Sunday, 7 November 2021

জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। আলবেয়ার ক্যামু। ০৭.১১.২১. Vol -549. The blogger in literature e-magazine.

আলবের কাম্যু 


১৯১৩ সালের ৭ই নভেম্বর ফরাসী আলজেরিয়ার (বর্তমান ড্রিয়ান) মন্ডোভিতে এক শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিবেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মা, ক্যাথারিন হেলেন কাম্যু জাতিতে ছিলেন একজন ফরাসী; যদিও পৈতৃক সূত্রে তিনি স্প্যানিশ-বালেয়ারিক। তাঁর বাবা, লুসিয়েন কাম্যু, ছিলেন একজন দরিদ্র কৃষিজীবী; ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্নের যুদ্ধে তিনি মারা যান। কাম্যু তাঁর বাবাকে কোনোদিনও দেখেননি। তাঁর ছোটবেলায় কাম্যু, তাঁর মা এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনরা অনেক ন্যুনতম উপকরণ ছাড়াই আলজিয়ারের বেলকোর্ট অঞ্চলে জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। তিনি আলজেরিয়ার দ্বিতীয় প্রজন্মের ফরাসি ছিলেন; আলজেরিয়া ১৮৩০ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ফরাসিদের দখলে ছিল। তাঁর ঠাকুরদাদা এবং তাঁর প্রজন্মের অনেকেই ১৯শ শতকের প্রথম দশকের সময় ভালোভাবে জীবন কাটাবার জন্য আলজেরিয়াতে চলে আসেন। তাই তাঁকে বলা হত পাইড-নোয়া, ‘কালো পায়ের পাতা’ – এটা একটা ইতর শব্দ যা দ্বারা সেইসকল ফরাসিদের বোঝানো হত যারা আলজেরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিল – আর তাঁর পরিচয় এবং দরিদ্র অবস্থা তাঁর পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। তৎসত্ত্বেও, কাম্যু ছিলেন একজন ফরাসি নাগরিক, আলজেরিয়ার আরব বা বর্বর অধিবাসীদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা যাদের আইনগত অবস্থানটাই নীচু ছিল। ছোটবেলায়, কাম্যুর ফুটবল এবং সাঁতারের প্রতি অনুরাগ ছিল।
তাঁর শিক্ষক লুই জার্মেইনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কাম্যু ১৯২৪ সালে বৃত্তি লাভ করেন এবং আলজিয়ার্সের কাছে একটি প্রথিতযশা লাইসিয়ামে (উচ্চশিক্ষার স্কুল) পড়াশুনো শুরু করেন।১৯৩০ সালে তাঁর যক্ষ্মারোগ ধরা পড়ে।রোগটি সংক্রামক হওয়ার কারণে তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন এবং তাঁর কাকা গুস্তাভ আকল্টের কাছে তিনি বাস করেন। কাকা পেশায় ছিলেন একজন কসাই; তরুণ আলবের কাম্যুকে তিনি প্রভাবিত করেছিলেন। এই সময় কাম্যু তাঁর দর্শনের শিক্ষক জ্যঁ গ্রেনিয়ারের সংস্রবে এসে দর্শনের দিকে আকৃষ্ট হন। তিনি প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক এবং ফ্রেডারিক নিটশের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।এই সময় তিনি পড়াশুনোর জন্য কেবলমাত্র কিছু সময় ব্যয় করতে পারতেন। অর্থ রোজগারের জন্য, তিনি নানা ধরনের পেশা অবলম্বন করেন; ব্যক্তিগত শিক্ষক, গাড়ির সরঞ্জামের করণিক, এবং আবহাওয়া সংস্থার সহকারী হিসেবেও তিনি কাজ করেছিলেন।

১৯৩৩ সালে কাম্যু আলজিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৩৬ সালে তাঁর লাইসেন্স ডি ফিলোসফি (বি.এ) ডিগ্রী লাভ করেন; প্লোটিনাসের ওপর তত্ত্ব রচনা করে। খ্রীষ্টান দার্শনিকদের প্রতি কাম্যুর একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু নিটশে এবং আর্থার শোপেনহাওয়ারের প্রভাবে তিনি নৈরাশ্যবাদ এবং নাস্তিকতার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। তিনি স্তাঁদাল, হেরম্যান মেলভিল, ফিওডোর দস্তয়েভস্কি, এবং ফ্রান্ৎস কাফকা প্রভৃতি ঔপন্যাসিক-দার্শনিকের লেখা পাঠ করেন। ১৯৩৩ সালে, সিমোন হাইয়ের সঙ্গে পরিচিত হন যিনি কাম্যুর এক বন্ধুর সঙ্গী ছিলেন; পরে সিমোন কাম্যুর প্রথম স্ত্রী হন।
১৯২৮ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত কাম্যু রেসিং ইউনিভার্সেটেয়ার ডি’আলজেরের গোলরক্ষক ছিলেন।খেলার টিম-স্পিরিট, ভ্রাতৃত্ববোধ, এবং উদ্দেশ্যগত ঐক্যবোধ কাম্যুকে অত্যন্ত নাড়া দিয়েছিল। খেলার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গভীর আবেগ এবং সাহসিকতার সাথে খেলার জন্য তিনি প্রায়ই প্রশংসিত হতেন। ১৭ বছর বয়সে যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হওয়ার পরে তাঁর ফুটবলের প্রতি সমস্ত আশাই অন্তর্হিত হয়.কাম্যু ফুটবল, মানব-অস্তিত্ব, নৈতিকতা এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের মধ্যে সমান্তরাল সম্পর্ক এঁকেছেন। তাঁর কাছে, ফুটবলের সরল নৈতিকতা এবং গীর্জা ও রাষ্ট্রের মত কর্তৃপক্ষের দ্বারা আরোপিত জটিল নৈতিকতার মধ্যে একটা বিরোধ বর্তমান।


১৯৩৪ সালে ২০ বছর বয়সে কাম্যু সিমোন হাইয়ের সাথে সম্পর্কে আবদ্ধ হন। সিমোন মরফিনে আসক্ত ছিলেন; ঋতুকালীন বেদনা প্রশমনের জন্য সিমোন এই ড্রাগ ব্যবহার করতেন। কাকা গুস্তাভ এই সম্পর্ক মেনে না নিলেও আসক্তি থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করার জন্য কাম্যু হাইকে বিয়ে করেন। এরপরেই তিনি আবিষ্কার করেন সিমোন ইতিমধ্যেই তাঁর ডাক্তারের সাথে সম্পর্কে আবদ্ধ এবং এর ফলে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। কাম্যু সারাজীবন ধরে একজন নারীলোলুপ ছিলেন।

১৯৩৫ সালের প্রথম দিকেই কাম্যু ফরাসী কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। যদিও তিনি মার্ক্সবাদী ছিলেন না, তবুও তিনি একে “আলজেরিয়ার ‘অধিবাসী’দের সাথে ইউরোপিয়দের বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের” একটা পথ হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমরা সাম্যবাদকে একটা স্প্রিংবোর্ড এবং নান্দনিকবাদ হিসেবে দেখতে পারি যা গভীরতর আধ্যাত্মিক ক্রিয়াকলাপের ভিত্তি প্রস্তুত করতে পারে।” পরের বছর কাম্যু উক্ত পার্টি ত্যাগ করেন। ১৯৩৬ সালে স্বাধীনতাকামী আলজেরিয় কমিউনিস্ট পার্টি (পি.সি.এ) প্রতিষ্ঠা হয়, এবং কাম্যু তাঁর পরামর্শদাতা গ্রেনিয়ারের কথায় সেই পার্টিতে যোগদান করেন। পিসিএতে কাম্যুর মুখ্য ভূমিকা ছিল থিয়েটার ডু ট্রাভাইল (শ্রমিকদের থিয়েটার) পরিচালনা করা। কাম্যু পার্টি ডু পিউপল আলজেরিয়ান (আলজেরিয়ান পিপলস পার্টি (পিপিএ)) পার্টির সাথেও ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন; এই পার্টি ছিল একটা মধ্যপন্থী ঔপনিবেশিক/জাতীয়তাদী-বিরোধী দল। যুদ্ধমধ্যবর্তীকালীন, উদ্বেগ যতই বাড়তে লাগল, স্ট্যালিনপন্থী পিসিএ এবং পিপিএ তাদের যোগসূত্র ছিন্ন করে। পার্টির কথামতো না চলার জন্য কাম্যুকে পিসিএ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এইসকল ঘটনাগুলোর ফলে মানুষের মর্যাদাবোধ সম্বন্ধে কাম্যুর ধারণাগুলো আরো পরিশীলিত হয়। আমলাতন্ত্রের ওপর কাম্যুর অবিশ্বাস বেড়েই চলে; কারণ আমলাতন্ত্রের মূল লক্ষ্য ছিল বিচার নয়, দক্ষতা। তবে তিনি তাঁর থিয়েটারে কাজ বজায় রেখে যান এবং তাঁর দলের নতুন নামকরণ করেন থিয়েটার ডি ল’ইক্যুইপ (“দলের থিয়েটার”)। তাঁর পরবর্তীকালের লেখা উপন্যাসের অবলম্বনেই তিনি তাঁর কিছু নাটক রচনা করেন।

জ্যঁর এবং চক্র অনুসারে কাম্যুর সাহিত্যকর্ম, ম্যাথিউ শার্পের মতানুযায়ী
বছর পৌত্তলিক বিশ্বাস বাইবেল প্রসঙ্গ উপন্যাস নাটক
১৯৩৭-৪২ সিসিফাস বিচ্ছিন্নতা, নির্বাসন অপরিচিত (The Stranger) ক্যালিগুলা,
দি মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং (লে মালেনটেন্ডু)

১৯৪৩-৫২ প্রমেথিউস বিদ্রোহ দি প্লেগ (লা পেস্টে) দি স্টেজ অফ সিজ (ল'এটাট ডি সিজ)
দ্য জাস্ট (লেস জাস্টেস)

১৯৫২-৫৮ অপরাধ, পতন; নির্বাসন এবং রাজত্ব;
জন দি ব্যাপটিস্ট, খ্রিস্ট

দি ফল (লা চ্যুট) পজেজড (দস্তয়েভস্কি) পুনর্নিমাণ;
ফকনারের রিক্যুয়েম ফর আ নান

১৯৫৮– নেমেসিস রাজত্ব দি ফার্স্ট ম্যান (লে প্রিমিয়ের হোম্মে) 


১৯৩৮ সালে কাম্যু বামপন্থী সংবাদপত্র আলজের রিপাবলিকেইনের (পাস্ক্যাল পিয়া কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত) হয়ে কাজ করেন; কারণ তাঁর প্রভূত পরিমাণে ফ্যাসিবিরোধী মনোভাব ছিল, এবং ফ্যাসিবাদী সরকারের উত্থান তাঁকে চিন্তিত করেছিল। এইসময়, কাম্যু কর্তৃত্বপূর্ণ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন, কারণ তিনি ফরাসি শাসকদের দ্বারা আরব এবং বর্বরদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের সাক্ষী ছিলেন। আলজের রিপাবলিকেইনকে ১৯৪০ সালে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং কাম্যু প্যারিসে পালিয়ে গিয়ে প্যারিস-সয়রের প্রধান সম্পাদকের কাজে নিযুক্ত হন। প্যারিসে এসে তিনি অলীক এবং অর্থশূন্যতা নিয়ে তাঁর কাজের ‘প্রথম চক্র’ প্রায় শেষ করেন – উপন্যাস ল’ইট্রেঞ্জার (দি আউটসাইডার (ইউকে), অথবা দি স্ট্রেঞ্জার (ইউএস)), লে মিথ ডি সিসিফি (দি মিথ অফ সিসিফাস) নামক দার্শনিক প্রবন্ধ এবং নাটক দি ক্যালিগুলা। প্রতিটি চক্রেই একটি উপন্যাস, একটি প্রবন্ধ ও একটি নাটক রয়েছে।

উপন্যাস 
আ হ্যাপি ডেথ (লা মর্ট হেউরেউস) (১৯৩৬-৩৮এ লিখিত, ১৯৭১সালে প্রকাশিত)
দি স্ট্রেঞ্জার (ল’এট্রেঞ্জার, দি আউটসাইডার হিসেবেও অনুদিত। “ল’এট্রেঞ্জারের বিকল্প অর্থ হল বিদেশী) (১৯৪২)
দি প্লেগ (লা পেস্টে) (১৯৪৭)
দি ফল (লা চ্যুট) (১৯৫৬)
দি ফার্স্ট ম্যান (লে প্রিমিয়ার হোম্মে) (অসমাপ্ত, ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত)
ছোটগল্প 
এক্সাইল অ্যান্ড দি কিংডম (ল’এক্সিল এট লে রয়মে) (সংকলন, ১৯৫৭), নিম্নলিখিত ছোটগল্পগুলো এর মধ্যে আছেঃ
“দি অ্যাডালটারাস ওম্যান” (লা ফেম্মে অ্যাডালটিয়ার)
“দি রেনেগেড অর অ্যা কনফিউজড স্পিরিট” (লে রেনিগাট ওয়ু আন এস্প্রিট কনফুস)
“দি সাইলেন্ট মেন” (লেস ম্যুয়েটস্‌)
“দি গেস্ট” (ল’হোটে)
“জোনাস, অর দি আর্টিস্ট অ্যাট ওয়ার্ক” (জোনাস, ওয়ু ল’আরটিস্টে আউ ট্রাভাইল)
“দি গ্রোয়িং স্টোন” (লা পিয়ের ক্যুই পৌসসে)
গবেষণামূলক প্রবন্ধ সম্পাদনা
ক্রিশ্চিয়ান মেটাফিজিক্স অ্যান্ড নিওপ্লেটোনিজম (মেটাফিজিক ক্রেটিয়েন্নে এট নিওপ্লেটোনিসমে) (১৯৩৫) – এই প্রবন্ধ লিখেই কাম্যু ফ্রান্সের উচ্চতর স্কুলে পড়াবার সুযোগ পেয়েছিলেন
নন-ফিকশন বই সম্পাদনা
বেটুয়েক্সট অ্যান্ড বিট্যুইন (ল’এনভারস এট ল’এন্ড্রয়েট, দি রং সাইড অ্যান্ড দি রাইট সাইড নামেও অনুদিত) (সংকলন, ১৯৩৭)
ন্যুপশিয়ালস (নোসেস) (১৯৩৮)
দি মিথ অফ সিসিফাস (লে মিথ ডি সিসিফি) (১৯৪২)
দি রেবেল (ল’হোম্মে রিভোল্টে) (১৯৫১)
আলজেরিয়ান ক্রনিকল্‌স্‌ (ক্রনিক্যুইস আলজেরিয়ানেস্‌) (১৯৫৮, এর প্রথম ইংরেজি অনুবাদটি প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে)
নোটবুকস্‌ ১৯৩৫ – ১৯৪২ (কার্নেটস্‌, মাই ১৯৩৫ – ফেব্রিয়ার ১৯৪২) (১৯৬২)
নোটবুকস ১৯৪২ – ১৯৫১ (কার্নেটস II : জানভিয়ের ১৯৪২ – মার্স ১৯৫১) (১৯৬৫)
আমেরিকান জার্নালস (জার্নক্স ডি ভয়েজ) (১৯৭৮)
নোটবুকস ১৯৫১ – ১৯৫৯ (২০০৮)। কার্নেটস টোম III: মার্স ১৯৫১ – ডিসেম্বর ১৯৫৯ (১৯৮৯) হিসেবে প্রকাশিত
করেসপণ্ডেস (১৯৪৪ – ১৯৫৯)। কাম্যুর কন্যা ক্যাথারিন কাম্যুর ভূমিকাসহ আলবের কাম্যু এবং মারিয়া কাসারেসের মধ্যেকার বার্তালাপ (২০১৭)।
নাটক 
ক্যালিগুলা (১৯৪৫ সালে অনুষ্ঠিত, ১৯৩৮ সালে রচিত)
দি মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং (লে মালেন্টেন্ডু) (১৯৪৪)
দি স্টেট অফ সিজ (ল’এটাট ডি সিজ্‌) (১৯৪৮)
দি জাস্ট অ্যাসাসিনস (লেস জাস্টেস) (১৯৪৯)
রিক্যুয়েম ফর আ নান (রিক্যুয়েম পোর উনে নোন, একই নামে রচিত উইলিয়ামফকনারের উপন্যাস অবলম্বনে রচিত) (১৯৫৬)
দি পজেজড্‌ (লেস পজিডিস, ফিওডোর দস্তয়েভস্কির উপন্যাস ডেমনস্‌ অবলম্বনে রচিত)
প্রবন্ধ সম্পাদনা
দি ক্রাইসিস অফ ম্যান (কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া ভাষণ) (২৮শে মার্চ, ১৯৪৬)
নাইদার ভিক্টিমস্‌ নর এক্সেকিউশনারস্‌ (কোঁবা পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধাবলী) (১৯৪৬)
হোয়াই স্পেন? (ল’এটাট ডি সিজ নাটকটির জন্য লিখিত প্রবন্ধ) (১৯৪৮)
সামার (ল’এটে) (১৯৫৪)
রিফ্লেকশন্স অন দি গিলোটিন (রিফ্লেকশন্স সুর লা গিলোটিন) (বিবর্ধিত প্রবন্ধ, ১৯৫৭)
ক্রিয়েট ডেঞ্জারাসলি (বাস্তববাদ এবং শৈল্পিক সৃষ্টির ওপর রচিত প্রবন্ধ, সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত ভাষণ) (১৯৫৭)


কাম্যুর প্যারিসে যাওয়ার পরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ায় ফ্রান্সের ক্ষতি হতে শুরু হল। কাম্যু সৈন্যবিভাগে স্বেচ্ছায় যোগদানের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত থাকায় তাঁকে বাতিল করা হয়। জার্মান সৈন্যবাহিনী প্যারিসের দিকে এগোতে থাকলে কাম্যু প্যারিস ত্যাগ করেন। প্যারিস-সয়রের চাকরি থেকে তাঁকে বরখাস্ত করা হয় এবং শেষমেশ লিওঁতে আশ্রয় নেন। সেখানে ১৯৪০ সালের ৩রা ডিসেম্বর তিনি পিয়ানোবাদক এবং গণিতবিদ ফ্রান্সিন ফ’রের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। কাম্যু ও ফ’রে এরপর আলজেরিয়ায় (ওরান) ফিরে যান এবং সেখানকার প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন।যক্ষ্মারোগের কারণে, ডাক্তারি পরামর্শে তাঁকে আবার ফ্রান্সের আল্পসে ফিরে যেতে হয়। সেখানে তিনি তাঁর লেখালিখি শুরু করেন এবং তাঁর কাজের দ্বিতীয় চক্র শুরু হয়। এই কাজগুলো ছিল বিদ্রোহ সংক্রান্ত – একটা উপন্যাস লা পেস্টে (দি প্লেগ) এবং একটি নাটক লা মালেটেন্ডু (দি মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং)। ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি তাঁর পূর্বেকার কাজের জন্যই পরিচিত ছিলেন। এরপর তিনি প্যারিসে চলে যান এবং জ্যঁ পল সার্ত্রের সঙ্গে তাঁর পরিচিত এবং বন্ধুত্বের সূত্রপাত হয়। এছাড়া তিনি সিমোন ডি বোভেয়ার, আঁদ্রে ব্রেটনসহ অন্যান্যদের নিয়ে গঠিত বুদ্ধিজীবী মহলেও অংশ নেন। এদের মধ্যে ছিলেন মারিয়া কাসারেস, যাঁর সাথে পরে কাম্যুর প্রণয়সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

ফ্রেঞ্চ অকুপেশনের সময়ে (ফ্রান্স দখল) জার্মানদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গুপ্ত প্রতিরোধ আন্দোলনে কাম্যু সক্রিয় ভূমিকা নেন। প্যারিসে এসে তিনি নিষিদ্ধ সংবাদপত্র কোঁবার সাংবাদিক হন এবং সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। ফ্রান্স মুক্ত হবার পরেও তিনি এই পত্রিকার জন্য লেখালিখি করতেন। কোঁবার নিবন্ধ লেখার জন্য কাম্যু ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন এবং গ্রেপ্তার হওয়ার থেকে বাঁচতে তিনি জাল পরিচয় পত্র ব্যবহার করতেন। এইসময়ে তিনি চারটে লেটার’স্‌ অউন এমি এলেমান্ড (লেটারস্‌ টু আ জার্মান ফ্রেন্ড) লিখেছিলেন যাতে তিনি এই প্রতিরোধের কী প্রয়োজন আছে তা ব্যাখ্যা করেছিলেন।
যুদ্ধের পরে কাম্যু ফ’রের সঙ্গে প্যারিসে বাস করতে লাগলেন; ১৯৪৫ সালে জ্যঁ এবং ক্যাথারিন নামে তাঁদের দুটি যমজ কন্যা হয়।কাম্যু এইসময় একজন খ্যাতনামা লেখক হয়ে ওঠেন; তাঁর খ্যাতির মুখ্য কারণ ছিল প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। দুটি পৃথক ভ্রমণে তিনি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দেন। তিনি আরো একবার আলজেরিয়াতে ভ্রমণ করেন; কিন্তু সেখানকার অত্যাচারী ঔপনিবেশিক নীতি দেখে তিনি হতাশ হন; তিনি এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে বহুবার সোচ্চার হয়েছিলেন। এই সময় প্রবন্ধ ল’হোম্মি রিভোল্টি (দি রেবেল) লেখার মধ্যে দিয়ে তাঁর সাহিত্যকর্মের দ্বিতীয় চক্র সম্পূর্ণ হয়। এই বইয়ে কাম্যু সর্বগ্রাসী সাম্যবাদকে আক্রমণ করেন এবং স্বাধীনতাপন্থী সমাজতন্ত্র ও ট্রেড ইউনিয়নভিত্তিক নৈরাষ্ট্রবাদের পক্ষে সোচ্চার হন।]কমিউনিজমকে বাতিল করার জন্য তিনি তাঁর অনেক ফরাসি সহকর্মী ও সমসাময়িকদের বিরাগভাজন হন এবং এই বইটির কারণে তাঁর সার্ত্রের সঙ্গে চিরবিচ্ছেদ হয়। আলজেরিয় যুদ্ধের সময় থেকে মার্ক্সবাদী বামপন্থীদের সাথে তাঁর সম্পর্কের আরো অবনতি হয়.

কাম্যু বিভিন্ন প্রান্তিক সংস্থার ইউরোপীয় সংহতির জোরালো সমর্থক ছিলেন।১৯৪৪ সালে তিনি কমিটি ফ্রান্সিস পোর লা ফেডেরেশন ইউরোপিন্নে – (সিএফএফই (ফ্রেঞ্চ কমিটি ফর দি ইউরোপিয়ান ফেডেরেশন)) – প্রতিষ্ঠা করেন এবং ঘোষণা করেন ইউরোপ “একমাত্র তখনই অর্থনৈতিক উন্নতি, গণতন্ত্র এবং শান্তির পথে এগোবে যখন এর রাষ্ট্রগুলো একটা যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠবে।”১৯৪৭-৪৮ সালে তিনি গ্রুপস্‌ ডি লিজ্যঁ ইন্টারন্যাশেনেল (জি.এল.আই) প্রতিষ্ঠা করেন যেটি ছিল একটি বৈপ্লবিক ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নভিত্তিক আন্দোলন।আঁদ্রে ব্রেটনের নেতিবাচকতা এবং শূন্যতাবাদকে পরিত্যাগ করে পরাবাস্তবতা এবং অস্তিত্ববাদের ইতিবাচক দিকগুলোকে প্রকাশ করাই তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল। কাম্যু হাঙ্গেরিতে সোভিয়েত হানার বিরুদ্ধে এবং স্পেনে ফ্রাঙ্কোর শাসনব্যবস্থার সর্বগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।
কাম্যু অনেকগুলো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন, বিশেষত স্পেনদেশীয় অভিনেত্রী মারিয়া কাসারেসের সঙ্গে তাঁর অনিয়মিত সম্পর্ক ছিল যা শেষমেশ জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়; এই অভিনেত্রীর সঙ্গে তাঁর প্রচুর চিঠিপত্রের আদানপ্রদান হয়েছিল।ফ’রে এই সম্পর্ককে হাল্কাভাবে নিতে পারেননি। তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এবং ১৯৫০এর দশকের প্রথমদিকে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। কাম্যু এই ঘটনায় অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করেন; তিনি জনসমক্ষ থেকে নিজেকে সরিয়ে আনেন এবং কিছু সময়ের জন্য তিনি সামান্য অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

১৯৫৭ সালে কাম্যু খবর পান যে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করতে চলেছেন। এটা তাঁর কাছে একটা বড়ো ধাক্কার মত ছিল। তিনি মনে করেছিলেন আঁদ্রে ম্যালরক্স এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের অধিকারী হবেন। ৪৪ বছর বয়সে তিনি দ্বিতীয়-সর্বকনিষ্ঠ প্রাপক হিসেবে পুরস্কার লাভ করেন; এক্ষেত্রে ৪২ বছর বয়সী প্রাপক রুডিয়ার্ড কিপলিংয়ের পরেই ছিলেন তিনি। এরপরেই তিনি তাঁর আত্মজীবনী লে প্রিমিয়ার হোম্মে (দি ফার্স্ট ম্যান) নামক তাঁর আত্মজীবনী লিখতে শুরু করেন এবং এইভাবে তিনি “নৈতিক শিক্ষা” নিয়ে পরীক্ষার করতে উদ্যোগী হন। তিনি আরো একবার থিয়েটারের দিকে ঘুরে দাঁড়ান. নোবেল পুরস্কারের টাকা দিয়ে তিনি দস্তয়েভস্কির উপন্যাস ডেমনস্‌-এর নাট্যরূপায়ণ এবং পরিচালনা করেন। নাটকটি ১৯৫৯ সালের জানুয়ারীতে প্যারিসের আন্তোইন থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয় এবং সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে।
এই সময়কালে তিনি দার্শনিক সিমোন ওয়েলের সাহিত্যকর্মগুলোকে তাঁর মৃত্যু-পরবর্তীকালে প্রকাশ করেন; এস্পোর (হোপ) নামক ধারাবাহিক হিসাবে সেই লেখাসমূহ এডিশনস গালিমার্ড প্রকাশ করে। ওয়েলের কাজ কাম্যুর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে. এবং কাম্যু মনে করতেন ওয়েলসের লেখা শূন্যতাবাদের যোগ্য প্রত্যুত্তর।কাম্যু তাঁকে "আমাদের সময়ের একমাত্র মহান ব্যক্তিত্ব" বলে বর্ণনা করেছেন।
কাম্যু ১৯৬০ সালের ৪ঠা জানুয়ারী, ৪৬ বছর বয়সে ভিল্লেব্লেভিন নামক ছোট শহরের লে গ্রাঁদ ফসার্ডে সেন্সের কাছে একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। তিনি ১৯৬০ সালে পরিবারের সাথে তাঁর লোরমারিন, ভ’ক্লুজের বাড়িতে ইংরেজি নববর্ষের ছুটি কাটিয়েছিলেন; সেখানে তাঁর এডিশন গালিমার্ডের প্রকাশক মাইকেল গালিমার্ড, গালিমার্ডের স্ত্রী জানাইন এবং তাদের কন্যাও ছিল। কাম্যুর স্ত্রী এবং মেয়েরা ২রা জানুয়ারী ট্রেনে করে প্যারিসে ফিরে যায়, কিন্তু কাম্যু গালিমার্ডের বিলাসবহুল ফাসেল ভেগা এইচ.কে ৫০০তে ফিরবেন বলে ঠিক করেন। রুট ন্যাশানাল ৫ (বর্তমান আর.এন ৬)এর দীর্ঘ সোজা রাস্তায় চলার পথে গাড়িটি একটি প্লেন গাছে ধাক্কা মারে। কাম্যু তৎক্ষণাত মারা যান; তিনি আরোহীর আসনে বসেছিলেন এবং সিট বেল্ট পরেননি। গালিমার্ড কয়েকদিন বাদে মারা যান, যদিও তাঁর স্ত্রী এবং কন্যা অক্ষত ছিলেন। অনেকে মনে করেন, কেজিবির গুপ্তচর বাহিনীই কাম্যুকে হত্যা করে, কারণ তিনি সোভিয়েত অত্যাচারের প্রবল সমালোচক ছিলেন।
==={{{{{{{{{{{{{{{∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆}}}}}}}}}}}=

Saturday, 6 November 2021

জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। সাহিত্যিক অতীন বন্দোপাধ্যায় ০৬ .১১.২১. Vol -548. The blogger in literature e-magazine


অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়।

 জন্ম ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৬ ই নভেম্বর,(২২ শে কার্তিক ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ)  বাংলাদেশের ঢাকা জেলার আড়াই হাজার থানার রাইনাদি গ্রামে। (কিন্তু সার্টিফিকেট অনুসারে জন্ম তারিখ - ১লা মার্চ,১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ। এটি সঠিক ছিল না। তার সাক্ষাৎকার দ্রষ্টব্য) তাঁর পিতা অভিমন্যু বন্দ্যোপাধ্যায় মুড়াগাছা জমিদারের অধীনে কাজ করতেন। মাতার নাম লাবণ্যপ্রভা দেবী।  তাঁর শৈশব কৈশোর কেটেছে গ্রামের বাড়িতে যৌথ পরিবারে। স্কুলের পড়াশোনা সোনারগাঁও এর পানাম স্কুলে। কিন্তু দেশভাগের পর ছিন্নমূল হয়ে তারা চলে আসেন ভারতে। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরের বানজেটিয়া গ্রামে গড়ে ওঠা মণীন্দ্র কলোনিতে পিতার বাড়িতে কিছুকাল থিতু হয়ে থাকেন। এখান থেকেই প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন। তারপর যাযাবরের ন্যায় কেটেছে তার যৌবন। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অধীনস্থ কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি.কম.পাশ করেন ও পরে বি.টি. পাশ করেন। বি.টি.পড়ার সময়ই আলাপ হয় সহপাঠী 'মমতা'র সাথে। পরে তাকে বিবাহ করেন. 

রচনা কর্ম।

অতীন্দ্রিয় অলৌকিকের অন্তরালে

অন্তর্গত খেলা (১৯৮৬)

অন্নভোগ (১৯৯০)

অপহরণ

অমৃতা

অমৃত্যু

অরণ্য

অলৌকিক জলযান (১৩৯৩ ব)

আজব দেশে বুমবাই

আবাদ (১৯৮৭)

ঈশ্বরের বাগান (১৯৯৫)

উত্তাপ

উপেক্ষা

ঋতু-সংহার

একজন দৈত্য একটি লাল গোলাপ (১৯৭৪)

একটি জলের রেখা (১৩৭২ ব)

এ কালের বাংলা গল্প (১৩৮১ ব)

কবির স্ত্রী

কাপালি

কালো ভ্রমর

খাদান

গম্বুজে হাতের স্পর্শ(১৩৭৯ ব)

চারু ইন্দ্র এবং কলকাতা(১৩৮২ ব)

জনগণ(২০০৬)

জীবন বড়ো ভারবাহী জন্তু

জীবন মহিমা (১৯৮৫)

ঝিনুকের নৌকা

টুকুনের অসুখ

তখন হেমন্তকাল(১৩৭৯ ব)

তুষার কুমারী

দুই ভারতবর্ষ (১৯৯৫)

দুঃখিনী বর্ণমালা মা আমার

দুঃস্বপ্ন (১৩৮০ ব)

দেবী মহিমা(১৯৮৪)

দ্বিতীয় পুরুষ (১৯৯৪)

ধ্বনি-প্রতিধ্বনি

নগ্ন ঈশ্বর (১৩৭৪ ব)

নদীর সঙ্গে দেখা(১৯৯৪)

নারী ও পুরুষ

নারী ও নদীর পাড়ে বাড়ী

নায়কের মত

নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে (১৯৭১)

পঞ্চযোগিনী

পাগলিনী রাধা

পালকের টুপি

পিপাসা (১৩৭৯ ব)

পুতুল 

প্রেসে-অপ্রেসে

পৃথিবীর এক কোণে(১৩৮৫ ব)

ফোটা পদ্মের গভীরে

বলিদান (১৩৮৭ ব)

বিদেশিনী (১৩৭৬ ব )

বিভ্রম(১৩৮৫ ব )

মধ্য যামিনী

মনোরম বনভূমি

মানগানু উপত্যকার বেড়াল (১৯৭৭)

মানুষের ঘরবাড়ি (১৩৯০ ব)

মানুষের মামুলি কেচ্ছা( ১৩৮২ ব)

মানুষের হাহাকার (১৩৮৮ ব)

মামার বাড়ি ভূতের বাড়ি (১৯৮৪)

মৃত্যুপথের যাত্রী

মৃন্ময়ী

যদি রাধা না হতে' '

যুবতী পরম রূপবতী (১৯৭৬)

রাজা যায় বনবাসে

রূপকথার আংটি

রোদ্দুরে জ্যোৎস্নায়

লাঞ্ছিতা (২০০০)

শঙ্খচিলের ডানা

শামুকখোল

শূণ্যের মাঝখানে বানাইল

শেষ দৃশ্য (১৯৭৮)

শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৯৪)

সবুজ শ্যাওলার নিচে

সমুদ্র মানুষ (১৯৬০)

সমুদ্রে বুনোফুলের গন্ধ( ১৩৯৯ ব )

সাগর জলে (২০০৮)

সাগরে মহাসাগরে

সাদা জ্যোৎস্না (১৩৭৮ ব)

সুখী রাজপুত্র

সুন্দর অপমান

সোহাগপুর

স্বর্গ খেলনা

কিশোর উপন্যাস -

অরণ্যরাজ্যে ম্যান্ডেলা

উড়ন্ত তরবারি

একটি জলের রেখা ও ওরা তিন জন

গিনি রহস্য

ফেনতুর সাদা ঘোড়া (১৩৮৭ ব)

দুষ্টু হাতিটি

নীল তিমি (১৯৯৪)

বিন্নির খই লাল লাল বাতাসা

রাজার বাড়ি

হীরের চেয়েও দামি


পুরস্কার তালিকা 

মানিক স্মৃতি পুরস্কার - ১৯৫৮ সালে 'সমুদ্র মানুষ' এর জন্য।

বিভূতিভূষণ স্মৃতি পুরস্কার - ১৯৯১ সালে।

ভুয়াল্কা পুরস্কার - ১৯৯৩ সালে পঞ্চযোগিনী এর জন্য।

বঙ্কিম পুরস্কার - ১৯৯৮ সালে দুই ভারতবর্ষ এর জন্য।

মতিলাল পুরস্কার

তারাশঙ্কর স্মৃতি পুরস্কার

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও সুধা পুরস্কার - কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার - ২০০১ সালে পঞ্চাশটি গল্প-এর জন্য

শরৎ পুরস্কার- ২০০৫ সালে

সুরমা চৌধুরী আন্তর্জাতিক স্মৃতি পুরস্কার (আই.আই.পি.এম প্রবর্তিত) - ২০০৮ সালে

সাম্মানিক মূল্য দশ লক্ষ টাকা 'নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে'-র জন্য

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘ দিন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ই জানুয়ারি শুক্রবার বাথরুমে পড়ে যাওয়ার কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। কলকাতার পোর্ট ট্রাস্টের সেন্টিনারি হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু পরদিন শনিবার ১৯ শে জানুয়ারি বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে ৮৫ বৎসর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।


আলোচনা 

বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমগ্র লিখন স্বাতন্ত্র্যের কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই যে কথাটি উচ্চারিত হয়, সেটি হ’ল তাঁর totality সম্পর্কে দ্বিধাহীন ধারণা। কথা হচ্ছে, কীসের টোটালিটি? তাঁর লেখা নিয়ে বিদগ্ধ সমালোচকদের আলোচনায় বিষয়টি এসেছে। টোটালিটি বলতে জীবনের সমগ্রতার সন্ধানের কথাই তাঁরা বলেছেন। যে কালে, যে মাটিতে লেখকের অবস্থান, সেই কাল এবং মাটি থেকে, মানুষের বেঁচে থাকার সঙ্গে উপাদানের সংঘাতের ফলে লেখকের যে জীবনবোধ ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, কাহিনির বিস্তারে সেই দর্শন সার্থক ভাবে, শৈল্পিক দক্ষতায় প্রকাশ করার ক্ষমতাকেই বলা হয়েছে টোটালিটি। জীবনের এই সমগ্র রূপ একজন লেখক তাঁর ব্যক্তিগত জীবনযাপনের অভিজ্ঞতায় বোধে সঞ্জাত করেন। তারপর এক একজন লেখক স্বতন্ত্র শৈলী দিয়ে সেই অনুভবকে কথামালায় রূপ দেন। একটি উপন্যাস গড়ে ওঠে।

যাপিত অভিজ্ঞতা যত বিচিত্র এবং বহুমুখী হয়, লেখকের মনোজগতে মানবজীবন সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা ততই বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে। এ যেন সেই যত বেশি নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা যায়, ততই বেশি করে সত্যের কাছে পৌঁছনো যায় – সেই তত্ত্বের প্রয়োগ। সেই লিখনমালা পাঠকের কাছেও বিশ্বস্ত হয়। বাংলা গদ্যসাহিত্যে সমরেশ বসু, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ বা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখায় এই জীবননির্যাস লক্ষণীয়। বাংলাসাহিত্যের আগ্রহী পাঠককুল জানেন অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের বিচিত্রগামিতার কথা। মানুষকে তার বহিরঙ্গে ও অন্তরঙ্গে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের অসাধারণ চোখ ছিল অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের। উদ্বাস্তু মানুষের কথা, সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের কথা, যৌনতা, ডাঙা ছেড়ে অতলান্ত অসীম সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো মানুষের কথা, তাদের কাম-ক্রোধ, লোভ, ভালোবাসার কথা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত বাংলা সাহিত্যে আর কেউ লিখতে পারেননি – অনায়াসে বলা যায়। আরও বেশি মানুষের জীবনকে দেখা, আর সেই জীবনের গূঢ় কথাগুলো দিয়ে গল্পপ্রতিমা নির্মাণ তাঁকে বাংলা সাহিত্যে অনন্য একটি স্থান দিয়েছে। বিভূতিভূষণে যেমন শাশ্বত জীবনবোধের উপলব্ধি হয় আমাদের, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার টোটালিটিতেও সেই শাশ্বত জীবনবোধ পাঠক বুঝতে পারেন।

বিচিত্র পরিবেশে বিচিত্রতর মানুষ এবং তাঁদের বেঁচে থাকার কৌশল লক্ষ করে যাওয়া তো মানুষের বহিরঙ্গের পরিচয়টুকু দেয় মাত্র। লেখক নয়, যে কোনও দ্রষ্টাই এই লক্ষণগুলো দেখতে পান, বুঝতে পারেন। কিন্তু স্রষ্টা খোঁজেন মানুষের অন্তরঙ্গ রূপ। সেখান থেকেই সৃষ্টির রসায়ন কাজ করতে শুরু করে। পরিবেশ, প্রকৃতি এবং সমাজের সঙ্গে মানুষের যে অবিরত সংঘর্ষ ঘটে চলেছে এবং তার ফলে মানুষের মনোজগতে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় বা হতে পারে, লেখক সেই আড়ালের কথাটুকু খোঁজেন তাকে শিল্পসম্মত ভাবে প্রকাশ করবেন বলে। এখানেই একজন সাধারণ দ্রষ্টা আর একজন স্রষ্টার ভূমিকা আলাদা হয়ে যায়।


অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ এক আশ্চর্য উপন্যাস। মহাকাব্যের লক্ষণাক্রান্ত এই উপন্যাস পাঠ শেষে সেই বহুকথিত শাশ্বত জীবনবোধের আভাস পাঠক অস্পষ্ট টের পান। অসংখ্য চরিত্রের পারস্পরিক ঘন বুনোটে গড়ে উঠেছে রহস্যময় মানবজীবনের বিশ্বস্ত দলিল। একটি একান্নবর্তী পরিবারের দেশ ছেড়ে চলে আসা, উদ্বাস্তু জীবনের অভিজ্ঞতা, তারই মাঝে প্রকৃতির অনুপুঙ্খ বর্ণনা, লোভী এবং কামুক মানুষের কথা – সব লিখেছেন অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত বিশ্বস্ত ভঙ্গিতে। মানুষের সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির, মানুষের সঙ্গে সমাজের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, কখনও গরল উঠে আসে, কখনও সুধা – সেই কাহিনি মহাকাব্যিক দার্ঢ্যে বর্ণিত হয় এই উপন্যাসে।

আরও একটি কথা বলার থাকে। কোথায় এই উপন্যাস মহৎ শিল্প হয়ে উঠেছে, আগাগোড়া উপন্যাসের কোথায় সেই রূপের আড়ালে অরূপ বীণাটি বেজেছে, সেই সত্য আবিষ্কার না হ’লে কেন ধ্রুপদী হবে এই লেখা। সে কথা এই উপন্যাসের নামকরণ থেকেই শুরু হয়। উপন্যাসের মাঝেও কয়েকবার নীলকণ্ঠ পাখির কথা এসেছে। এসেছে রূপক হিসেবেই। মানুষের চিরকালের না-পাওয়ার আর্তি ওই পাখি। যে অধরা মাধুরীর জন্য সৌন্দর্যপিপাসু স্রষ্টার কান্না, যে রহস্যময় নারীকে খুঁজে ফেরে চিরকালের প্রেমিক, জীবন ও মরণের মাঝে উড়ে বেড়ায় সেই নীল পাখি। ব্যথার দ্যোতক এই রং। “তারপর জলে অদ্ভুত একটা পাখি, নীলবর্ণের পাখি। নীলকণ্ঠ নামেই পবিত্র কিছু। ওর মনে হল জলে যে পাখিটা বসে আছে, সেটাই ঠাকুরদার আত্মা। ওটাই ওর কামনাবাসনার ঘর। পাগল মানুষ দেখলে বলতেন, ওটাই হচ্ছে নীলকণ্ঠ পাখি। সারাজীবন ঘুরিয়ে মারে।” ঠাকুরদার মৃত্যুর সময় নীলকণ্ঠ পাখি সম্পর্কে এই কথা এই উপন্যাসের একটি মূল সূত্র বলা যায়। সারাজীবন ঘুরিয়ে মারে … এই একটি বাক্যেই যেন পৃথিবীর সমস্ত শিল্পসাহিত্যের মূল কথাটি লুকিয়ে আছে। যে থাকে আড়ালে, যে আছে নিষিদ্ধ সীমানায়, যাকে পাবে বলে, যাকে স্পর্শ করবে বলে লেখক-শিল্পী-সাহিত্যিকের বাসনা, যাকে পরম করে পাওয়ার জন্য সাধকের সাধনা – সে তো কোনও অলীক বস্তু নয়। অথচ তাকে ধরাছোঁয়া কত কঠিন। নিত্যদিনের আচরণে, কখনও সমুদ্রের অসীম নীলে, কখনও উদ্বাস্তু কলোনির বাঁশঝাড়ে, পুকুর পারে ক্ষণিকের জন্য উদ্‌ভাসিত হয় মানুষের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসায়, হয়তো দু’জন ভিন্নধর্মী মানুষের গোপন চুম্বনে। আমাদের সামান্য ধারণা হয় মাত্র। লেখক এক বিশাল পটভূমিতে কখনও নিসর্গ বর্ণনায়, কখনও চরিত্রের সংলাপে তার ছবি আঁকার চেষ্টা করেন। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ছবি-আঁকিয়েদের মাঝে এক নিপুন চিত্রকর। আমাদের মনের গোপন কামনাবাসনা, আরও কত না-পাওয়া দুঃখ-সুখে গড়া এক নীলবর্ণ পাখির জন্য সারাজীবন ঘুরে মরে মানুষ। কেউ তার আভাসটুকু পায় শুধু। “ আশ্চর্য সোনা দেখছে সেই নীল রঙের পাখিটা আবার এসে অর্জুন গাছটায় বসেছে। সেই ঘরটা নীল, যেখানে অমলা তাকে নিয়ে গিয়েছিল। মায়ের মুখ ব্যথায় নীল, ছোট্ট ছেলেটা তার তখন জন্ম নিচ্ছে। … এই পাখিটাও নীল। সে দেখল আকাশ নীল, স্বচ্ছ জল নীল রঙের। এ পাখি ঠাকুরদার আত্মা না হয়ে যায় না”। বিষাদের এই নীল, প্রকৃতির মাঝে এই রহস্যময় নীল, আত্মার অন্তর্গত বিষাদময় এই নীল ছড়িয়ে আছে এই মহতী উপন্যাসের মাঝে জলে গোলা নীল রঙের মত। তাকে উপন্যাস থেকে ছেঁকে আলাদা করার উপায় নেই। অনুভবী পাঠক শুধু ‘নীল’ সত্যকে উপলব্ধি করতে পারেন শুধু।

যৌনতা বিষয়ে তার কথা উঠে এসেছে চরিত্রের মুখে। স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি জীবনে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাপন চিত্রের যে পালাবদল বেশ দ্রুত এবং লক্ষণীয়ভাবে ঘটতে শুরু করে, তার লেখনসমগ্রের মধ্যে সেই বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। যৌনতা বিষয়ে তার কোনও ছুঁতমার্গিতা লেখায় নেই। তার লেখায় পাই “ যৌনতা না থাকলে মানুষ কোথায়? মানুষ না থাকলে ঈশ্বর কোথায়? এবং সব নারী পুরুষের ক্ষেত্রেই এই যৌনতা উষ্ণতার জন্ম দেয়, সন্তান হয়। সন্তান বড় হয়, আবার যৌনতার জনন হয়, চক্র”। খুব স্বাভাবিক এবং অতি প্রয়োজনীয় একটি ধর্ম হিসেবেই তিনি যথার্থ আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপারটা দেখেছেন।

=={{{{{{{{{{{∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆}}}}}}}}}}}}}==

Friday, 5 November 2021

জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। আশুতোষ চৌধুরী। ০৫.১১.২১. Vol -547 . The blogger in literature e-magazine


আশুতোষ চৌধুরী


 জন্ম- ৫ ই নভেম্বর,১৮৮৮।  একজন বাঙালী কবি এবং লোকগীতি সংগ্রাহক। তিনি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার কধুরখীল গ্রামে ১৮৮৮ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। তার রচিত ছেলেদের চট্টলাভূমি গ্রন্থটি পড়ে রায়াবাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেন মুগ্ধ হয়ে তাকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে ১৯২৫ সালে লোকগীতি সংগ্রাহক নিযুক্ত করেন।চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে ঘুরে তিনি বহু বিচিত্র ও মর্মস্পর্শী পালাগান সংগ্রহ করেন। তাঁর সংগৃহীত পালাগানগুলি: নিজাম ডাকাতের পালা, কাফন চোরা, ভেলুয়া, হাতী খেদার গান, কমল সদাগরের পালা, সুজা তনয়ার বিলাপ, নছর মালুম, নুরুন্নেহা ও কবরের কথা, পরীবানুর হাঁইলা, দেওয়ান মনুহর ও মজুনা ইত্যাদি। এসব পালাগান দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত পূর্ববঙ্গ-গীতিকায় সংকলিত হয়েছে।


স্বভাবকবি ও গীতিকার হিসেবেও আশুতোষের খ্যাতি ছিল। গীতিকা নামে তাঁর একটি গানের সংকলন আছে। আদম আশক (কাহিনীকাব্য), ব্যথার বাণী ও স্বপ্নের জয় (গাথাকাব্য) তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। তিনি চট্টগ্রামী ভাষা ও সংস্কৃতি নামে একটি অভিধানও প্রণয়ন করেন। ওহীদুল আলমের সঙ্গে যুগ্মভাবে তিনি কিছুদিন পূরবী (১৯৩৬) নামে একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন।


নিজাম ডাকাতের পালা, কাফন চোরা, ভেলুয়া, হাতি খেদার গান, কমল সদাগরের পালা, সুজা তনয়ার বিলাপ, নছর মালুম, নুরুন্নেছা ও কবরের কথা, পরীবানুর হঁলা, দেওয়ান মনোহর ও মজুনা ইত্যাদি। এসব পালাগান পূর্ববঙ্গ-গীতিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

রচনা কর্ম।
  • গীতিকা (গানের সংকলন)
  • আদম আশক (কাহিনিকাব্য)
  • ব্যথার বাণী ও স্বপ্নের জয় (গাঁথাকাব্য)
  • চট্টগ্রামী ভাষা ও সংস্কৃতি (অভিধান)

মৃত্যু - ২৭ শে মার্চ,১৯৪৪
==============∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆====

Wednesday, 3 November 2021

জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। কাজী ইমদাদুল হক। ০৪.১১.২০২১.Vol -546. The blogger in literature e-magazine

                        কাজী ইমদাদুল হক


বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে যেসব বাঙালি মুসলমান মননশীল গদ্য লেখক বিশিষ্টতা অর্জন করেন, কাজী ইমদাদুল হক তার মধ্যে অন্যতম। শিক্ষা-দীক্ষায় অনগ্রসর তৎকালীন মুসলমান সমাজে তিনি এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিভার অধিকারী হয়ে সাহিত্য অঙ্গন আবির্ভূত হন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, প্রবন্ধকার, উপন্যাসিক, ছোট গল্পকার ও শিশু সাহিত্যিক।

১৮৮২ সালের ৪ নভেম্বর  খুলনা জেলার গোদাইপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা কাজী আতাউল হক প্রথমে আসামে জরিপ বিভাগে চাকরি করতেন, পরে খুলনার ফৌজদারি আদালতে মোক্তার হন। ইমদাদুল হক ১৯০০ সালে কলকাতার  প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এর দীর্ঘকাল পরে ১৯১৪ সালে তিনি বিটি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন।

ইমদাদুল হক ১৯০৪ সালে কলকাতা মাদ্রাসায় অস্থায়ী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯০৬ সালে তিনি আসামের শিলং-এ শিক্ষা বিভাগের উচ্চমান সহকারী হন। পরের বছর তিনি ঢাকা মাদ্রাসার শিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯১১ সালে ঢাকার শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ে ভূগোলের অধ্যাপক, ১৯১৪ সালে ঢাকা বিভাগের মুসলিম শিক্ষার সহকারী স্কুল-পরিদর্শক এবং ১৯১৭ সালে কলকাতা ট্রেনিং স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯২১ সালে নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের প্রথম কর্মাধ্যক্ষ হয়ে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত  উক্ত পদে বহাল ছিলেন।

১৯২০ সালের মে মাসে ইমদাদুল হকের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় শিক্ষাবিষয়ক মাসিক পত্রিকা শিক্ষক। পত্রিকাটি তিন বছর চালু ছিল। তিনি কবিতা,  উপন্যাস, প্রবন্ধ, শিক্ষা ও নীতিমূলক  শিশুসাহিত্য রচনায় খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ: 


আঁখিজল (১৯০০)

মোসলেম জগতে বিজ্ঞান চর্চা (১৯০৪)

ভূগোল শিক্ষা প্রণালী (দু'খণ্ড, ১৯১৩, ১৯১৬)

নবীকাহিনী (১৯১৭)

প্রবন্ধমালা (১৯১৮)

কামারের কাণ্ড" (১৯১৯)

আবদুল্লাহ (১৯৩২)

আলেক্সান্দ্রিয়ার প্রাচীন পুস্তকাগার

আবদুর রহমানের কীর্তি

ফ্রান্সে মুসলিম অধিকার

আলহামরা

পাগল খলিফা

‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসটি লেখকের জীবদ্দশায় সম্পূর্ণ বা প্রকাশ হয়নি। তিনি এ উপন্যাসটি জীবনের শেষান্তে শুরু করলেও শেষ করে যেতে পারেননি। পরবর্তীতে তার খসড়ার ভিত্তিতে উপন্যাসটি সম্পূর্ণ করা হয় এবং তা ১৯৩২ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।


১৯৬৮ সালে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড (আজকের বাংলা একাডেমি) আবদুল কাদিরের সম্পাদনায় প্রকাশ করে 'কাজী ইমদাদুল হকের রচনাবলি'।


অধুনা সৈয়দ আবুল মকসুদের সম্পাদনায় 'শুদ্ধস্বর' প্রকাশনী তার রচনাবলী প্রকাশ করেছে।

বাঙালি মুসলমান সমাজের কল্যাণসাধন ছিল ইমদাদুল হকের সাহিত্য সাধনার মূল লক্ষ্য। তিনি  বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা (১৯১৮) প্রকাশনা কমিটির সভাপতি ছিলেন। অত্যন্ত যোগ্যতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা বিভাগের দায়িত্ব পালন করায় সরকার তাঁকে ১৯১৯ সালে ‘খান সাহেব’ এবং ১৯২৬ সালে ‘খান বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করে। 

১৯২৬ সালের ২০ মার্চ কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়।  [

========∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆=======

জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। অরবিন্দ পোদ্দার। ০৩.১১.২০২১. Vol -545. The blogger in literature e-magazine

যার করো নিন্দে, সেই রয় পিন্দে’


অরবিন্দ পোদ্দার

 জন্ম ০৩ রা নভেম্বর ১৯১৯ বাংলাদেশের শ্রীহট্টে। পিতার নাম রাধাগোবিন্দ পোদ্দার। তাঁর স্কুলজীবনের পড়াশোনা ময়মনসিংহে। তারপর চলে আসেন কলকাতায়। এ শহরেই তার বিদ্যাচর্চার সাথে রাজনৈতিক ধ্যানধারণা গড়ে ওঠে। ছাত্রাবস্থায় বিপ্লবী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং স্বভাবতই আন্দোলনে জড়িত ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে আসেন। পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গেই চলছিল লেখালেখির কাজও। ‘গণবার্তা’ পত্রিকাটি তখন দৈনিক ছিল। সেই পত্রিকার সর্বক্ষণের কর্মী হিশেবে কাজ করে অপর দুটি পত্রিকাতেও গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতেন গ্রাসাচ্ছাদনের তাগিদে। ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করবার পর বিশ্ববিশ্রুত ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ের জোড়াজুড়িতেই প্রথাগত গবেষণা শুরু করেন অরবিন্দ। গবেষণাতে নাম নথিভুক্তের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগ্রহ করে এনে দিয়েছিলেন স্বয়ং নীহাররঞ্জন। তিনি তখন থাকতেন পূর্ণদাস রোডে। নিজের ব্যক্তিগত লাইব্রেরিকে অরবিন্দের ব্যবহারের সম্পূর্ণ সুযোগই কেবলমাত্র তিনি করেননি, অরবিন্দের খাওয়া-দাওয়ারও সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছিলেন নীহাররঞ্জনের পত্নী।১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে অন্তরীণ হন। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে গ্রেফতার হয়ে বন্দিজীবন কাটান তিন বৎসর বিপিনবিহারী গঙ্গোপাধ্যায়, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হেমন্তকুমার বসু প্রমুখের সাথে। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়ার পর এম.এ পাশ করেন এবং ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে ডি.ফিল ডিগ্রি লাভ করেন।এই সময়েই কলকাতার আশুতোষ কলেজ বিজ্ঞাপন দেয় একজন ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষকের জন্যে। নীহাররঞ্জন অনতিবিলম্বে আশুতোষ কলেজে দরখাস্ত করতে বলেন অরবিন্দকে। দেখা গেল ইন্টারভিউ বোর্ডে রয়েছেন প্রখ্যাত সংস্কৃতজ্ঞ অধ্যাপক রমারঞ্জন মুখোপাধ্যায়। তিনি অরবিন্দের নিয়োগের প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও ইন্টারভিউ বোর্ডের এক সভ্য অরবিন্দ বাবুর নামটি দেখে জানতে চান- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কসীয় আঙ্গিকে যে বঙ্কিম গবেষণা সন্দর্ভটি অনুমোদিত হয়েছে, সেটি এই অরবিন্দ পোদ্দারেরই করা কিনা। অরবিন্দ বাবু সম্মতি জানালে আবার তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি কি কমিউনিস্ট? অরবিন্দ পোদ্দার দ্বিধাহীনভাবে সম্মতি জানান। বোর্ডের সভাপতি রমারঞ্জনবাবু অরবিন্দবাবুকে নিয়োগ করতে চাইলেও বোর্ডের অপর দুই সভ্য একজন কমিউনিস্টকে কলেজ শিক্ষক হিশেবে চাকরি দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। চাকরি হয় না অরবিন্দের। পরবর্তীতে সিমলার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড্ স্টাডিতে ১৯৬৮ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন অরবিন্দ পোদ্দার। তারপর রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপনা করেন।কর্মজীবন সম্পাদনা রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরে ও কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। তিনি সিমলার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্স স্টাডিজের ফেলো ছিলেন। বামপন্থী ভাবধারায় তিনি সাহিত্য সমালোচক ও প্রাবন্ধিক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। তার গবেষণাগ্রন্থগুলি থেকে উপকৃত হয়েছেন বাংলার বিশিষ্ট বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিবর্গ ও অগণিত ছাত্রছাত্রী।

  গ্রন্থগুলি -

বঙ্কিম মানস (১৯৫১)
শিল্প দৃষ্টি (১৯৫১)
ঊনবিংশ শতাব্দীর পথিক (১৯৫৫)
মানবধর্ম ও বাংলা কাব্যে মধ্য যুগ (১৯৫৮)
রবীন্দ্রনাথের কিশোর সাহিত্য (১৯৫৯)
রবীন্দ্রনাথ শতবর্ষ পরে (১৯৬১)
ইংরাজী সাহিত্য পরিচয় (১৯৮১)
রবীন্দ্রনাথ:রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব (১৯৮২)
'রামমোহন উত্তরপক্ষ' (১৯৮২)'
শিল্পীর আয়ুধ সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা' (১৯৮২)'
রেনেসাঁস ও সমাজ মানস'(১৯৮৩)'
মার্কসীয় নন্দনতত্ত্ব ও সাহিত্য বিচার' (১৯৮৫)'
বাংলার অগ্নিযুগ সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দিনগুলি' (১৯৯৭)
'বঙ্কিম ঐতিহ্য ও ঐতিহ্যের শত্রুরা' (১৯৯৯)'
আত্মানুসন্ধান জাতীয় সংহতি ও ইসলাম' (২০০১)'
কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো ভারতবর্ষ এবং আমরা' (২০০৫)
'বন্দেমাতরম ইতিহাসে বিতর্কে' (২০০৬)
'একালের বুদ্ধিজীবী দর্পণে বৃহন্নলা' (২০০৬)'
স্বাধীনতার বিভ্রান্ত সেনাপতি এম কে গান্ধী' (২০০৭)'
পশুখামার ফিরে দেখা' (২০০৯)
'মধ্য এশিয়ার লুটেরা এবং আমরা ভারতীয়রা' (২০১০)
"কালান্তরের প্রবেশের মুখে ইতিহাস কোন্ কোন্ শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হইতেছে, ইহার গতিপথের স্বরূপ কী, তাহা নিরুপণ করিতে পারিলে নূতন কালের বিকাশ ধারা এবং ইহার যুগ বৈশিষ্ট্য অনুধাবন ও উপলব্ধি করা যায়। আবার কাল প্রবাহের অমোঘ অনুশাসনে যখন এই কালের ও অন্তর্ধানের সময় আসিবে, তখন তিরোধানের লগ্নে যে কোন্ নূতন কালকে সৃষ্টি করিয়া যাইবে, কালের বর্তমান স্বরূপের মধ্যে তাহার সাক্ষাৎ পাওয়াও সম্ভব।” (বঙ্কিমমানস, বঙ্কিম ঐতিহ্য ও বন্দেমাতরম- অরবিন্দ পোদ্দার। পৃষ্ঠা-১৩.
 
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এশিয়াটিক সোসাইটিতে তাঁকে বিদ্যাসাগরের উপর বক্তৃতা দিতে আহ্বান জানানো হয়েছে নবোতিপর অরবিন্দবাবু টানা দেড় ঘণ্টা ইংরেজিতে বক্তৃতা করলেন। কর্তৃপক্ষ যখন ওঁকে সম্মানী চেকটা দিলেন, উনি সেটা নিয়ে আবার কর্তৃপক্ষের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন; চেকটা রাজ্যপালের ত্রাণ তহবিলে জমা করে দেবেন। মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে নয়!

রামকৃষ্ণ মিশন থেকে দীক্ষা নিতে গেলে স্বামী তেজসানন্দের লেখা শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী পড়তে হয়। তেজসানন্দজী যখন বেলুড় বিদ্যামন্দিরের অধ্যক্ষ ছিলেন, অরবিন্দ পোদ্দার সেখানে অধ্যাপনা করতেন।

রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার জন্যে তেজসানন্দজী মিশন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সমস্যা মিটে যায়। উনি আবার মিশনে ফিরে আসেন।


 
অবসরের বহু পরে এরিয়ারের কিছু টাকা পান অরবিন্দবাবু। পুরো সেই টাকাটা তিনি রামকৃষ্ণ মিশনকে দিয়ে দেন তেজসানন্দীর স্মৃতিতে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের বৃত্তি দেওয়ার জন্যে।

বহু বছর আগে সমাজতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন মানুষের ভবিষ্যত দৃষ্টি ও মূল্যবোধ সম্পর্কে অরবিন্দ পোদ্দার ১৩৬৬ সালে লিখেছিলেন, যা আজও প্রাসঙ্গিক, “আমরা আজ যারা ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আছি তাদের কাম্য বোধ হয় এমন এক সমাজ, যেখানে ধনতান্ত্রিক সভ্যতার বিক্রয়যোগ্য পণ্যের মতো পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হতে চাই না, অথবা ব্যক্তিক উদ্যোগহীন মৌমাছির সমাজতন্ত্রও আমাদের কাম্য নয়, আমরা নিজ নিজ সত্তার বিকাশে, আপন মহিমায় পরস্পরের সঙ্গে সাধারণ মানব-অভিজ্ঞতার সাগরসঙ্গমে মিলিত হতে চাই। মুনাফার অংশীদার রূপে নয়, মানব ইতিহাসের অভিজ্ঞতার অংশীদার রূপে। একমাত্র এই শর্তেই ব্যক্তি তার আপন ঐশ্বর্য ও সত্যতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। রাষ্ট্র যদি তাকে মৌমাছির মতো সহজ করে দিতে চায় তো পারে- তাতে রাষ্ট্র হয়ত বাঁচবে, কিন্তু মানবতার মৃত্যু হবে। মানুষের মৃত্যু হবে। তাই আমরা যেন না ভুলি, ব্যক্তি নিষ্প্রাণ জড় বস্তু নয়, একান্ত সজীব ক্রিয়াশীল স্বাধীন সত্তা। সেই সত্তার প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল বলেই মূল্যবোধের ওপর আমি গুরুত্ব আরোপ করছি।” (স্বাধীনতা-সংস্কৃতি-মূল্যবোধ। এই প্রবন্ধটি অরবিন্দবাবু পাঁচের দশকের গোড়ার দিকে লিখেছিলেন)।

ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী বেপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষে রবীন্দ্রনাথের নীরব, নিভৃত ভূমিকাটির উন্মোচনে অরবিন্দ পোদ্দারের বিশেষ ভূমিকা আছে। চিন্মোহন সেহানবীশ, নেপাল মজুমদারদের সঙ্গেই বাংলায় রবীন্দ্রনাথের লেখা রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলি কীভাবে সশস্ত্র উপায়ে ব্রিটিশ বিতাড়নের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিল তা দেখিয়েছেন অরবিন্দ পোদ্দার। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিনে রবীন্দ্রনাথের লেখা, 
“শতাব্দীর সূর্য আজি রক্তমেঘ-মাঝে 
অস্ত গেল, হিংসার উৎসবে আজি বাজে 
 অস্ত্রে অস্ত্রে মরণের উন্মাদ রাগিনী ভয়ঙ্করী।” 
           -এই কবিতাটিকে রবীন্দ্রমানসলোক উন্মোচনে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে মনে করতেন অরবিন্দবাবু।
শতবর্ষ উত্তীর্ণ হয়েও বয়সের অনুপাতে সুস্থ ই ছিলেন অরবিন্দ পোদ্দার। স্ত্রী বিয়োগের পর উত্তর কলকাতার সিঁথি ছেড়ে চলে এসেছিলেন পুত্রের কাছেই এম বাইপাসের ধারে। বাড়ির ল্যাব্রাডর পোষ্যের সঙ্গে শতবর্ষীয় অরবিন্দ পোদ্দারের সখ্য দেখার মতো ছিল। কেবলমাত্র শ্রবণশক্তির কিছুটা সমস্যা ছিল। হেয়ারিং এইড দিয়ে সেই সমস্যারও সমাধান হয়ে যাচ্ছিল। অল্প কদিন আগে কোভিড কেড়ে নেয় আদরের নাতিকে। সেই চরম দুঃসংবাদ অনেক চেষ্টা করেও বাড়ির মানুষেরা তাঁর কাছ থেকে গোপন করতে পারেন নি। নাতির অকাল মৃত্যুর শোক সহ্য করতে পারলেন শতবর্ষজীবী অরবিন্দ পোদ্দার। মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হলেন। বেসরকারী হাসপাতালে যমে-মানুষে কটা দিনের লড়াই। অবশেষে ২০ জুন ২০২১ দুপুর ১টা নাগাদ চিরশান্ত হলেন।
========∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆===========

Tuesday, 2 November 2021

জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। কবি অরুন মিত্র। ০২.১১.২১. Vol -544. The blogger in literature e-magazine

জনম দুখিনির ঘর

"দুব্বার কয়েকটি ছোপ
ধানের গুচ্ছের একটু ছটা
কয়েকটা দয়েল ফিঙে টুনটুনি
নরম হাসির আভা
দু-একজনের ঠোঁট আদর করার মতো খোলা
এই সব নিশানা ধরেই
এখানে ফিরেছি আমি।

দুরন্ত রোদের টিলা পেরিয়ে এলাম,
কুয়াশা প্রান্তর বনবাদাড়ের রাত
আমায় ঘোরায়নি আর,
অচেনা হাটূরে আনাগোনা ক্রমে ক্রমে মুছে গেছে,
নানান জিঞ্জাসাবাদ বিচিত্র ভাষার স্তূপ ঠেলে
এখন আমার কান শুদ্ধ এক ধ্বনিতে পেতেছি।

সেই পিদ্দিমের আলো দেখা যায়,
জন্মদুখিনির ঘর।
কবে আমি বড়ো হয়ে তাকে ছেড়ে চ'লে আসি
তবু তার আঁচলের হাওয়া আজও আমার নিভূতে,
ঘুমের সময় যত গল্প ছিল আমাদের
অন্ধকার ভরাত যা সবই সে তো রূপকথার,
তবু দুঃখ ঘোচানোর গোপনতা নিয়ে
গল্পের রাতের মধ্যে অভিভুত আমরা ঘুমোতাম।

তারপর একদিন বেরিয়েছি,
সন্ধ্যার সীমান্তজোড়া পাহাড় ডিঙিয়ে
কতদূর চ'লে গেছি,
বিভূঁই মনের মধ্যে পথ খুঁজে কতবার দিশেহারা,
রূপকথার কোনো দেশ দেখিনি তো।
আজ দুব্বা ধান পাখি দেখে
ভালোবাসার দু-একটা মুখ দেখে
এখানে ফিরেছি

পিদ্দিপ জ্বলার একলা ঘর,
ওই আলো অন্ধকার আমার নাড়িতে বাজে,
আমার শ্রবণ একক স্বরের স্থিতি পায়ঃ
ভাঙাচোরা বুড়ি গলা
বিশুদ্ধ অতলস্পর্শ,
ঘরে ফিরতে বলে ডাকে।
সলতেটা নেভার পরও এই ডাক ঘুরতে ঘুরতে থাকবে
যতক্ষণ না আমি
রাত্তিরের গল্পগুলো মনে চেপে
আবার দাঁড়াব গিয়ে দুঃখের দুয়োরে ।।"

মাত্র ষোলো বছর বয়সে 'বেণু' নামে একটি কিশোর পত্রিকায় প্রথম অরুণ মিত্রের কবিতা প্রকাশিত হয়। তার মৌলিক কাব্যগ্রন্থগুলি হল প্রান্তরেখা (১৯৪৩), উৎসের দিকে (১৯৫০), ঘনিষ্ঠ তাপ(১৯৬৩), মঞ্চের বাইরে মাটিতে (১৯৭০), শুধু রাতের শব্দ নয় (১৯৭৮), প্রথম পলি শেষ পাথর (১৯৮১) ও খুঁজতে খুঁজতে এতদূর (১৯৮৬)। শুধু রাতের শব্দ নয় কাব্যগ্রন্থটি ১৯৭৯ সালে রবীন্দ্র পুরস্কারে এবং খুঁজতে খুঁজতে এতদূর কাব্যগ্রন্থখানি ১৯৮৭ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হয়। তাঁর  কাব্য সংকলন পনেরো খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।


১৯৩৬-এ স্পেনের গৃহযুদ্ধ, স্পেনের গণতন্ত্রী সরকারের পথে বিব-জনমত গড়ে ওঠা, লােরকা-র্যাল ফক-বাওওয়েলের মৃত্য, ১৯৩৭-এ জাপানের চীন আক্রমণ। তারপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরু (১৯৩৯), অনাক্রমণ চুক্তি ভেঙে হিটলারের রাশিয়া আক্রমণ (১৯৪১)—ফ্যাসিবাদ-বিরুদ্ধ উদ্দীপনার বিপুল তরঙ্গাভিঘাত। এদেশের মাটিতে ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়াে আন্দোলন’ সমর্থন করেননি সাম্যবাদীরা। কিন্তু বিরুদ্ধতারও একটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় নিজেদেরই মধ্যে বাংলায় ফ্যাসিস্ট বিরােধী লেখক ও শিল্পী সঙেঘ’র প্রতিষ্ঠা (১৯৪২), তারপরে মন্বন্তর (১৯৪৩), ‘গণনাট্য সঙেঘ’র প্রতিষ্ঠা (১৯৪৪), পুনশ্চ সাম্প্রদায়িকতার কলুষিতরূপ (১৯৪৬), দেশ টুকরাে হওয়া স্বাধীনতা (১৯৪৭), পুনশ্চ সাম্প্রদায়িক হানাহানি (১৯৪৮) এবং স্বাধীন ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির নিষিদ্ধ হওয়া। এই অশান্ত আবর্তের মধ্যে কবি সমর সেন, দিনেশ দাশ, মনীন্দ্র রায়, সুভাষ মুখােপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, রাম বসু প্রমুখদের মতাে কবি অরুণ মিত্রও জেগে উঠেছেন।
১৯৩৫ সাল থেকেই. শ্রী মিত্রের কবিতায় ফ্যাসীবাদ বিরােধী ও সাম্যবাদী দর্শনের মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। তার বিভিন্ন কবিতায় যেমন- লাল ইস্তাহার, মাটির কবর, কসাকের ডাক ১৯৪২, বসন্তবাণী ইত্যাদিতে মার্কসীয় জীবনদৃষ্টির পরিচয় ফুটে ওঠে। অরুণ মিত্রের সাম্যবাদী কবিতার মধ্যে লাল ইস্তাহার কবিতাটি সবিশেষ উল্লেখযােগ্য, যেখানে সাম্যবাদী ইস্তাহারকে মুক্তি আর প্রতিরােধের প্রতীকরূপে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রাচীরপত্রে পড়ােনি ইস্তাহার?/ লাল অক্ষর আগুনের ঝলকায় / ঝলসাবে কাল জানাে।/ আকাশে ঘনায় বিরােধের উত্তাপ / ভোতা হয়ে গেছে পুরনাে কথায় ধার। আসলে লাল ইস্তাহার কবিতাটি সাম্যবাদী লেখকদের আত্মপ্রকাশের পত্রিকা ‘অগ্রণীতে প্রকাশ হয়ে বেশ বিশিষ্ট হয়ে উঠেছিল—
দেবতার ক্রোধ কুৎসিত রীতিমতাে

মানুষেরা হুশিয়ার!

লাল অক্ষরে লটকানাে আছে দেখ।

নতুন ইস্তাহার।”
আবার
,মাটির কবর’ কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের উত্থান ও জাগরণের কথা আছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরূদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের আহ্বান ধ্বনিত হয় ‘কসাকের ডাক ১৯৪২’ কবিতায়। ‘বসন্তবাণী’ কবিতায় আছে অস্ত্রে অস্ত্রে প্রতিরােধ করার স্মরণীয় উত্তি। তাঁর কবিতায় সাম্যবাদী দর্শনের যে প্রতিফলন তা তাঁর সমাজসচেতন জীবনবাদের ফলশ্রুতি। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে - 

"শান্তির শিশির- মুক্ত-ঝলমলে এক পৃথিবী তিনি চেয়েছেন, যেখানে মানুষের উজ্জ্বল বেঁচে থাকার স্রোতে উচ্ছাসের সমস্ত আলাে জ্বলে ওঠে। পৃথিবী, ধুলাে, নদী, ফসল, ধানশিয, অর্থারােহী সেনা ইত্যাদির সমারােহে তার কবিতা এক অন্তর্লীন মগ্নতার জগৎ গড়ে তােলে। তিনি নিজের কাঙ্খিত পৃথিবীর অজস্র রূপ দেখতে দেখতে একসময় বিভাের হয়ে যান। সেই ভবিষ্যত পৃথিবীর সঙ্গে যােগস্থাপনে আগ্রহী অরুণ মিত্রের চারপাশে ক্রমে ঘনিয়ে ধুলাে মাটির গান।”
(জহর সেন মজুমদার বাংলা কবিতাঃ মেজাজ ও মনােবীজ’ গ্রন্থে ‘অরুণ মিত্র বাংলা কবিতার বৈদ্যুতির তরঙ্গ’)

১৯০৯ সালের ২ নভেম্বর  বাংলাদেশের যশোর শহরে কবি অরুণ মিত্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতার নাম হীরালাল মিত্র ও মায়ের নাম যামিনীবালা দেবী। অল্পবয়সেই অরুণ মিত্র কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতার বঙ্গবাসী স্কুলে তার শিক্ষাজীবনের সূত্রপাত ঘটে। ১৯২৬ সালে এই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২৮ সালে বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আইসিএস পরীক্ষা ও ১৯৩০ সালে রিপন কলেজ (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে ডিস্টিংশন সহ বিএ পাস করেন। এই সময়ে সাহিত্যের চেয়ে সঙ্গীতের প্রতি তার অধিক আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। আবার এই সময়েই ভিক্টর হুগোর উপন্যাস ইংরেজি অনুবাদে পড়ে ফরাসি সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ফরাসি ভাষা শিখতে শুরু করেন। বিএ পাস করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পড়া শুরু করেন। কিন্তু পিতামাতার জ্যেষ্ঠপুত্র হওয়ায় সাংসারিক দায়দায়িত্বের চাপে এমএ পড়া অসমাপ্ত রেখেই ১৯৩১ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি গ্রহণ করতে বাধ্য হন।
১৯৯০ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানিক ডি. লিট. উপাধিতে ভূষিত করে। ফরাসি ভাষা ও ফরাসি সাহিত্য নিয়ে নিরন্তর গবেষণার জন্য ১৯৯২ সালে ফরাসি সরকার তাকে 'লিজিয়ন অফ অনার' সম্মানে ভূষিত করে। প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি অভিনেত্রী তৃপ্তি মিত্রের অগ্রজা বিশিষ্ট অভিনেত্রী ও সবুজ চুড়ি গল্পগ্রন্থের রচয়িত্রী শান্তি মিত্র (সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের ভাগ্নি) তার স্ত্রী।

 ২০০০ সালের ২২ অগস্ট কলকাতায় অরুণ মিত্র প্রয়াত হন।

“আমি একজন উৎকৃষ্ট (সর্বোৎকৃষ্টও বলা যায় হয়তাে) অভিনেতা। যাঁরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে নাটক করে হৈ চৈ লাগিয়ে দেন, অনেক সময় বিজয় করেন, আমি তাদের দলে পড়িনা। আমি তৈরী করা মঞ্চটঞ্চের ধার ধারি না। জীবনটাই আমার মঞ্চ।”

পুরস্কার

সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার(১৯৮৭),
 রবীন্দ্র পুরস্কার(১৯৭৯)
===============∆∆∆∆∆∆∆=========

Monday, 1 November 2021

জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য। সাহিত্যিক আবু ইসহাক। ০১.১১.২০২১. Vol -543. The blogger in literature e-magazine.


আবু ইসহাক 


বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মৌলভী মোহাম্মদ এবাদুল্লা ও আতহারুন্নিসা দম্পত্তির ছয় সন্তানের মধ্যে আবু ইসহাক ছিলেন পঞ্চম । ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষের খণ্ডচিত্র যেমন স্থান পেয়েছে তার লেখনিতে তেমনি বাংলার স্বাধীনতা পরবর্তী চিত্রও তুলে ধরেছেন তাঁর সাহিত্যকর্মে । আবু ইসহাক বাংলা ভাষার নতুন ধরনের অভিধান প্রণেতা হিসেবেও বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন ।

জন্ম: ১ নভেম্বর, ১৯২৬ ইংরেজি; ১৫ কার্তিক, ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ নড়িয়া থানার শিরঙ্গল গ্রামে,। পরে উপসী বিজারি তারাপ্রসন্ন ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপ নিয়ে মেট্রিক এবং ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ১৯৪৪ সালে আই.এ পাশ করেন। ১৯৬০ সালে পাকিস্তানের করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। শিক্ষা জীবন শেষে তিনি আমলা পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে এবং বিদেশে কূটনৈতিক পদে নিয়োজিত ছিলেন।


আবু ইসহাক প্রথমে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শক পদে যোগদান করেন। দেশবিভাগের পরে ১৯৪৯ সালে তিনি পুলিশ বিভাগে সহকারি পরিদর্শক হন এবং ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি করাচি, রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদে কর্মরত ছিলেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে তিনি ঢাকায় এসে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার উপ-পরিচালক হন। পরের বছর বার্মার আকিয়াবে বাংলাদেশ সরকারের দূতাবাসে ভাইস-কনসাল এবং ১৯৭৬ সালে কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের প্রথম সেক্রেটারি পদে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৭৯ সালে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার খুলনা বিভাগের প্রধান হয়ে ১৯৮৪ সালে অবসার গ্রহণ করেন।[২]

অভিধান প্রণেতা হিসেবেও আবু ইসহাকের একটি বিশিষ্ট পরিচয় আছে। তিনি সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান (২ খন্ড, ১৯৯৩, ১৯৯৮) রচনা করে বাংলা কোষগ্রন্থের পরিধিকে বাড়িয়ে তুলেছেন। তাঁর প্রণীত অভিধানের বিশেষত্ব হলো শব্দের শুধু অর্থ নয়, সব ধরনের প্রতিশব্দ বা সমর্থক প্রদান। তাঁর অভিধানে ‘অন্ধকার’ শব্দের ১২৭টি সমর্থক শব্দ আছে।

গ্রন্থ

উপন্যাস 
সূর্য দীঘল বাড়ি (১৯৫৫)[৩] - চলচ্চিত্ররূপ - ১৯৭৯[৪]
পদ্মার পলিদ্বীপ (১৯৮৬, সামাজিক উপন্যাস)
জাল (১৯৮৮, গোয়েন্দা উপন্যাস)
গল্প 
হারেম (১৯৬২)
মহাপতঙ্গ (১৯৬৩)
জোঁক



পুরস্কার

বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২-৬৩)
সুন্দরবন সাহিত্যপদক (১৯৮১)
একুশে পদক (১৯৯৭)
স্বাধীনতা পদক (মরণোত্তর) ২০০৪

তিনি ১৯৪৬ সালে, মাত্র বিশ বছর বয়সে রচনা করেন বিখ্যাত উপন্যাস 'সূর্য দীঘল বাড়ী' এবং এটি প্রকাশ করা হয় ১৯৫৫ সালে কলকাতা থেকে, এটি একটি সামাজিক উপন্যাস। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ও দেশের বাইরে আকিয়াব ও কলকাতায় বাংলাদেশ দূতাবাসে ভাইস-কনসাল ও ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আবু ইসহাকের প্রথম প্রকাশিত রচনার নাম – ১৯৪০ সালে নবযুগ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘অভিশাপ’ গল্পটি ।

’সূর্য-দীঘল বাড়ী’ উপন্যাসটিকে চলচ্চিত্রে রূপদান করেন – শেখ নিয়ামত আলী ও মসীহউদ্দিন শাকের (১৯৭৯) সালে ।

পদ্মার বুকে জেগে ওঠা নতুন চরের দখল নিয়ে দুই গোষ্ঠীর সংঘাত, খুন, হিংসা বিদ্বেষ, স্বার্থপর মানুষের সম্পদের লোভ প্রভৃতি যে উপন্যাসের আলোচ্য বিষয় – আবু ইসহাকের ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ উপন্যাসের ।

’পদ্মার পলিদ্বীপ’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় – প্রথমে বাংলা একাডেমির ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘মুখর মাটি’ নামে (১৯৮৬) সালে । এই উপন্যাসে প্রধান প্রধান চরিত্রের মধ্যে রয়েছে – জরিনা, রূপজাল, ফজল, এরফান মাতবর, জঙ্গুরুল্লা প্রভৃতি ।

লেখক যখন পুলিশ ছিলেন তখন বেশ কিছু জাল নোটের মামলা তদন্ত করেছিলেন সেই আলোকে রচনা করেছিলেন – ‘জাল’ উপন্যাস ।

আবু ইসহাকের উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় – আনন্দ পত্র পত্রিকায় (১৯৮৮ সালে) । ”লাঠির জোরে মাটি, লাঠালাঠি কাটাকাটি, আদালতে হাঁটাহাঁটি, এই না হলে চরের মাটি, হয় কবে খাঁটি”- উক্তিটি যে উপন্যাসের – আবু ইসহাকের ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ উপন্যাসের ।

আবু ইসহাকের গল্প গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে – হারেম (১৯৬২) ও মহাপতঙ্গ (১৯৬৩) । নিজের জীবনের স্মৃতি তুলে ধরেছেন তাঁর নকশাধর্মী রচনা – ‘স্মৃতিবিচিত্র’ নামক স্মৃতিকথায় ।

’জয়ধ্বনি’ আবু ইসহাকের যে শ্রেণির রচনা – একমাত্র নাটক (ধানশালিকের দেশ পত্রিকায় ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়) ।

’একটি ময়নার আত্মকাহিনী’ তাঁর যে শ্রেণির রচনা – ছোট গল্প (লেখকের মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার কাহিনী) ।

’সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান’ আবু ইসাহকের যে শ্রেণির রচনা – বাংলা ভাষার অভিধান ।

আবু ইসহাক রচিত ‘ সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান’ ‘অন্ধকার’ শব্দের সমার্থক শব্দ ব্যবহার করেছেন – ১২৭ টি ।

’বারে বা, বড় পাখির বড় রং, আণ্ডা পাড়ার দেখ ঢং, উক্তিটি আবু ইসহাকের যে রচনার – ‘মহাপতঙ্গ’ নামক ছোট গল্পের ।

তাঁর মহাপতঙ্গ গল্পে যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন – একজোড়া চড়ুই পাখির জবানিতে একদিকে বিজ্ঞানের আশীর্বাদ অন্যদিকে বিজ্ঞানের অভিশাপ ।

’সূর্য-দীঘল বাড়ী’ আবু ইসহাকের যে শ্রেণির রচনা – সামাজিক উপন্যাস ।

ওসমান, তোতা মিয়া, টুনি, করিম গাজী, নবুখা প্রভৃতি যে গল্পের চরিত্র – আবু ইসহাকের ‘জোক’ নামক ছোট গল্পের ।


কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের প্রথম সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় – আবু ইসহাককে ১৯৭৬ সালে ।

স্বনামধন্য কথাসাহিত্যিক ও বিশিষ্ট অভিধান প্রণেতা আবু ইসহাক মৃত্যুবরণ করেন – ২০০৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি (মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবর স্থানে তাকে সমাহিত করা হয়) ।


মৃত্যু: ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০০৩, ঢাকা।
======={{{∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆∆}}}====

শুভ জন্মদিন শ্রদ্ধাঞ্জলি। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ।‌ একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ। Dt -26.11.2024. Vol -1059. Tuesday. The blogger post in literary e magazine.

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়   (২৬ নভেম্বর ১৮৯০ — ২৯ মে ১৯৭৭)  একজন বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ.  মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্...