স্বাভাবিক ছিল, চার বছর বয়সে তার বাবা তাকে ইউরোপে রেখে ভারতে ফিরে আসেন।

হেসের বাবা ইয়োহানেস হেস ছিলেন একজন ডাক্তারের পুত্র। তিনি ১৮৪৭ সালে এস্তোনিয়ান শহরে পায়েডে (উইসেনস্টাইন) জন্মগ্রহণ করেন। ইয়োহানেস হেস রাশিয়ান শাসিত বাল্টিক অঞ্চলে জার্মান সংখ্যালঘু ছিলেন। ফলে তার পুত্র হেরমান জার্মান এবং রুশ উভয় সাম্রাজ্যের নাগরিক হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন।[৪] হেরমানের পাঁচজন ভাইবোন ছিল, কিন্তু তাদের মধ্যে দুজনই শৈশবে মারা গিয়েছিল। ১৮৭৩ সালে, হেসের পরিবার ক্যালভে চলে আসে, যেখানে ইয়োহানেস কাল্ভার ভের্লাগসভেরিনে জন্য কাজ করতেন। ভের্লাগসভেরিন ছিল ধর্মভিত্তিক রচনা এবং স্কুল-বইয়ের প্রকাশনী। মারির বাবা, হেরমান গুন্ডার্ট (এছাড়াও তার নাতির নাম), সেই সময়ে এই প্রকাশনী পরিচালনা করতেন এবং ১৮৯৩ সালে ইয়োহানেস হেস এর উত্তরাধিকারী হন।

শিক্ষাজীবন
১৮৮১ সালে হেসের যখন চার বছর বয়স, তার পরিবার সুইজারল্যান্ডের বাসেলের বাড়িতে ছয় বছর বসবাস করে এবং তারপর আবার কাল্ভে ফিরে আসেন। গ্যোপিঙেনের ল্যাটিন স্কুলে পড়াশুনা করার পর হেসে ১৮৯১ সালে মলব্রোন অ্যাবের ইভাঞ্জেলিকাল থিওলজিকাল সেমিনারিতে ভর্তি হন। জার্মানির সবচেয়ে সুন্দর এবং সুপ্রতিষ্ঠিত স্কুল অ্যাবেতে শিক্ষার্থীরা সপ্তাহব্যাপী ৪১ ঘণ্টা ক্লাস করত। যদিও প্রথম মাসগুলোতে হেসে ভাল করেছিলেন। এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন যে তিনি বিশেষ করে প্রবন্ধ লেখা এবং ধ্রুপদী গ্রীক পদ্যসমূহ জার্মান ভাষায় অনুবাদ করতে পছন্দ করতেন। পরে মলব্রোনে তিনি কিছু সংকট পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যান।[৫] ১৮৯২ সালের মার্চ মাসে হেসে বিপ্লবী হয়ে ওঠেন। তিনি সেমিনারি থেকে পালিয়ে যায় এবং পরের দিন এক খেতে তাকে পাওয়া যায়। হেসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্কুলে যেতে শুরু করেন এবং তার বাবা-মায়ের সাথে তীব্র দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হন। মে মাসে আত্মহত্যার চেষ্টা করার পর তিনি ধর্মতত্ত্ববিদ এবং মন্ত্রী ক্রিস্টফ ফ্রিডরিখ ব্লুমহার্টের অধীনে ব্যাড বোলের একটি প্রতিষ্ঠানে কিছু সময় কাটান। পরে তাকে স্ট্যাটেন আইম রেমস্টাল মানসিক হাসপাতালে এবং তারপর বাসেলের একটি ছেলেদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয়। ১৮৯২ সালের শেষের দিকে তিনি কান্সটাটের (বর্তমান স্টুটগার্টের অংশ) একটি জিমনেসিয়ামে যোগদান করেন। ১৮৯৩ সালে তিনি এক বছরের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং এই পরীক্ষার মাধ্যমে তার স্কুল জীবনের সমাপ্তি ঘটে। একই বছর তিনি তার থেকে বড় সঙ্গীদের সাথে সময় কাটান এবং মধ্যপান ও ধূমপান শুরু করেন। 


সাহিত্যকর্ম
১৯০০ - হেরমান লস্কার
১৯০৬ - বিনিথ দ্য হুইল (দ্য প্রডিজি নামে প্রকাশিত)
১৯১০ - গার্টুড
১৯১৪ - ইন দি ওল্ড সান
১৯১৯ - স্ট্রেঞ্জ নিউজ ফ্রম অ্যানাদার স্টার
১৯১৯ - ডেমিয়ান (এমিল সিনক্লেয়ার ছদ্মনামে প্রকাশিত)
১৯২২ - সিদ্ধার্থ
১৯২৭ - স্টেপেনউলফ
১৯৩২ - জার্নি টু দ্য ওয়েস্ট
১৯৪৩ - দ্য গ্লাস বিড গেম (ম্যাজিস্টার লুডি নামে প্রকাশিত)।


পুরস্কার
১৯০৬ - বুয়ের্নফেল্ড-প্রেইস
১৯২৮ - ভিয়েনার দ্য স্কিলার ফাউন্ডেশনের মাজস্ট্রিক-প্রেইস
১৯৩৬ - গটফ্রিড-কেলার-প্রেইস
১৯৪৬ - গ্যোটে পুরস্কার
১৯৪৬ - সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার
১৯৪৭ - বার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট
১৯৫০ - ভিলহেল্ম রাব সাহিত্য পুরস্কার
১৯৫৪ - পুর লে মেরিত
১৯৫৫ - জার্মান বুক ট্রেডের শান্তি পুরস্কার।








সিদ্ধার্থ নোবেল পুরস্কার বিজয়ী জার্মান লেখক হেরমান হেস এর লেখা অন্যতম জনপ্রিয় একটি উপন্যাস। গৌতম বুদ্ধের সময়ে ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণকারী "সিদ্ধার্থ" নামে এক যুবকের আধ্যাত্বিক অভিযাত্রা এবং দর্শন এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য




হেরমান হেস এর এই নবম উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল জার্মান ভাষায় , খুব সরল অথচ মাধুর্যপূর্ণ ছন্দে । হেরমান হেস ১৯১০ সালে ভারতে কিছুদিন কাটানোর পর, বইটি সর্বপ্রথম প্রকাশ পায় ১৯১২ সালে । বইটি যুক্তরাষ্ট্রে সর্বপ্রথম প্রকাশ পায় ১৯৫২ সালে এবং ৬০ এর দশকে বেশ প্রভাব বিস্তার করে। হেস বইটি উৎসর্গ করেন প্রিয় বন্ধু এবং নবেল পুরস্কার বিজয়ী ফরাসি নাট্যকার রোমেইন রোনাল্ড কে।

বাংলাদেশে বইটি সর্বপ্রথম প্রকাশ করে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, ২০০২ সালে । বইটি অনুবাদ করেন জাফর আলম এবং সম্পাদনা করেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

সিদ্ধার্থ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত সমাস, সিদ্ধ (অর্জন) + অর্থ ( সম্পদ/ জ্ঞান ) = সিদ্ধার্থ (অর্জিত জ্ঞান)। অর্থ্যৎ কোন যাত্রী ( অনুষন্ধিৎসু ব্যক্তি বিশেষ) যিনি তার মোক্ষম লক্ষ্যে পৌছুতে সক্ষম হন। বুদ্ধত্ব লাভের পূর্বে গৌতম বুদ্ধের নাম ছিল রাজপূত্র "সিদ্ধার্থ "গৌতম। তবে এই উপন্যাসের সিদ্ধার্থ এবং গৌতম বুদ্ধ দু'জন ভিন্ন মানুষ।

সিদ্ধার্থ গ্রন্থ সম্পর্কে মার্কিন লেখক হেনরি মিলার বলেছেন : "সাধারণভাবে পরিজ্ঞাত বুদ্ধকে অতিক্রম করে এখানে নতুন এক বুদ্ধ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এ সাফল্য অভাবিতপূর্ব।"


গল্পের পটভূমি গৌতম বুদ্ধ - এর সময়কার প্রাচীন ভারত। ( পঞ্চম - দশম শতাব্দির মধ্যবর্তি সময়ে )গল্পের শুরু হয় ব্রাম্মণপূত্র সিদ্ধার্থ কে দিয়ে যে তার বাল্যবন্ধু এবং ছায়াসঙ্গী গোবিন্দ কে নিয়ে গৃহত্যাগ করে। তারা দুজন অন্তরাত্মার আলোর সন্ধানে যাত্রা শুরু করে। সিদ্ধার্থ বিভিন্ন ঘটনা এবং জীবনের ঘাত প্রতিঘাতের চেতনায় এক পর্যায়ে তার লক্ষ্যে পৌছুবার উপক্রম হয়। চেতনা হল মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া বিভন্ন ঘটনার অভিজ্ঞতার প্রতিফলন - যা কিনা মানুষের উপলব্ধি, শিক্ষা এমনকি জ্ঞানও বটে। উপলব্ধি আসে আত্মসিদ্ধি এবং অন্ত:করণ থেকে। হেসের সিদ্ধার্থ উপন্যাসটিতে মানুষের জীবনে লব্ধ অভিজ্ঞতাকে দেখানো হয়েছে সত্যকে জানার এবং আলোকিত হওয়ার সর্বোৎকৃষ্ট পথ হিসেবে। হেসের সৃষ্ট চরিত্র সিদ্ধার্থ দেখায় যে প্রকৃত জ্ঞান বিদ্যা, ধ্যান কিংবা পার্থিব সুখ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে কন্টক আসনে শায়ন করলেই পাওয়া যায় না, বরং তা আসে জীবনের মুখোমুখি হয়ে সংসার থেকে অভিজ্ঞাত উপলব্ধি দিয়ে।

সুতরাং, বিছিন্ন কিছু ঘটনা দিয়ে জীবনকে আসলে বিচার করা অর্থহীন - সিদ্ধার্থ উপোষ করে কিংবা প্রেম এবং বাণিজ্যের নেশায় নিমগ্ন হয়ে কোনও ভাবেই নির্বাণ লাভ করতে পারে না। যদিও এগুলোর কোনটিই নির্বান লাভের পথে বাধা হয়ে দাড়ায়নি বরং জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনাই সিদ্ধার্থ'র আত্মপলোদ্ধিতে কোনও না কোন ভাবে কাজে এসেছে। ঘটে যাওয়া এই সব ঘটনাগুলোই অভিজ্ঞতার ভান্ডারে যুক্ত হয়েছে। 

=={{{{{{{{{{{{{∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆}}}}}}}}}}====

Sunday, 7 August 2022

মহাপ্রয়াণ দিবস। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। Vol -821. dt -08.08.2022. ২২ শ্রাবণ,১৪২৯. সোমবার। The bolgger in litareture e-magazine.

তুমি রবে নিরবে.....হৃদয়ে মম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।


      যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে 

১৯৪১ সালের ২২শে শ্রাবণ ছিল রাখী পূর্ণিমার দিন। কিন্তু সেই পূর্ণিমার দিনেই, মধ্যাহ্নের একটু পরেই নেমে এসেছিল অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার - অস্তমিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আজ এই বিশেষ দিনটিতে তাঁর শেষ জীবনের কিছু স্মৃতি-

জীবনের শেষ দশ বছরে রবীন্দ্রনাথ পনেরোটি ও বেশি বই লিখেছিলেন। পুনশ্চ (১৯৩২), শেষ সপ্তক (১৯৩৫) ও পত্রপুট (১৯৩৬) নামে গদ্যকবিতা-সংকলনগুলি এই সময়েই প্রকাশিত হয়। জীবনের এই পর্বে রবীন্দ্রনাথ গদ্যগীতিকা ও নৃত্যনাট্য নিয়ে নতুন পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। চিত্রাঙ্গদা (১৯৩৬), শ্যামা (১৯৩৯) ও চণ্ডালিকা (১৯৩৮) নামে প্রসিদ্ধ নৃত্যনাট্যত্রয়ীও এই সময়ই লিখিত হয়। এছাড়া তিনি দুই বোন (১৯৩৩), মালঞ্চ (১৯৩৪) ও চার অধ্যায় (১৯৩৪) নামে তিনটি উপন্যাসও রচনা করেন। জীবনের শেষ পর্বে কবি বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয় তার বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন বিশ্বপরিচয়। এই গ্রন্থে তিনি জীববিদ্যা, পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত নানা তথ্যমূলক প্রবন্ধ রচনা করেন। তার এই সময়কার কবিতাগুলিতেও বৈজ্ঞানিক সূত্রগুলির উপর আধারিত প্রকৃতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়। সে (১৯৩৭), তিনসঙ্গী (১৯৪০) ও গল্পসল্প (১৯৪১) গল্পগ্রন্থগুলিতেও বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী চরিত্রের নানা সমাবেশ লক্ষিত হয়।


ঋজু শালপ্রাংশু দেহের অধিকারী রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন সুস্বাস্থ্য ভোগ করলেও জীবনের শেষ চার বছর দীর্ঘস্থায়ী পীড়ায় কষ্ট পেয়েছিলেন। তার মূল সমস্যা ছিল অর্শ। এই চার বছরে দুবার দীর্ঘসময় অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী থাকতে হয় তাকে। ১৯৩৭ সালে একবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন কবি ; এই সময় কোমায় চলে গিয়ে মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করেন অত্যন্ত কাছ থেকে। আর তখন থেকেই তার এই দীর্ঘকালীন অসুস্থতার সূত্রপাত। ১৯৪০ সালের শেষ দিকে আবার একই ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এবার আর সেরে ওঠেননি। এই সময়কালের মধ্যেই জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু কবিতা রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ। এই কবিতাগুলির মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে মৃত্যুকে ঘিরে লেখা রবীন্দ্রনাথের কিছু অবিস্মরণীয় পঙক্তিমালা।
শান্তিনিকেতন থেকে সে বছরের ১৯শে সেপ্টেম্বর পূত্রবধূ প্রতিমা দেবীর কাছে গিয়েছিলেন দার্জিলিং পাহাড়ের কালিম্পং-এ। সেখানেই ২৬ তারিখ রাতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন কবি। দার্জিলিংয়ের সিভিল সার্জন বলেছিলেন তখনই অপারেশন না করলে কবিকে বাঁচানো যাবে না। প্রতিমা দেবী এবং মৈত্রেয়ী দেবী তখনই অপারেশন না করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন," লিখেছিলেন বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগের অধ্যক্ষ ও সাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায়।

একটু সুস্থ হওয়ার পরে পাহাড় থেকে নামিয়ে কবিকে কলকাতায় আনা হয়। তারপরে তিনি ফিরে যান শান্তিনিকেতনে। অপারেশন করানো হবে কী না, তা নিয়ে যে একটা দোলাচল ছিল।

সারা জীবন চিকিৎসকের কাঁচি থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছেন, এবার বুঝি আর তা সম্ভব নয়। হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি চলছেই। কিন্তু কিছুতে কিছু হচ্ছে না। শান্তিনিকেতনে ছিলেন তখন। এরই মধ্যে অবনীন্দ্রনাথ বেশ কিছু গল্প লিখেছেন। সেগুলো পড়ে দারুণ আনন্দ পেলেন কবি। বললেন, আরও লিখতে। অবন ঠাকুর রানী চন্দকে গল্প বলে যান, রানী চন্দ সে গল্প শুনে লিখে ফেলেন। তারই কিছু আবার দেওয়া হলো রবীন্দ্রনাথকে। তিনি পড়লেন, হাসলেন এবং কাঁদলেন। রানী চন্দ এই প্রথম এমন করে রবিঠাকুরের চোখ থেকে জল পড়তে দেখলেন।
রানী চন্দ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রিয়ভাজন, শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী ও চিত্রশিল্পী এবং রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সচিব অনিল চন্দের স্ত্রী।
চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের কথাই বললেন। রবীন্দ্রনাথের তাতে মত নেই। তিনি বললেন, ‘মানুষকে তো মরতেই হবে একদিন। একভাবে না একভাবে এই শরীরের শেষ হতে হবে তো, তা এমনি করেই হোক না শেষ। মিথ্যে এটাকে কাটাকুটি ছেঁড়াছেঁড়ি করার কি প্রয়োজন?’
কিন্তু যে যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছেন তিনি, তার উপশমের জন্য দেহে অস্ত্রোপচার করতেই হবে—এই হলো চিকিৎসকদের মত। আর সেটা করতে হলে শান্তিনিকেতনকে বিদায় জানিয়ে চলে আসতে হবে কলকাতায়। তাই শেষবারের মতো শান্তিনিকেতন ছাড়লেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ২৫ জুলাই বেলা তিনটা ১৫ মিনিটে রবীন্দ্রনাথ এলেন জোড়াসাঁকোর বাড়িতে।
খবরটা গোপন রাখায় স্টেশনে কিংবা বাড়িতে ভিড় ছিল না। পুরোনো বাড়ির দোতলায় ‘পাথরের ঘর’-এ তিনি উঠলেন। স্ট্রেচারে করে দোতলায় নিতে হলো তাঁকে। ২৬ জুলাই রবিঠাকুর ছিলেন প্রফুল্ল। ৮০ বছরের খুড়ো রবীন্দ্রনাথ আর ৭০ বছর বয়সী ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ অতীত দিনের নানা কথা স্মরণ করলেন। হাসলেন প্রাণখুলে। ২৭ জুলাই সকালে রবীন্দ্রনাথ মুখে মুখে বললেন একটি কবিতা, টুকে নিলেন রানী চন্দ। কবিতাটির প্রথম কয়েকটি পঙ্ক্তি হলো: ‘প্রথম দিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল সত্ত্বার নতুন আবির্ভাবে, কে তুমি, মেলে নি উত্তর।’ ৩০ জুলাই ঠিক হয়েছিল তাঁর দেহে অস্ত্রোপচার হবে। কিন্তু সেটা তাঁকে জানতে দেওয়া হয়নি। তিনি ছেলে রথীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কবে অপারেশন হবে’। রথীন্দ্রনাথ বললেন, ‘কাল-পরশু’। আবার রানী চন্দকে ডাকলেন কবি, লিখতে বললেন: ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি/ বিচিত্র ছলনাজালে/ হে ছলনাময়ী।’ ডা. ললিত এলেন একটু পরে। বললেন, ‘আজকের দিনটা ভালো আছে। আজই সেরে ফেলি, কী বলেন?’ হকচকিয়ে গেলেন কবি। বললেন, ‘আজই!’ তারপর বললেন, ‘তা ভালো। এ রকম হঠাৎ হয়ে যাওয়াই ভালো।’
বেলা ১১টায় স্ট্রেচারে করে অপারেশন-টেবিলে আনা হলো কবিকে। লোকাল অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে অপারেশন করা হচ্ছে। ১১টা ২০ মিনিটের দিকে শেষ হলো অস্ত্রোপচার। ভারী আবহাওয়া উড়িয়ে দেওয়ার জন্য কবি রসিকতা করলেন, ‘খুব মজা, না?’
শরীরে যথেষ্ট যন্ত্রণা হয়েছিল অপারেশনের সময়। কিন্তু তা বুঝতে দেননি কবি। সেদিন ঘুমালেন। পরদিন ৩১ জুলাই যন্ত্রণা বাড়ল। গায়ের তাপ বাড়ছে। নিঃসাড় হয়ে আছেন। ১ আগস্ট কথা বলছেন না কবি। অল্প অল্প পানি আর ফলের রস খাওয়ানো হচ্ছে তাঁকে। চিকিৎসকেরা শঙ্কিত। ২ আগস্ট কিছু খেতে চাইলেন না, কিন্তু বললেন, ‘আহ! আমাকে জ্বালাসনে তোরা।’ তাতেই সবাই খুশি। ৩ আগস্টও শরীরের কোনো উন্নতি নেই। ৪ আগস্ট সকালে চার আউন্সের মতো কফি খেলেন। জ্বর বাড়ল। ৫ আগস্ট ডা. নীলরতন বিধান রায়কে নিয়ে এলেন। রাতে স্যালাইন দেওয়া হলো কবিকে। অক্সিজেন আনিয়ে রাখা হলো। ৬ আগস্ট বাড়িতে উৎসুক মানুষের ভিড়। হিক্কা উঠছিল কবির। পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী ডাকছিলেন, ‘বাবা মশায়!’ একটু সাড়া দিলেন কবি। রাত ১২টার দিকে আরও অবনতি হলো কবির শরীরের। ৭ আগস্ট ছিল ২২ শ্রাবণ। কবিকে সকাল নয়টার দিকে অক্সিজেন দেওয়া হলো। নিশ্বাস ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে থাকল কবির। দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তা একেবারে থেমে গেল।
জনারণ্যে পরিণত হয়েছে তখন ঠাকুরবাড়ি। কবিকে বেনারসি-জোড় পড়ানো হলো। কোঁচানো ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি, চাদর, কপালে চন্দন, গলায় মালা দিয়ে সাজানো হলো। রানী চন্দ কবির বুকের ওপরে রাখা হাতে ধরিয়ে দিলেন পদ্মকোরক। কবি চললেন চিরবিদায়ের পথে।

শ্রাবনবেলায় চির একলা এ প্রান্তরে রবি অস্তমিত হল সেই মূহুর্তে , সকলের অলক্ষ্যেই। কলিকাতার সেই বাইশে শ্রাবন শান্তিনিকেতনের বুকে আছড়ে পড়েছিল শ্রাবনের বারিধারার মত।

নশ্বর দেহের মৃত্যু ঘটতে পারে , কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়না । বাঙালির জীবনের প্রতিটি সুখদুঃখে মনে আর মননে তিনি আছেন চিরকালীন হয়ে !

 ".....দিনান্তবেলায় শেষের
ফসল নিলেম তরী-'পরে,
এ পারে কৃষি হল সারা,
যাব ও পারের ঘাটে॥
হংসবলাকা উড়ে যায়,
দূরের তীরে, তারার আলোয়,
তারি ডানার ধ্বনি বাজে মোর অন্তরে। 
ভাঁটার নদী ধায় সাগর-পানে কলতানে,
ভাবনা মোর ভেসে যায় তারি টানে।
যা-কিছু নিয়ে চলি শেষ সঞ্চয়
সুখ নয় সে, দঃখ সে নয়, নয় সে কামনা--
শুনি শুধু মাঝির গান আর
 দাঁড়ের ধ্বনি তাহার স্বরে...."

সাহিত্যিক ও বিশ্বভারতীর গ্রন্থনবিভাগের অধ্যক্ষ রামকুমার মুখোপাধ্যায় অবশ্য বলছিলেন কবি নিজে এই ভাবে নিজের শেষটা চাননি। "তাঁর ইচ্ছা ছিল কোনও জয়ধ্বনি ছাড়া সাধারণভাবে শান্তিনিকেতনে প্রকৃতির কোলেই তিনি যেন মিশে যেতে পারেন। তাঁর শেষ ইচ্ছাটা আর রাখা যায়নি।"

আরও একটা বাইশে শ্রাবণ এসে গেল। ভেজা মাটিতে শিকড় ছুঁয়ে কচি পাতা সূর্যের আলো স্পর্শ করল।


১৯৩০ সালের ২৫ অক্টোবর ইন্দিরাদেবীকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘‘আমার শ্রাদ্ধ যেন ছাতিম গাছের তলায় বিনা আঢ়ম্বরে বিনা জনতায় হয় – শান্তিনিকেতনের শালবনের মধ্যে আমার স্মরণের সভা মর্ম্মরিত হবে, মঞ্জরিত হবে, যেখানে যেখানে আমার ভালোবাসা আছে, সেই সেইখানেই আমার নাম থাকবে।’’
কবিরই দেওয়া নাম "আকাশবাণী"। রেডিও সে দিন শান্তিনিকেতনকে জানিয়েছিল কবির চলে যাওয়া। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কবির মৃত্যু ও নিমতলায় দেহ সৎকারের ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনের পশ্চিম তোরণের কাছে একটি ভবনে রেডিও ছিল। সে দিন যেন বিশ্বাস করতে পারেনি শান্তিনিকেতন আকাশবাণীর দেওয়া সেই সংবাদ। কিন্তু কবির শেষ ইচ্ছে পূরণ করেছিল শান্তিনিকেতন। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, শান্তিদেব ঘোষ-সহ অনেকে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে পাঠভবন গ্রন্থাগার থেকে উপাসনা মন্দির পর্যন্ত ‘সমুখে শান্তি পারাবার-ভাসাও তরণী হে কর্ণধার।’ --গানটি সমবেত কন্ঠে গাইতে গাইতে গিয়েছিলেন। অথচ এই গানটা গাওয়ার কথা ছিল 'ডাকঘর' নাটকের একটি বিশেষ প্রযোজনায়। ফকিরের চরিত্রে অভিনয়ের কথা ছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। কিন্তু সেই প্রযোজনা শেষ পর্যন্ত মঞ্চস্থ হয়নি। অমলের মৃত্যুর পরে এই গান গাওয়া হবে বলে ঠিক করেও কবিই নাকচ করে দিলেন। সে দিন তাঁরই চাওয়া ছিল, এ গান যেন তাঁর স্মরণসভায় গাওয়া হয়। সে দিন বিশেষ উপাসনা মন্দির পরিচালনা করেছিলেন আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন। সেখানেও এই গানটিই গাওয়া হয়। শালবীথিতে মৃত্যুর ইচ্ছে পূরণ না হলেও দিন কয়েকের মধ্যেই কবির স্নেহধন্য শিল্পী সুরেন্দ্রনাথ কর পিতলের কলসিতে করে চিতাভস্ম নিয়ে শান্তিনিকেতনে আসেন। যা এখনও রবীন্দ্রভবনে সযত্নে সংরক্ষিত।
কবি চলে যাওয়ার দশ দিন পরেই ৩২ শ্রাবণ রবিবার, ইংরেজির ১৭ অগস্ট, ১৯৪১ সালে সকাল ৬.৩০ মিনিটে রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ছাতিমতলায় ক্ষিতিমোহন সেন ও বিধুশেখর শাস্ত্রী আদি ব্রাহ্মসমাজ মতে শ্রাদ্ধবাসর পৌরহিত্য করেন। শ্রাদ্ধবাসরে কঠোপনিষদ থেকে যম ও নচিকেতার অংশটি পাঠ করেন মহামহোপাধ্যায় বিধুশেখর শাস্ত্রী। পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পাদন করেন রথীন্দ্রনাথ ও সুবীরেন্দ্রনাথ ঠাকুর। উপস্থিত সকলকে কবিগুরুর শেষ বয়সের ছবি, শেষ কবিতা ও সমুখে শান্তি পারাবার গানটি মুদ্রিত হরফে দেওয়া হয়। এর পরে বিশ্বভারতীর তরফ থেকে দরিদ্রদের অন্ন ও বস্ত্র বিতরণ করা হয়।

শুভ জন্মদিন শ্রদ্ধাঞ্জলি। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ।‌ একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ। Dt -26.11.2024. Vol -1059. Tuesday. The blogger post in literary e magazine.

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়   (২৬ নভেম্বর ১৮৯০ — ২৯ মে ১৯৭৭)  একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ.  মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্...